বাংলাস্ফিয়ারঃ শনিবার, ১০ অক্টোবর, বিক্ষোভ ঘিরে নিরাপত্তার কড়াকড়িতে বদলে গেল রাজধানীর চেনা ছবি। যন্তর মন্তরে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে জমায়েতের ডাক দিয়েছিল ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজেপি। কিন্তু সমাবেশস্থলে পৌঁছনোর আগেই বহু মানুষকে আটক করে পুলিশ। দিনভর যন্তর মন্তর কার্যত ফাঁকা থাকলেও রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভকারীদের জড়ো হওয়ার চেষ্টা এবং তাঁদের সরিয়ে দেওয়ার ঘটনা চলতে থাকে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সকাল ছ’টা থেকেই নয়াদিল্লির রাস্তায় প্রায় প্রতি ২০০ মিটার অন্তর তল্লাশিচৌকি দেখা যায়। পার্লামেন্ট স্ট্রিট, অশোকা রোড, মিন্টো রোড, মান্ডি হাউস, কস্তুরবা গান্ধী রোড ও বারাখাম্বা রোড দিয়ে যন্তর মন্তরে যাওয়ার পথ আটকে দেওয়া হয়। শুধু পার্লামেন্ট স্ট্রিটের আশপাশেই মোতায়েন ছিলেন তিন হাজারের বেশি নিরাপত্তাকর্মী। কোথাও দু’স্তর, কোথাও তিন স্তরের ব্যারিকেড পেরিয়ে চলাচল করতে হচ্ছিল।

আটকদের সরানোর জন্য আগে থেকেই বাসের ব্যবস্থা ছিল। পার্লামেন্ট স্ট্রিট ও যন্তর মন্তরের মাঝের এলাকায় দাঁড় করানো হয়েছিল ডিটিসি এবং বেসরকারি বাস। এক পুলিশ আধিকারিক সংবাদপত্রটিকে জানান, নয়াদিল্লির কাছাকাছি সর্বাধিক পাঁচ হাজার বিক্ষোভকারী পৌঁছতে পারেন ধরে নিয়ে ৬০ থেকে ৭০টি বাস রাখা হয়েছিল। প্রতিবেদনের বর্ণনায়, রাস্তায় পাঁচজনের দল চোখে পড়লেও তাঁদের বাসে তুলে দেওয়া হচ্ছিল।

সেই বাস ও ভ্যানেই আটক ব্যক্তিদের নিয়ে যাওয়া হয় অস্থায়ী আটককেন্দ্রগুলিতে। ছত্রশাল স্টেডিয়ামে দুপুরে পাশাপাশি দেখা যায় দু’টি দৃশ্য: একদিকে খেলোয়াড়দের অনুশীলন, অন্যদিকে পুলিশের গাড়িতে বিক্ষোভকারীদের আগমন। আটকদের মধ্যে ছিলেন কেরলের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন, অভিনেতা রাজ জুৎসি এবং সমাজমাধ্যমের বিষয়বস্তু নির্মাতারা। এক ব্যক্তি দাবি করেন, আত্মীয়কে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সময় পুলিশ তাঁকে আটক করেছে।

নিষেধাজ্ঞার প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতেও। প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাধারণত ব্যস্ত কনট প্লেসে সকালে লোকজনের চেয়ে পুলিশের উপস্থিতিই বেশি চোখে পড়ছিল। মেট্রো পরিষেবা সীমিত হওয়া এবং ট্রেন বাতিলের জেরে বহু যাত্রী বিকল্প পথ খুঁজতে বাধ্য হন। বাস, অটো ও অ্যাপভিত্তিক গাড়ির চাহিদা বাড়ে। আনন্দবিহার এবং কাশ্মীরি গেট বাস টার্মিনালে পৌঁছনোর চেষ্টা করেন অনেকে। কিছু পরিবার গন্তব্যে পৌঁছতে বাসের সাহায্য নেয়।

বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরেও ছিল নজরদারি। জেএনইউ এবং জামিয়ার আশপাশে ব্যারিকেড, পুলিশের বাস ও চলাচলে নিয়ন্ত্রণের কথা উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। ক্লাস স্থগিত ও পরীক্ষা পিছিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি ছাত্রনেতাদের গৃহবন্দি রাখার অভিযোগ ওঠে। ফলে বিক্ষোভস্থল থেকে দূরের এলাকাতেও স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হয়।

খবর সংগ্রহেও বাধার মুখে পড়েন সাংবাদিকেরা। পরিচয়পত্র পরীক্ষা করা হচ্ছিল; কখনও ডিজিটাল পরিচয়পত্র গ্রহণ করা হয়নি। ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ থাকায় আটকের ভিডিও অনেক পরে প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদন পাঠাতে ওয়াইফাইয়ের খোঁজে পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানার বাইরে জড়ো হন সাংবাদিকেরা। কয়েকটি ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিককে আটক করার খবরও সামনে আসে। অনেক নিরাপত্তাকর্মীর পোশাকে লাগানো ছিল ক্যামেরা। পুলিশের বক্তব্য, বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে কথাবার্তা ও ঘটনাক্রম নথিবদ্ধ রাখতেই এই ব্যবস্থা, যাতে পরে অভিযোগ উঠলে রেকর্ড দেখা যায় এবং ঘটনার বিবরণ মেলে।

সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে পুলিশ সূত্র উদ্ধৃত করে জানানো হয়, দিনভর দিল্লিতে সাত হাজারের বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছে। সিজেপি নেতা অভিজিৎ দিপকে এবং তাঁর দুই সহকর্মীকে বিমান থেকে আটক করা হয়। অন্যদিকে, কয়েকটি জায়গায় পাথর ছোড়া এবং নিরাপত্তাকর্মীদের আহত হওয়ার খবরও জানিয়েছে সংবাদসংস্থাটি।

এই অভিযান নিয়ে রাজনৈতিক চাপানউতোরও তীব্র হয়। বিরোধী নেতারা ব্যাপক ধরপাকড়ের সমালোচনা করেন। দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্ত পাল্টা অভিযোগ করেন, বিরোধীরা রাজধানীর স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত করতে চাইছেন। সিজেপি অবশ্য আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথা জানায়। শনিবারের শেষে তাই রাজধানীর ছবিতে পাশাপাশি থেকে যায় জনশূন্য সমাবেশস্থল, পথে আটকে পড়া সাধারণ মানুষ এবং পুলিশি হেফাজতে থাকা প্রতিবাদকারীরা।