কনট প্লেস থেকে যন্তর মন্তরকে যুক্ত করেছে সংসদ মার্গের প্রায় ৫০০ মিটার দীর্ঘ অংশ। শুক্রবার সন্ধ্যায় সেখানে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিলেন প্রায় ২৫০ জন। কিন্তু তাঁদের মধ্যে একজনও সাধারণ নাগরিক ছিলেন না। রাস্তা দখল করে ছিলেন দিল্লি পুলিশ, র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স এবং অন্যান্য কেন্দ্রীয় আধাসামরিক বাহিনীর সদস্যরা। দু’পাশে দাঁড়িয়েছিল বিশাল দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণের গাড়ি, বাস ও পুলিশের ভ্যান। কোথাও পুলিশকর্মীরা জটলা করছিলেন, কোথাও ফুটপাতে বসে জলখাবার খাচ্ছিলেন, আবার কোথাও ঊর্ধ্বতন কর্তাদের নির্দেশ শুনছিলেন। মধ্য দিল্লির বিভিন্ন এলাকায় কমবেশি একই দৃশ্য দেখা গিয়েছে।
শনিবার বিপুল জমায়েতের সম্ভাবনায় রাজধানীকে কার্যত দুর্গে পরিণত করা হয়েছে। ভোটার তালিকায় অনিয়মের অভিযোগে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজেপি যে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে, তাতে যোগ দিতে প্রতিবাদকারীরা যাতে যন্তর মন্তরে পৌঁছতে না পারেন, সে জন্য দিল্লি পুলিশ ও কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর ৪০ হাজারেরও বেশি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
বিক্ষোভের নির্ধারিত কেন্দ্র যন্তর মন্তর সম্পূর্ণ ঘিরে ফেলা হয়েছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদেরও সেখানে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। সংযোগকারী রাস্তাগুলিতে ব্যারিকেড বসিয়ে নিরাপত্তাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। ঢোকা-বেরোনোর তিনটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় লাউডস্পিকারে হিন্দি ও ইংরেজিতে সতর্কবার্তা শোনানো হচ্ছিল। ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১৬৩ ধারার আওতায় জমায়েত, মিছিল, রাস্তা অবরোধ এবং অন্যান্য নিষিদ্ধ কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকতে বলা হচ্ছিল।
দিল্লি পুলিশ জানিয়েছে, শনিবারের সম্ভাব্য বিক্ষোভ সামলাতে তাদের ১৫ হাজারের বেশি কর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। শহরে কেন্দ্রীয় বাহিনীর সদস্যসংখ্যা প্রায় ২৬ হাজার হতে পারে।
যন্তর মন্তরে পৌঁছনোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ টলস্টয় মার্গ ও সংসদ মার্গের সংযোগস্থল এবং পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানার বাইরে সবচেয়ে বেশি বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। বিক্ষোভস্থলের দিকে পথচারী ও যানবাহনের যাতায়াত বন্ধ করতে অন্তত দু’স্তরের ব্যারিকেড বসানো হয়েছে। কনট প্লেসের আউটার সার্কেলে অশোকা রোডের গোলচত্বরমুখী রাস্তা বন্ধ করে যানবাহন বিপরীত দিকের রাস্তায় ঘুরিয়ে দেওয়া হচ্ছিল।
