বাংলাস্ফিয়ারঃ যে ধারাবাহিক বিস্ফোরণে ৫৮ জনের মৃত্যু হয়েছিল, সেই মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত পাঁচ জনকে ৬০ দিনের প্যারোল দিয়েছে তামিলনাড়ু সরকার।

১৯৯৮ সালের কোয়ম্বত্তূর ধারাবাহিক বিস্ফোরণ মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত পাঁচ জনকে ৬০ দিনের প্যারোল দেওয়ায় সমালোচনার মুখে পড়েছেন তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী সি জোসেফ বিজয়। বিজেপির প্রবীণ নেতা লালকৃষ্ণ আডবাণীকে নিশানা করে ঘটানো ওই বিস্ফোরণে ৫৮ জন নিহত হয়েছিলেন।

কারা আধিকারিকদের বক্তব্য অনুযায়ী, কোয়ম্বত্তূর কেন্দ্রীয় সংশোধনাগারে বন্দি ওই পাঁচ জন—মহম্মদ আনসারি, মহম্মদ আলি, মোনাপ্পা ওরফে মহম্মদ হাসান, মহম্মদ আজম এবং নবাব খান—ব্যক্তিগত পরিস্থিতি ও শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে প্যারোলের আবেদন করেছিলেন। তাঁদের বয়স ৪৬ থেকে ৫৫ বছরের মধ্যে।

এক উচ্চপদস্থ আধিকারিকের দাবি, এ বছরের গোড়াতেই তাঁদের আবেদন মঞ্জুর হয়েছিল। তবে বিধানসভা নির্বাচনের সময়ে প্যারোলে মুক্তি স্থগিত রাখা হয়। এ বার তাঁদের নতুন আবেদন অনুমোদিত হয়েছে।

১৯৯৮ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি কোয়ম্বত্তূরে একটি নির্বাচনী সভায় ভাষণ দেওয়ার কথা ছিল আডবাণীর। সাম্প্রদায়িক উত্তেজনায় আচ্ছন্ন শহরে সেই সভার আগে বিভিন্ন জায়গায় পরিকল্পিত ভাবে একের পর এক বিস্ফোরণ ঘটে। নিহত হন ৫৮ জন, আহত হন ২০০ জনেরও বেশি। আডবাণী তখনও সভাস্থলে পৌঁছননি বলে রক্ষা পান।

বিস্ফোরণের তদন্তে তৎকালীন ডিএমকে সরকার বিচারপতি পি আর গোকুলকৃষ্ণনের নেতৃত্বে একটি কমিশন গঠন করেছিল। কমিশন এই হামলার পটভূমিতে ১৯৯৭ সালের শেষ দিকে পুলিশের গুলি ও সাম্প্রদায়িক হিংসায় ১৮ জন মুসলিমের মৃত্যুর ঘটনার যোগসূত্র খুঁজে পায়। বিস্ফোরণ ঠেকাতে ব্যর্থ হওয়ার জন্য পুলিশকেও দায়ী করে কমিশন। তামিলনাড়ুতে বিজেপির হাতে গোনা শক্ত ঘাঁটির অন্যতম কোয়ম্বত্তূর। রাজ্যটির ক্ষমতা অবশ্য এখনও দলটির নাগালের বাইরে।

বিস্ফোরণের পরে পুলিশ ১৬৮ জনকে গ্রেফতার করেছিল। তাঁদের মধ্যে এক জনের মৃত্যু হয় এবং অন্য এক জন রাজসাক্ষী হন। বাকি ১৬৬ জনের বিচার হয়। ২০০৭ সালে তাঁদের মধ্যে ১৫৮ জন দোষী সাব্যস্ত হন; ৪৩ জনকে দেওয়া হয় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। উগ্রপন্থী সংগঠন আল-উম্মার বিরুদ্ধে বিস্ফোরণগুলি সংগঠিত করার অভিযোগ ওঠে। সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা এস এ বাশা এবং সাধারণ সম্পাদক মহম্মদ আনসারি ষড়যন্ত্রের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হন।

পাঁচ দণ্ডিতকে প্যারোল দেওয়ার প্রতিক্রিয়ায় তামিলনাড়ু বিজেপির প্রধান মুখপাত্র নারায়ণন তিরুপতি এক্স-এ লিখেছেন, “রাজ্যের ইতিহাসের অন্যতম অন্ধকার অধ্যায় হয়ে থাকা একটি সন্ত্রাসবাদী হামলার ভয়াবহতাকে ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে লঘু করা যায় না।”

তিরুপতি ২০২৩ সালের ৪ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্টের একটি সিদ্ধান্তের কথাও উল্লেখ করেন। ওই দিন ধারাবাহিক বিস্ফোরণ মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত কয়েক জনের জামিনের আবেদন খারিজ করেছিল শীর্ষ আদালত। দোষী সাব্যস্ত হওয়া এবং সাজার বিরুদ্ধে তাঁদের আপিল তখনও বিচারাধীন ছিল।

তবে এই মামলার দণ্ডিতদের এর আগেও আদালত সাময়িক ছাড় দিয়েছে। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে শারীরিক অসুস্থতার কারণে নয় জন দণ্ডিত অন্তর্বর্তীকালীন ছুটি পেয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে হাই কোর্ট পর্যায়ক্রমে সেই ছুটির মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করেছে। ওই বছরেরই পরে আর এক যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত বন্দি আবদুল হাকিমকে তিন মাসের সাধারণ ছুটি দেয় মাদ্রাজ হাই কোর্ট। তাঁর মস্তিষ্কে টিউমার এবং ক্যানসারের উপসর্গের কথা জানিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন তাঁর স্ত্রী।

এই মামলার প্রধান অভিযুক্ত বাশাও একাধিক বার জামিন পেয়েছিলেন। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ৮৪ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। বাশাকে চিনতেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী প্রভু বালাসুব্রহ্মণ্যম। তিনি এর আগে জানিয়েছিলেন, শেষ জীবনে বাশার আক্ষেপ ছিল পরিবারের সঙ্গে, বিশেষ করে নাতি-নাতনিদের সঙ্গে সময় কাটাতে না পারা নিয়ে।

বালাসুব্রহ্মণ্যমের দাবি, সেই কারণেই যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত বাশা কখনও সাজার বিরুদ্ধে আপিল করেননি। বাশা তাঁকে বলেছিলেন, “আমি শুধু পরিবারের সঙ্গে থাকতে চাই, বছরে কয়েক দিনের জন্য হলেও।” তাঁর আশঙ্কা ছিল, সাজার বিরুদ্ধে আপিল করলে সেই সুযোগ পাওয়া কঠিন হয়ে যেতে পারে।

প্যারোল পাওয়া পাঁচ জনের আইনজীবীরা মন্তব্য করতে চাননি। তবে অন্য আইন বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, প্যারোল বন্দির একটি স্বাভাবিক অধিকার। এর অর্থ দণ্ডিতের সাজার কঠোরতা কমিয়ে দেওয়া নয়।