বাংলাস্ফিয়ার: সিজেপির বিক্ষোভের আগে কেরলের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন, অভিনেতা রাজ জুৎসি এবং ১৫ জন সাংবাদিককে আটক করল দিল্লি পুলিশ। রাজধানীর বিভিন্ন স্টেডিয়ামকে অস্থায়ী আটককেন্দ্রে পরিণত করে সেখানে নিয়ে যাওয়া হয় কয়েকশো মানুষকে।
১০ অক্টোবর যন্তর মন্তরে ককরোচ জনতা পার্টির বিক্ষোভ কর্মসূচির আগে দিল্লির বিভিন্ন জায়গা থেকে কয়েকশো মানুষকে তুলে নিয়ে বাস ও ভ্যানে করে অস্থায়ী আটককেন্দ্রগুলিতে পৌঁছে দেয় পুলিশ। তাঁদের মধ্যেই ছিলেন বিজয়ন, জুৎসি এবং সাংবাদিকেরা। রাজধানীর ১৩টি জেলার সবক’টিতেই এমন কেন্দ্র তৈরি করা হয়। এর মধ্যে ছিল উত্তর দিল্লির ছত্রশাল স্টেডিয়াম, যন্তর মন্তর থেকে যার দূরত্ব প্রায় ১৩ কিলোমিটার। বওয়ানার রাজীব গান্ধী স্টেডিয়ামেও আটক ব্যক্তিদের রাখা হয়। সেটি বিক্ষোভস্থল থেকে প্রায় ৩৮ কিলোমিটার দূরে।
দুপুর নাগাদ ছত্রশাল স্টেডিয়ামে দেখা যায়, আটক ব্যক্তিদের নিয়ে আসার তৎপরতার পাশাপাশি ক্রীড়া কমপ্লেক্সের দৈনন্দিন কাজকর্মও চলছে। খেলোয়াড়েরা অনুশীলন করছেন, আর সেই সময়ই আটক ব্যক্তিদের নিয়ে ঢুকছে পুলিশের বাস। প্রবেশপথের কাছে একটি বড় তাঁবুতে সেখানে মোতায়েন পুলিশ ও কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের খাবার, পানীয় জল এবং জলখাবার দেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছিল।
কমপ্লেক্সের ভিতরে মূল ক্রীড়াঙ্গনের কাছে পুলিশের গাড়িগুলি থামছিল। পুলিশকর্মীরা আটক ব্যক্তিদের পরিচয় ও অন্যান্য তথ্য সংগ্রহ করছিলেন। সূত্রের খবর, সে দিন সকালে যন্তর মন্তর রোডের কেরল হাউসের কাছে পিনারাই বিজয়নকে আটক করা হয়। তিনি তখন স্টেডিয়াম চত্বরেই ছিলেন।
আটক ব্যক্তিদের বহনকারী পুলিশের একটি গাড়ির ভিতর থেকে কথা বলেন সিপিআই(এম) কর্মী এ আর সিন্ধু। তাঁর অভিযোগ, মহিলা বিক্ষোভকারীদের পোশাক ছিঁড়ে দেওয়া হচ্ছিল। তাঁদের পরবর্তী গন্তব্য কোথায় হবে, তা নিয়ে পুলিশও নিশ্চিত ছিল না বলে দাবি করেন তিনি।
সিন্ধু বলেন, “মহিলাদের পোশাক ছিঁড়ে দেওয়া হচ্ছে… আমাদের কোথায় নিয়ে যাবে, পুলিশ তা-ই জানে না। এখন আমাদের বুরারি নিয়ে যাবে।”
আটক করার পর থেকে তাঁদের বারবার এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
তাঁর অভিযোগ, “এই নিয়ে তৃতীয় জায়গায় আমাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হল। আটক করার পর থেকে ওরা আমাদের এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ঘুরিয়ে বেড়াচ্ছে। এখানে নিয়ে আসা হল দ্বিতীয় জায়গা হিসেবে। এখন আবার এখান থেকেও চলে যেতে বলছে।”
সকালজুড়েই আটক ব্যক্তিদের নিয়ে আসা ও অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজ চলতে থাকে। বেলা ১১টার আগে প্রায় ছ’জনকে স্টেডিয়ামে আনা হয়েছিল। পরে সেই দলটিকেই দিল্লি পুলিশের একটি বাসে বেরিয়ে যেতে দেখা যায়। কমপ্লেক্স ছেড়ে যাওয়া একটি ভ্যানে চার-পাঁচজন আটক ব্যক্তির মধ্যে ছিলেন অভিনেতা রাজ জুৎসিও।
এর কিছুক্ষণের মধ্যেই আরও একটি বাস এসে পৌঁছয়। ভিতরে থাকা লোকজন স্লোগান দিচ্ছিলেন, “ভোট চোর, গদি ছাড়!” এবং “ইনকিলাব জিন্দাবাদ!”