এক উচ্চপদস্থ পুলিশকর্তা জানান, নয়াদিল্লি জেলাকে ২০টি অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছে। প্রতিটি অঞ্চলের দায়িত্বে রয়েছেন ডেপুটি কমিশনার পদমর্যাদার এক জন পুলিশকর্তা। বিক্ষোভকারীরা যে সব জায়গা দিয়ে ঢুকতে পারেন, এমন ৩৭টি স্থান চিহ্নিত করে সেখানে ব্যারিকেড বসানো হয়েছে।
মোতায়েনের পরিকল্পনা সম্পর্কে অবহিত আধিকারিকেরা জানান, মহিলা বিক্ষোভকারীদের সামলানো ও আটক করার জন্য কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীকে মহিলা সদস্য পাঠাতেও বলা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে শারীরিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নতুন সদস্যরাও থাকবেন। ওই পুলিশকর্তা জানান, হরিয়ানা ও উত্তরপ্রদেশ থেকে আরও প্রায় পাঁচ হাজার নিরাপত্তাকর্মীও মোতায়েন করা হতে পারে।
বিধিনিষেধ কেবল ব্যারিকেডেই সীমাবদ্ধ নেই। দিল্লি মেট্রো রেল কর্পোরেশন প্রথমে জানিয়েছিল, শুক্রবার রাত ৯টা থেকে শনিবার পর্যন্ত ৫৭টি স্টেশনে যাত্রীদের ঢোকা-বেরোনো বন্ধ থাকবে। তবে গভীর রাতে তালিকা সংশোধন করে স্টেশনের সংখ্যা ৪৫ করা হয়।
পৃথক এক নির্দেশে দিল্লি পুলিশ জনপথ ও কর্তব্য পথের সংযোগস্থলের চার কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে শুক্রবার রাত ১০টা থেকে শনিবার রাত ১০টা পর্যন্ত মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে। ৯ অক্টোবরের ওই নির্দেশ জারি করা হয়েছে টেলিযোগাযোগ আইন, ২০২৩ এবং টেলিযোগাযোগ পরিষেবা সাময়িক স্থগিত রাখার বিধি, ২০২৪-এর আওতায়। এয়ারটেল, ভোডাফোন আইডিয়া, জিয়ো ও এমটিএনএলকে নির্দেশ কার্যকর করতে বলা হয়েছে।
গভীর রাতে জারি করা দিল্লি ট্র্যাফিক পুলিশের পরামর্শবার্তায় মধ্য দিল্লিজুড়ে যান চলাচলে বিঘ্নের আশঙ্কার কথা জানানো হয়। পরিস্থিতি অনুযায়ী সকাল ৬টা থেকে ৩০টি জায়গায় যানবাহন ঘুরিয়ে দেওয়া হতে পারে। প্রভাবিত হতে পারে ধৌলা কুঁয়া উড়ালপুল, ঝান্ডেওয়ালান, মান্ডি হাউস, মিন্টো রোড, দীনদয়াল উপাধ্যায় মার্গ, লোধি রোড উড়ালপুল, প্যাটেল চক, রেল ভবন, উইন্ডসর প্লেস এবং কনট প্লেসের আশপাশের মোড়গুলি। যন্তর মন্তর রোড, অশোকা রোড, সংসদ মার্গ, জনপথ ও বারাখাম্বা রোডেও বিধিনিষেধ থাকতে পারে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া যাতায়াত এড়াতে এবং রেলস্টেশন, আন্তঃরাজ্য বাস টার্মিনাল ও বিমানবন্দরে যাওয়ার পরিকল্পনা আগেই করে রাখতে যাত্রীদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
২ অক্টোবর থেকেই নিরাপত্তা জোরদার করার প্রক্রিয়া গতি পেয়েছে। ওই দিন মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে বিরোধী দল, ছাত্র সংগঠন ও নাগরিক সমাজের কর্মীদের বড় বিক্ষোভে প্রায় এক হাজার জনকে আটক করা হয়। তার পর থেকে কংগ্রেস, ছাত্র সংগঠন এবং নাগরিক সমাজের কর্মীরা মধ্য দিল্লিতে একাধিক বার জমায়েতের চেষ্টা করলেও তা আটকে দেওয়া হয়েছে। নয়াদিল্লি জেলায় চার জনের বেশি মানুষের জমায়েতে নিষেধাজ্ঞা জারি রয়েছে।
