বাংলাস্ফিয়ারঃ ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার জন্য ভিত্তিহীন অভিযোগে একসঙ্গে বিপুল সংখ্যক ফর্ম ৭ জমা পড়ার ঘটনা স্বীকার করে আবেদন দাখিলে সীমা বাঁধল নির্বাচন কমিশন। কমিশন জানিয়েছে, এই ধরনের আবেদনে সংশ্লিষ্ট ভোটারদের অকারণ অসুবিধায় পড়তে হচ্ছে। পাশাপাশি বাড়ছে মাঠপর্যায়ের নির্বাচনী কর্মীদের কাজের চাপ। শুক্রবার, ৯ অক্টোবর, সমস্ত রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকদের কাছে নতুন নির্দেশ পাঠানো হয়েছে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ভোটার তালিকা সংশোধনের দাবি ও আপত্তি জানানোর গোটা পর্বে একজন ব্যক্তি সর্বাধিক ১০টি ফর্ম ৭ জমা দিতে পারবেন। অর্থাৎ, এটি প্রতিদিনের সীমা নয়; সম্পূর্ণ পর্বের মোট সীমা। অন্যদিকে, বিশেষ সংশোধন পর্বের বাইরে সারা বছর তালিকা হালনাগাদের যে কাজ চলে, তখন ব্যক্তি-পিছু মাসে সর্বাধিক পাঁচটি আবেদন করা যাবে। অনলাইন এবং সরাসরি কাগজে আবেদন, উভয় ক্ষেত্রেই এই বিধি প্রযোজ্য।
এতদিন অনলাইনে একজন ব্যক্তি একসঙ্গে ছয়টি আবেদন করতে পারতেন; সেগুলির নিষ্পত্তির সঙ্গে পরবর্তী আবেদন যুক্ত ছিল। কিন্তু সরাসরি জমা দেওয়া ফর্মের নির্দিষ্ট সংখ্যাসীমা ছিল না। বিষয়টি নির্বাচনী নিবন্ধন আধিকারিকদের বিবেচনার উপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। কমিশনের বক্তব্য, এই ব্যবস্থায় বাস্তব ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হচ্ছিল।
ফর্ম ৭ ব্যবহার করা হয় ভোটার তালিকায় কারও নাম অন্তর্ভুক্তির বিরুদ্ধে আপত্তি জানাতে অথবা তালিকাভুক্ত নাম বাদ দেওয়ার আবেদন করতে। সংশ্লিষ্ট বিধি অনুযায়ী, আবেদনকারীকে একই বিধানসভা কেন্দ্রের নথিভুক্ত ভোটার হতে হবে। ফলে যে কোনও ব্যক্তি যে কোনও কেন্দ্রের ভোটারের বিরুদ্ধে এই আবেদন করতে পারেন না।
কমিশন আরও বলেছে, ফর্মে সম্পূর্ণ তথ্য এবং আবেদনকারীর যথাযথ স্বাক্ষর থাকতে হবে। স্বাক্ষরের বদলে তার ছাপ দেওয়া সিল গ্রহণযোগ্য নয়। ভোটার তালিকার সঙ্গে মিলিয়ে আবেদনকারীর পরিচয়ের সত্যতাও যাচাই করতে হবে। নির্ধারিত সময়, নির্দিষ্ট ফর্ম কিংবা আবেদনের পদ্ধতি না মানলে তা খারিজ করতে হবে।
যেসব আপত্তির ক্ষেত্রে শুনানি প্রয়োজন, সেখানে অভিযোগকারীকে নোটিস দিয়ে ব্যক্তিগতভাবে শুনতে হবে। প্রতিটি ফর্মের জন্য আলাদা বক্তব্য নথিবদ্ধ করতে হবে। অভিযোগের যথার্থতা যাচাইয়ের পরে যাঁর নাম বাদ দেওয়ার আবেদন, তাঁকেও শুনানির সুযোগ দিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। জেনেশুনে মিথ্যা তথ্য বা সাজানো অভিযোগ করা হয়েছে বলে প্রমাণিত হলে ১৯৫০ সালের জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের ৩১ ধারা অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। অর্থাৎ, আবেদন জমা পড়লেই নাম বাদ যাবে না। মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকদের এই নির্দেশ সমস্ত নিবন্ধন আধিকারিক, তাঁদের সহকারী এবং মাঠপর্যায়ের কর্মীদের জানাতে বলা হয়েছে। সাধারণ মানুষ যাতে নিয়মগুলি জানতে পারেন, সে জন্য পর্যাপ্ত প্রচারের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
এই সিদ্ধান্তের পটভূমিতে রয়েছে বিভিন্ন রাজ্যে গণহারে নাম বাদ দেওয়ার আবেদনের বিতর্ক। ঝাড়খণ্ডের গোড্ডায় সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানে উঠে এসেছিল, কয়েকটি বুথে বিজেপির বুথস্তরের এজেন্টরা একসঙ্গে বহু ফর্ম জমা দিয়েছিলেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আপত্তি তোলা হয়েছিল সংখ্যালঘু ভোটারদের নাম নিয়ে। সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ভোটার জানিয়েছিলেন, তাঁদের পরিবার বহু প্রজন্ম ধরে ওই এলাকায় বসবাস করছে।
একটি বুথে ৭৫টি ফর্ম নিয়ে আসা এজেন্টকে নির্বাচনী কর্মী প্রশ্ন করলে তিনি সেগুলি পুড়িয়ে দেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ ছিল। ওই এজেন্টের দাবি, তিনি ভেবেছিলেন এগুলি নাম তোলার ফর্ম। অন্যদিকে, স্থানীয় বিজেপি নেতৃত্বের বক্তব্য ছিল, দ্বৈত নিবন্ধন থাকলে আপত্তি তোলা এজেন্টদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে; অভিযোগ যাচাই করার দায়িত্ব নির্বাচনী কর্তৃপক্ষের।
নতুন নির্দেশের তাৎপর্য তাই আবেদনের সংখ্যা কমানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ভোটারকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া এবং মিথ্যা অভিযোগকারীর দায় নির্ধারণও এর অংশ। বাস্তবে এই সুরক্ষাগুলি কতটা কার্যকর হচ্ছে, তার উপরই নির্ভর করবে সাধারণ ভোটারের হয়রানি কমবে কি না। কারণ, অভিযোগের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি প্রতিটি আবেদনের সত্যতা পরীক্ষা না হলে বৈধ ভোটারের উদ্বেগ পুরোপুরি দূর হবে না।