বাংলাস্ফিয়ার: দায়িত্ব গ্রহণের শুরুতেই লোকভবনের রান্নাঘরে শুধু নিরামিষ খাবার তৈরির নির্দেশ দিয়ে বিতর্কে কেরলমের নতুন রাজ্যপাল ওমপ্রকাশ মাথুর। মাছ ও মাংস রান্না বন্ধের এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছেন কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক কে সি বেণুগোপাল। তাঁর অভিযোগ, ব্যক্তিগত খাদ্যাভ্যাস অন্যদের উপর চাপিয়ে দিয়ে মানুষের খাবার বেছে নেওয়ার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে। তবে লোকভবন সূত্রের বক্তব্য, কর্মীদের খাদ্যাভ্যাসে কোনও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়নি।
শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, রাজ্যের ২৯তম রাজ্যপাল হিসেবে শপথ নেন মাথুর। কেরল হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতি সৌমেন সেন তাঁকে শপথবাক্য পাঠ করান। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী ভি ডি সতীশন। রাজস্থানের প্রবীণ বিজেপি নেতা মাথুর এর আগে সিকিমের রাজ্যপাল ছিলেন। তিনি রাজেন্দ্র বিশ্বনাথ আরলেকরের স্থলাভিষিক্ত হলেন। আরলেকরকে তামিলনাড়ুর রাজ্যপাল করা হয়েছে।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে বৃহস্পতিবারই প্রকাশিত হয়, লোকভবনের রান্নাঘরে আমিষ পদ তৈরি না করার নির্দেশ দিয়েছেন মাথুর। কেরল কৌমুদীর প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাঁর জন্য রাজস্থানি ঘরানার খাবার তৈরিতে রাজস্থান থেকে রাঁধুনি আনা হয়েছে। আগের রাজ্যপাল আরলেকরের সময়ে সেখানে মাছসহ আমিষ খাবার রান্না হত। গোয়ার বাসিন্দা আরলেকরের নিজস্ব রাঁধুনিও ছিলেন।
মাথুরের শপথের পরেই সামাজিক মাধ্যমে সরব হন বেণুগোপাল। তাঁর বক্তব্য, কেরলের সামাজিক বাস্তবতা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বুঝে ওঠার আগেই এমন নির্দেশ দেওয়া অনুচিত। উপকূলবর্তী এই রাজ্যে মাছ সহজলভ্য এবং মানুষের দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এখানে নিরামিষ ও আমিষ, দুই ধরনের খাবারেরই দীর্ঘদিনের সহাবস্থান রয়েছে। কে কী খাবেন, সেই সিদ্ধান্ত প্রত্যেক মানুষের নিজের বলেই মনে করেন কংগ্রেস নেতা।
বেণুগোপাল স্পষ্ট করেন, রাজ্যপাল নিজে নিরামিষাশী থাকলে কারও আপত্তির কারণ নেই। আপত্তি তাঁর ব্যক্তিগত পছন্দ অনুযায়ী একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের রান্নাঘর পরিচালনার বাধ্যবাধকতা নিয়ে। সেখানে কেরলের মানুষও কাজ করেন। তাঁদের পরিচিত খাদ্যসংস্কৃতিকে উপেক্ষা করে বিধিনিষেধ চাপানো গ্রহণযোগ্য নয় বলে তাঁর দাবি। সাংবিধানিক পদে থাকা ব্যক্তির দায়িত্ব মানুষের অধিকার রক্ষা করা; নিজের ক্ষমতা ব্যবহার করে ব্যক্তিস্বাধীনতা সঙ্কুচিত করা নয়, মন্তব্য তাঁর।
নির্দেশটিকে সঙ্ঘ পরিবারের রাজনৈতিক কর্মসূচির সঙ্গেও যুক্ত করেছেন বেণুগোপাল। তাঁর অভিযোগ, কেরলে গেরুয়া মতাদর্শ চাপানোর প্রাথমিক পদক্ষেপ এটি। লোকভবনে চালু হওয়া এমন নিয়ন্ত্রণ অন্য প্রতিষ্ঠানেও ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। খাবারের স্বাধীনতা প্রত্যেক ব্যক্তির অধিকার জানিয়ে রাজ্যপালকে এই ধরনের পদক্ষেপ থেকে সরে আসার দাবি জানান কংগ্রেস নেতা।
অন্যদিকে, লোকভবন সূত্র এই অভিযোগ খারিজ করে জানিয়েছে, মাথুর কঠোরভাবে নিরামিষ খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করেন। যে রান্নাঘরে তাঁর খাবার তৈরি হয়, সেখানেই আমিষ রান্না না করার কথা বলা হয়েছে। সংবাদ সংস্থাকে সূত্রগুলি জানায়, ওই রান্নাঘরের খাবার মূলত রাজ্যপাল ও তাঁর ব্যক্তিগত কর্মীদের কয়েকজনের জন্য। অন্য কর্মীরা বাড়ি থেকে খাবার আনেন অথবা বাইরে খান। তাঁদের পছন্দমতো খাবার আনা বা খাওয়ার উপর কোনও নিষেধাজ্ঞা নেই।
লোকভবনের এক সূত্রের যুক্তি, নিজের জন্য কী রান্না হবে, তা ঠিক করার অধিকার রাজ্যপালের রয়েছে। তাঁর রান্নাঘরের ব্যবস্থাকে সমস্ত কর্মীর খাদ্যস্বাধীনতার উপর আক্রমণ হিসেবে দেখানো যথাযথ নয় বলেই তাঁদের অবস্থান। ওই সংবাদপত্রের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মুখ্যমন্ত্রী সতীশন তখনও বিতর্কটি নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাননি।
কেরলে খাবার নিয়ে রাজনৈতিক সংঘাত অবশ্য নতুন নয়। ২০১৭ সালে গবাদি পশু বিক্রি সংক্রান্ত কেন্দ্রীয় বিধির প্রতিবাদে কংগ্রেস ও সিপিএম গোমাংস উৎসবের আয়োজন করেছিল। এবারের বিতর্কের কেন্দ্রে এসেছে রাজ্যপালের ব্যক্তিগত খাদ্যপছন্দ এবং সরকারি বাসভবনের রান্নাঘর পরিচালনার সীমারেখা। কংগ্রেস যেখানে সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার প্রশ্ন তুলছে, লোকভবন সেখানে নির্দেশের সীমিত প্রয়োগের কথাই সামনে রাখছে।