বাংলাস্ফিয়ার: গন্তব্য ছিল যন্তর মন্তর। কিন্তু ব্যারিকেড, পুলিশি ঘেরাটোপ এবং যাতায়াতের বিধিনিষেধ পেরিয়ে সেখানে পৌঁছতে না পেরে শনিবার বিক্ষোভকারীদের অনেকে জড়ো হলেন আইএনএ এলাকার দিল্লি হাটের কাছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে ছাত্রছাত্রী ও অন্য প্রতিবাদকারীদের ছোট ছোট জমায়েতে এলাকাটি হয়ে উঠল বিকল্প বিক্ষোভস্থল। পরে পুলিশ সেখান থেকেও বহু মানুষকে আটক করে। দুপুরে এইমস মেট্রো স্টেশন হয়ে অনেকে দিল্লি হাটের দিকে আসেন। জমায়েতে বহু মানুষ ছিলেন, যাঁরা কোনও সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত না হয়েও প্রতিবাদে শামিল হতে এসেছিলেন।
ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ ঘিরে এই আন্দোলন। ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজেপি এবং বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলির ডাকে প্রতিবাদে যোগ দিতে রাজধানীতে এসেছিলেন বিভিন্ন জায়গার মানুষ। তাঁদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে নাগরিকদের ভোটাধিকার বিপন্ন হচ্ছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবির পাশাপাশি এসআইআর ঘিরে ওঠা প্রশ্নগুলির জবাবও চাইছেন আন্দোলনকারীরা।
যন্তর মন্তরের আশপাশে ধরপাকড় শুরু হওয়ার পরে অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন বা আইসা-র নেত্রী নেহা বোরা সমাজমাধ্যমে দিল্লি হাটে জমায়েতের আহ্বান জানান। তাঁর বার্তা ছিল, দিল্লি হাটই আজ তাঁদের যন্তর মন্তর। ফলে মূল বিক্ষোভস্থলে পৌঁছতে না পারা মানুষের কাছে নতুন জমায়েতের খবর পৌঁছে যায়। পুলিশের বাধার মুখে কর্মসূচির কেন্দ্র সরে আসে দক্ষিণ দিল্লির দিকে।
নেহার সঙ্গে আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ, সমাজকর্মী যোগেন্দ্র যাদব এবং সিপিআইএমএল লিবারেশনের সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্যও আইএনএ এলাকার কাছে আটক হন। নেহা পরে জানান, দিল্লি হাট থেকে যন্তর মন্তরের দিকে এগোতে থাকা প্রতিবাদকারীদের পুলিশ আটক করেছে। ফলে বিকল্প স্থানে জমায়েত করেও অনেকে ঘোষিত গন্তব্যে পৌঁছতে পারেননি। আন্দোলনের পরিচিত মুখগুলির পাশাপাশি আটক হন সাধারণ অংশগ্রহণকারীরাও।
দিনভর প্রতিবাদের একটি বৈশিষ্ট্য ছিল বারবার জায়গা বদলে জমায়েতের চেষ্টা। বড় সমাবেশের বদলে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ছোট ছোট দল প্রতিবাদ জানায়। দিল্লি হাট ছাড়াও সফদরজং বিমানবন্দরের উড়ালপুল, কনট প্লেসের আশপাশ এবং রাজঘাটের কাছে বিক্ষোভের খবর পাওয়া যায়। কোথায় পৌঁছনো সম্ভব, কোথায় মানুষ জমছেন, সেই খবর আদানপ্রদানে সমাজমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। পুলিশের নজর এড়িয়ে পুনরায় একত্র হওয়ার চেষ্টাও চলতে থাকে।
পুলিশ অবশ্য কর্মসূচির অনুমতি দেয়নি। তাদের বক্তব্য, সম্ভাব্য জমায়েত থেকে আইনশৃঙ্খলার সমস্যা এবং সাধারণ মানুষের অসুবিধা তৈরি হতে পারত। আয়োজকদের পাঠানো বার্তাকে নিয়মমাফিক অনুমতির আবেদন হিসেবেও মানেনি পুলিশ। যন্তর মন্তরের প্রবেশপথ ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে বাহিনী মোতায়েন করা হয়। রাজধানীর একাধিক মেট্রো স্টেশনে প্রবেশ ও বেরোনোর বিধিনিষেধ, রাস্তায় বাধা এবং মধ্য দিল্লিতে মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় প্রতিবাদকারীদের চলাচল ও যোগাযোগ আরও কঠিন হয়।
সন্ধ্যা সাড়ে ছ’টা পর্যন্ত দিল্লি হাটের কাছ থেকে প্রায় ২০০ জনকে আটক করা হয়। এই সংখ্যা গোটা রাজধানীর মোট আটকের হিসাব নয়। হিন্দু কলেজের ছাত্র অতুল ওই সংবাদপত্রকে জানান, নেহা ও সিজেপি নেতা অভিজিৎ দীপকেকে আটক করলেই আন্দোলনকারীদের মনোবল ভেঙে যাবে, এমন ধারণা ভুল। নেতাদের আটকের পরেও প্রতিবাদ চালানোর ইচ্ছার কথাই উঠে আসে তাঁর বক্তব্যে।
সিজেপির শীর্ষ নেতাদের বিমানবন্দরেই আটক করা হওয়ায় দিনের শুরুতে আন্দোলনের সমন্বয়েও সমস্যা তৈরি হয়েছিল। পরিস্থিতি বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে অন্য সংগঠকেরা নতুন জায়গায় মানুষকে একত্র করার চেষ্টা করেন। দিল্লি হাট সেই চেষ্টার অন্যতম কেন্দ্র হয়ে ওঠে। এক জায়গায় জমায়েত আটকে দেওয়ার পরে প্রতিবাদ বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার যে ছবি শনিবার দেখা গেল, তার মধ্যেই এই স্থানের নতুন ভূমিকা স্পষ্ট হয়। দিনের শেষে দিল্লি হাটের ঘটনা দেখাল, যন্তর মন্তরে পৌঁছতে না পারলেও প্রতিবাদ জানানোর চেষ্টা থামেনি।