অন্য দিকে, আগের বিক্ষোভে হিংসার কথা উল্লেখ করে এত কড়া বিধিনিষেধের পক্ষে যুক্তি দিয়েছে দিল্লি পুলিশ। অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার ও জনসংযোগ আধিকারিক রাজীব রঞ্জন বলেন, “শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক অধিকার। একই সঙ্গে নয়াদিল্লিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান এবং সাংবিধানিক কর্তৃপক্ষের দপ্তর রয়েছে।”
তিনি জানান, জুলাইয়ে প্রায় এক মাস ধরে চলা বিক্ষোভে ২০০-র বেশি পুলিশকর্মী আহত হয়েছিলেন। তাঁর বক্তব্য, যন্তর মন্তর তুলনায় ছোট জায়গা। সেখানে একসঙ্গে প্রায় এক হাজার মানুষ নিরাপদে জমায়েত করতে পারেন। বিধিনিষেধগুলি সাময়িক এবং সতর্কতামূলক বলেও তিনি দাবি করেন।
তীব্র যানজটের আশঙ্কার কথা জানিয়ে রেলও শনিবার ভোর ৪টে থেকে দুপুর ২টোর মধ্যে নয়াদিল্লি ও হজরত নিজামুদ্দিন স্টেশনে পৌঁছনোর কথা ছিল এমন মেল ও এক্সপ্রেস ট্রেন বাতিল করেছে। শুক্রবার দুপুর ২টোর পরে যাত্রার সূচনাস্থল থেকে ছেড়ে শনিবার নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে ওই দুই স্টেশনে পৌঁছনোর কথা ছিল যে ট্রেনগুলির, সেগুলির ক্ষেত্রে এই বাতিলের সিদ্ধান্ত প্রযোজ্য।
রাজধানীজুড়ে হোটেল, অতিথিশালা, হস্টেল, পেয়িং গেস্ট আবাসন এবং অন্যান্য অস্থায়ী থাকার জায়গাতেও পুলিশ যাচ্ছে। সন্দেহজনক বলে মনে করা আবাসিকদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। আধিকারিকেরা জানান, ৮ থেকে ১১ অক্টোবরের মধ্যে কারা থাকছেন, বড় দলে কারা এসেছেন এবং দিল্লিতে আসার কী কারণ জানাচ্ছেন—এসব খতিয়ে দেখতে পুলিশকে বলা হয়েছে। বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে কুড়ি থেকে তিরিশের কোঠার গোড়ার দিকের বয়সি তরুণদের বড় দলগুলির উপর।
জুলাইয়ে সিজেপির নেতৃত্বে আন্দোলনের কয়েক মাস পরে ১০ অক্টোবরের এই বিক্ষোভ। ২০ জুলাই তৎকালীন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে হাজার হাজার মানুষ সংসদের দিকে মিছিল করার চেষ্টা করেছিলেন। বিক্ষোভকারীরা ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা করলে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে এবং লাঠিচার্জ করে। সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু ভিডিওতে কয়েক জন বিক্ষোভকারীকে মারধর করতে দেখা গিয়েছে বলে মনে হয়েছিল। তবে পুলিশের বক্তব্য ছিল, বিক্ষোভকারীরা হিংসাত্মক হয়ে ওঠায় বলপ্রয়োগের প্রয়োজন হয়। আন্দোলন চলে ২৫ জুলাই পর্যন্ত। ওই দিন প্রধান পদত্যাগ করেন।
শুক্রবার যন্তর মন্তরে লাউডস্পিকারের ঘোষণায় সতর্ক করা হয়, নিষেধাজ্ঞা অমান্য করলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। নিরাপত্তাকর্মীদের উপর হামলা বা তাঁদের কাজে বাধা দেওয়া, ভাঙচুর কিংবা হিংসায় অভিযুক্ত হলে আলাদা করে আইনি পদক্ষেপেরও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়। সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদেরও বিক্ষোভকারী ও নিরাপত্তাবাহিনীর কাছ থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে বলা হয়েছে।