বাংলাস্ফিয়ার: গন্তব্য যন্তর মন্তর। কিন্তু সেখানে পৌঁছনোর রাস্তাই শনিবার হয়ে উঠল একের পর এক ব্যারিকেড, তল্লাশিচৌকি এবং নিরাপত্তাবাহিনীর ঘেরাটোপ। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে ডাকা বিক্ষোভ ঘিরে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ অংশে চলাচলে কড়া নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়। দিল্লি পুলিশ ও কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশবাহিনীর উপস্থিতিতে পরিচিত পথগুলির চেহারা বদলে যায়। ‘দ্য হিন্দু’র দেওয়া সরেজমিন প্রতিবেদনের বিবরণে উঠে এসেছে এই অবরুদ্ধ যাত্রাপথের ছবি।

ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআরে অনিয়মের অভিযোগে ককরোচ জনতা পার্টি এবং বিভিন্ন ছাত্র ও বাম সংগঠন এই কর্মসূচির ডাক দিয়েছিল। বিক্ষোভকারীদের দাবি, ভোটাধিকার নিয়ে ওঠা প্রশ্নের জবাব দিতে হবে নির্বাচন কমিশনকে। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগও চান তাঁরা। কমিশন এবং বিজেপি অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ফলে নির্বাচন পরিচালনার নিরপেক্ষতা নিয়ে বিরোধের মধ্যেই শনিবারের প্রতিবাদকে ঘিরে তৈরি হয় উত্তেজনা।

ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১৬৩ ধারায় বিধিনিষেধ জারি করে পুলিশ। সমাবেশে যোগ না দেওয়ার জন্য আগেই সতর্ক করা হয়েছিল মানুষকে। পুলিশের বক্তব্য, আগের আন্দোলনে আয়োজকেরা নির্ধারিত শর্ত মানেননি; এবারের আবেদনও যথেষ্ট আগে জমা পড়েনি। সেই কারণ দেখিয়ে অনুমতি প্রত্যাখ্যান করা হয়। সংসদ সংলগ্ন এলাকায় মাইকে বিধিনিষেধের কথা ঘোষণা এবং তা ভাঙলে আইনি ব্যবস্থার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছিল।

শনিবার শহরের বিভিন্ন প্রবেশপথ ও প্রধান রাস্তায় যানবাহন পরীক্ষা করেন নিরাপত্তাকর্মীরা। বাসে উঠেও বিক্ষোভে যোগ দিতে যাওয়া লোকজনের খোঁজ চলে। যন্তর মন্তরে পৌঁছনোর আগেই বহু মানুষকে আটক করা হয়। রয়টার্সের খবর অনুযায়ী, আটক হন দু’হাজারের বেশি মানুষ। ফলে আন্দোলনের নির্ধারিত জমায়েতস্থলের বদলে সেদিকে যাওয়ার পথগুলিই হয়ে ওঠে পুলিশি নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিবাদীদের এগোনোর চেষ্টার প্রধান ক্ষেত্র।

যোগাযোগেও ছিল বাধা। জনপথ ও কর্তব্যপথের সংযোগস্থলকে কেন্দ্র করে চার কিলোমিটার ব্যাসার্ধে শুক্রবার রাত দশটা থেকে চব্বিশ ঘণ্টার জন্য মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়। একাধিক মেট্রো স্টেশনে প্রবেশ ও প্রস্থানে বিধিনিষেধ এবং ট্রেন বাতিলের সিদ্ধান্তও যাতায়াতকে জটিল করে তোলে। কড়াকড়ির প্রভাব তাই বিক্ষোভস্থলের আশপাশ ছাড়িয়ে রাজধানীর পরিবহণ ব্যবস্থাতেও পড়ে। যন্তর মন্তরমুখী মানুষদের সামনে একই সঙ্গে দেখা দেয় রাস্তা, গণপরিবহণ ও অনলাইন যোগাযোগের বাধা।

তবু জমায়েতের চেষ্টা থামেনি। যন্তর মন্তরের কাছে পৌঁছতে না পেরে ছোট ছোট দলে অন্য জায়গায় প্রতিবাদ শুরু করেন ছাত্রছাত্রী এবং তরুণেরা। আইএনএ মেট্রো স্টেশন, দিল্লি হাট ও সফদরজং বিমানবন্দরের উড়ালপুলের কাছে বিক্ষোভের খবর পাওয়া যায়। কোথাও মিছিল এগোয়, কোথাও পুলিশের সঙ্গে মুখোমুখি অবস্থান তৈরি হয়। আইসা নেত্রী নেহা বোরাসহ কয়েক জনকে আটক করার পরে তাঁদের নিয়ে যাওয়া পুলিশের গাড়ি আটকানোর চেষ্টাও করেন বিক্ষোভকারীরা। একটি স্থানে বাধা পড়ার পর অন্যত্র জমায়েতের এই প্রবণতা দিনভর আন্দোলনের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হয়ে ওঠে।

ধরপাকড়ের আওতা শুধু ছাত্র বা সংগঠকদের মধ্যে সীমিত ছিল না। বিরোধী রাজনৈতিক নেতা, আইনজীবী এবং খবর সংগ্রহ করতে যাওয়া সাংবাদিকদেরও আটক করার খবর আসে। সুপ্রিম কোর্ট থেকে যন্তর মন্তরের দিকে যাওয়া আইনজীবীদের আটক নিয়ে প্রধান বিচারপতির হস্তক্ষেপ চায় সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন। সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের কাজ করতে বাধা দেওয়ার অভিযোগও ওঠে। এর ফলে বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ঘটনাস্থলের খবর সংগ্রহ এবং আটক ব্যক্তিদের আইনি সহায়তা পাওয়ার বিষয়ও সামনে আসে।

দিনের ঘটনাপ্রবাহে স্পষ্ট, যন্তর মন্তরে বড় জমায়েত আটকানো গেলেও রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্তে প্রতিবাদের ছোট ছোট কেন্দ্র তৈরি হয়েছিল। পুলিশের বিধিনিষেধ এবং বিক্ষোভকারীদের বিকল্প পথে এগোনোর চেষ্টা পাশাপাশি চলেছে। নির্ধারিত প্রতিবাদস্থলে পৌঁছনোর প্রশ্ন তাই শেষ পর্যন্ত আরও বড় হয়ে উঠেছে: নাগরিকেরা কোথায় দাঁড়িয়ে তাঁদের আপত্তি জানাবেন, এবং সেই সুযোগ নিশ্চিত করার সঙ্গে নিরাপত্তার ব্যবস্থার সামঞ্জস্য কীভাবে রাখা হবে।