মহাবিশ্বের অসীম ব্যাপ্তি, কোটি কোটি গ্যালাক্সি, নক্ষত্র আর অজস্র গ্রহের ভিড়ে কেন কেবল এই নীল গ্রহে—আমাদের পৃথিবীতেই ডানা মেলল প্রাণের স্পন্দন? মানব সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই দার্শনিক থেকে শুরু করে আধুনিক বিজ্ঞানী—সকলকেই তাড়িয়ে বেরিয়েছে এই একটি মৌলিক প্রশ্ন। নির্জীব পদার্থের স্তূপ থেকে কীভাবে প্রথম সজীব কোষের জন্ম হয়েছিল, সে এক অধরা রহস্য। সেই চিরন্তন ও ঐতিহাসিক প্রশ্নের উত্তর খোঁজার গবেষণায় এবার এক যুগান্তকারী ও রোমাঞ্চকর তথ্য উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী 'সাইন্সডেইলি' (ScienceDaily)-তে প্রকাশিত এক রিপোর্টে।

বিজ্ঞানীদের নতুন এই আবিষ্কার আদিম পৃথিবীতে প্রাণের সূচনালগ্ন বা 'অরিজিন অফ লাইফ' (Origin of Life) সম্পর্কিত আমাদের বহু পুরনো ধারণাকে আমূল বদলে দিতে পারে। সায়েন্সডেইলিতে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গবেষকেরা এমন কিছু সুনির্দিষ্ট অণুর গঠন এবং জটিল রাসায়নিক প্রক্রিয়ার সন্ধান পেয়েছেন, যা শত শত কোটি বছর আগে নির্জীব রাসায়নিক উপাদান থেকে প্রথম জীবনকণা গড়ে ওঠার রূপরেখাটি স্পষ্ট করে তোলে।

নির্জীব থেকে সজীব: অধরা সেই ‘মিসিং লিঙ্ক’

প্রায় ৪৫০ কোটি বছর আগে তরুণ পৃথিবীর পরিবেশ ছিল অত্যন্ত ভয়ানক ও প্রতিকূল। ফুটন্ত লাভা, বিষাক্ত গ্যাস এবং অতিবেগুনি রশ্মির তাণ্ডবের মাঝে কীভাবে রাসায়নিক বিবর্তন (Chemical Evolution) ঘটেছিল, তা বোঝার ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরেই একটি বড় ফাঁক বা 'মিসিং লিঙ্ক' ছিল।

নতুন এই গবেষণায় দেখা গেছে, আদিম পৃথিবীর সেই চরম প্রতিকূল পরিবেশে নির্দিষ্ট কিছু জৈব অণু (Organic Molecules) এবং প্রোটিনের প্রাথমিক রূপ কীভাবে নিজেদের মধ্যে বিক্রিয়া করে কোষের মূল ভিত্তি—যেমন অ্যামিনো অ্যাসিড, আরএনএ (RNA) এবং ডিএনএ-র (DNA) পূর্বসূরি উপাদান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিল। বিজ্ঞানীদের মতে, এটিই ছিল অণুজীব থেকে শুরু করে আজকের বৈচিত্র্যময় প্রাণী ও বুদ্ধিমত্তা সৃষ্টির প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

সৌরজগতের বাইরে কি তবে প্রাণের সংকেত?

এই আবিষ্কারের প্রভাব শুধুমাত্র আমাদের নিজস্ব গ্রহ বা মানবজাতির উৎপত্তির ইতিহাস অনুধাবনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং অ্যাসট্রোবায়োলজির (Astrobiology) ক্ষেত্রেও এর সুদূরপ্রসারী গুরুত্ব রয়েছে। সৌরজগতের বাইরে থাকা অন্যান্য দূরবর্তী এক্সোপ্ল্যানেটে (Exoplanet) প্রাণের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হওয়া সম্ভব কি না, তা মূল্যায়নে এই নয়া রাসায়নিক মডেলটি এক বৈপ্লবিক দিশা দেখাবে।

বিজ্ঞানী মহলের মতে, সাইন্সডেইলি-র প্রকাশিত এই উদ্ভাবন কেবল জীববিজ্ঞানের টেক্সটবইয়ের পুরনো তথ্যকেই পুনর্মূল্যায়ন করবে না, বরং মহাবিশ্বে "আমরা কি সত্যিই একা, নাকি অসীম নক্ষত্ররাজির মাঝে অন্য কোথাও লুকিয়ে রয়েছে প্রাণ?"—সেই প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর আবিষ্কারের যাত্রাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে দিল।