বাংলাস্ফিয়ার: দিল্লির সহকারী পুলিশ কমিশনার বিবেক ভগতের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার অভিযোগ তুলেছিলেন এক মহিলা সাংবাদিক। এবার সেই সাংবাদিকের বিরুদ্ধেই জাতপাত তুলে অপমানের অভিযোগে মামলা দায়ের করল দিল্লি পুলিশ। ভগতের অভিযোগের ভিত্তিতে মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর, পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানায় এফআইআর নথিভুক্ত হয়েছে। তফসিলি জাতি ও জনজাতির বিরুদ্ধে অত্যাচার প্রতিরোধ আইন বা এসসি/এসটি আইনের পাশাপাশি সরকারি কাজে বাধা এবং ফৌজদারি মানহানির অভিযোগও আনা হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত ৩ অক্টোবর। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণের দাবিতে আয়োজিত প্রতিবাদের সময় যন্তর মন্তরের কাছে বুটা সিং গোলচত্বরে কর্তব্যরত ছিলেন ভগত। তাঁর অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট সাংবাদিক তাঁর পোশাকের নামফলক দেখে জাতিগত পরিচয় সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্য করেন। তিনি কীভাবে এসিপি হয়েছেন, তা নিয়েও কটাক্ষ করা হয় বলে অভিযোগ। ভগত জানিয়েছেন, তিনি মেঘ বা মেঘওয়াল তফসিলি জাতিভুক্ত।
ভগতের দাবি, প্রকাশ্যে অন্যদের সামনে তাঁকে হেয় করার উদ্দেশ্যেই ওই মন্তব্য করা হয়েছিল। তবে তিনি প্রথমে তা উপেক্ষা করে দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। তাঁর অভিযোগ অনুযায়ী, বেলা আড়াইটে নাগাদ বিক্ষোভকারীরা যন্তর মন্তরের দিকে এগোতে চাইলে পুলিশ তাঁদের সরে যেতে বলে। এলাকায় ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১৬৩ ধারায় বিধিনিষেধ কার্যকর থাকার কথা জানানো হয়। নির্দেশ না মানায় তাঁদের আটক করে বাসে তোলা শুরু হয়।
পুলিশকর্তার বক্তব্য, প্রায় তিনটে নাগাদ আটক ব্যক্তিদের বহনকারী একটি বাসের যাওয়ার পথ পরিষ্কার করার সময় ওই সাংবাদিক তাঁর বিরুদ্ধে যৌন নিগ্রহের অভিযোগ তোলেন। সাংবাদিক ও তাঁর সঙ্গীরা বারবার তাঁর মুখোমুখি হয়ে প্রশ্ন করেন এবং সরকারি কাজে বাধা দেন বলেও অভিযোগ করেছেন ভগত। তাঁর আরও দাবি, সন্ধ্যায় পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানার বাইরে বিক্ষোভ এবং পরে সমাজমাধ্যমে প্রচারের মাধ্যমে তাঁকে যৌন অপরাধী হিসেবে তুলে ধরা হয়। এতে তাঁর মানসিক আঘাত ও সম্মানহানি হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
অন্যদিকে, মহিলা সাংবাদিকের অভিযোগ, পুলিশের ধরপাকড়ের খবর সংগ্রহ করার সময় ভগত তাঁকে অনুপযুক্তভাবে স্পর্শ করেছিলেন। আরও দুই মহিলা সাংবাদিকও পুলিশের বিরুদ্ধে হেনস্থার অভিযোগ জানিয়েছেন। দিল্লি পুলিশ অভিযোগগুলি ক্রাইম ব্রাঞ্চে পাঠিয়েছে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অভিযোগকারীদের বক্তব্য নথিভুক্ত করা হয়েছে এবং ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করার কথা জানিয়েছে পুলিশ। অনুসন্ধানে এখনও কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর কথা জানানো হয়নি।
ডেপুটি পুলিশ কমিশনার নেহা যাদব এর আগে জানিয়েছিলেন, অভিযোগকারী মহিলাদের চিকিৎসা পরীক্ষা করানো হয়েছে। ঘটনার কোনও ভিডিও কারও কাছে থাকলে তা ক্রাইম ব্রাঞ্চকে দেওয়ার আবেদনও করেন তিনি। পুলিশের বক্তব্য, জমায়েতের উপর বিধিনিষেধের কথা জানানোর পরেও বিক্ষোভকারীরা না সরায় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। তবে সেই বক্তব্য এবং যৌন হেনস্থার অভিযোগ পৃথক বিষয়; অভিযোগগুলি খতিয়ে দেখার প্রক্রিয়া এখনও চলছে।
এই বিতর্কের মধ্যেই ভগতকে অতিরিক্ত ডেপুটি পুলিশ কমিশনারের সাময়িক দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখা হয়েছিল। দিল্লি সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, অভিযোগের সম্পূর্ণ তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নতুন দায়িত্ব না দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন ভগত নিজেই। ফলে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের নিষ্পত্তি এবং সাংবাদিকের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া নতুন মামলার তদন্ত—দুই প্রক্রিয়ার দিকেই এখন নজর রয়েছে।
সাংবাদিকের যৌন হেনস্থার অভিযোগের ভিত্তিতে তখনও ভগতের বিরুদ্ধে এফআইআর হয়নি। তাঁর পাল্টা অভিযোগে অবশ্য মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। এই পর্যায়ে জাতিগত অপমান কিংবা যৌন হেনস্থা—কোনও অভিযোগকেই প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে ধরে নেওয়া যায় না। পুলিশের কাছে জমা দেওয়া বক্তব্য, প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ এবং প্রাসঙ্গিক দৃশ্যপ্রমাণ যাচাইয়ের মধ্য দিয়েই ঘটনার প্রকৃত ক্রম স্পষ্ট হওয়ার কথা। একই ঘটনাকে ঘিরে ওঠা পরস্পরবিরোধী বক্তব্যগুলি সমান গুরুত্ব দিয়ে যাচাই করা জরুরি। তদন্তের ফল প্রকাশের আগে অভিযোগ এবং প্রতিষ্ঠিত তথ্যের পার্থক্য স্পষ্ট রাখাও তাই অত্যন্ত প্রয়োজন।