দুপুর নাগাদ অন্য একটি দলের সদস্যেরা জানান, তাঁদের নয়াদিল্লি রেলস্টেশন এবং মধ্য দিল্লির চেমসফোর্ড রোড থেকে তুলে আনা হয়েছে। এর পরে বিক্ষোভের খবর সংগ্রহ করতে যাওয়া ১৫ জন সাংবাদিককে স্টেডিয়ামে নিয়ে আসা হয়। নিউজলন্ড্রির সাংবাদিক অনমোল প্রীতম জানান, মোট ১৫ জন সাংবাদিককে আটক করা হয়েছে।
প্রীতম বলেন, “আমরা খবর সংগ্রহ করছিলাম। সেই সময় সব সাংবাদিককে আটক করা হয়। আমরা চারজন একসঙ্গে নয়াদিল্লি রেলস্টেশনে রিপোর্টিং করছিলাম। সেখান থেকে তুলে এই বাসে করে আমাদের এখানে নিয়ে এসেছে।”
একই বাসের ভিতর থেকে অন্য এক আটক ব্যক্তি চিৎকার করে জানান, তাঁদের ফোন কেড়ে নেওয়া হয়েছে।
পরে বিক্ষোভকারীদের নিয়ে আরও একটি বাস কমপ্লেক্সে ঢোকে। সে দিন সকালে পুলিশি অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে আটক ব্যক্তিদের নিয়ে সেখানে আসা বড় গাড়িগুলির মধ্যে সেটি ছিল সপ্তম। ওই দলটিকে শালিমার বাগের একটি সরকারি স্কুলে নিয়ে যাওয়া হয়। স্কুলটিকেও আটককেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছিল।
অন্যদিকে, বওয়ানার রাজীব গান্ধী স্টেডিয়ামে আটক ব্যক্তিদের রাখার জন্য অ্যাথলেটিক্সের জায়গাটি ঘিরে দেওয়া হয়েছিল। সেখানে থাকা পুলিশকর্মীরা জানান, বেলা ১১টার মধ্যে ১৭ জন পুরুষকে সেখানে আনা হয়েছে।
তাঁদেরই একজন, মধ্যবয়স্ক এক ব্যক্তি, দাবি করেন যে বিক্ষোভের সঙ্গে তাঁর কোনও সম্পর্ক নেই। এক আত্মীয়কে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সময় মহাদেব রোড থেকে তাঁকে তুলে আনা হয় বলে জানান তিনি।
পুলিশের বাসের ভিতর থেকে তিনি বলেন, “বিক্ষোভের সঙ্গে আমার কোনও সম্পর্ক নেই। আমি এক আত্মীয়কে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছিলাম। মধ্য দিল্লির মহাদেব রোডে কেন এসেছি, সেই প্রশ্ন করে ওরা আমাকে তুলে নিয়ে এল।”
তাঁর পিছনে বসে থাকা সমাজমাধ্যমের দুই কনটেন্ট নির্মাতা জানান, যন্তর মন্তরের কাছে রিল তৈরি করার সময় তাঁদের আটক করা হয়েছে। স্টেডিয়ামের ভিতরে এক পুলিশকর্মীকে এক তরুণ আটক ব্যক্তিকে ধূমপান করতে বারণ করতেও দেখা যায়।