পর্দায় আত্মবিশ্বাসী, ব্যক্তিত্বে অনায়াস—তবু শাহরুখ খানেরও রয়েছে এক অদ্ভুত অস্বস্তি। খালি পায়ে থাকতে নাকি একেবারেই পছন্দ করেন না বলিউডের ‘কিং’। এমনকি সিনেমার দৃশ্যে জুতো খুলতে হলেও অস্বস্তি হয় তাঁর। আর এই অভ্যাসের কথা বলতে গিয়েই মজার ছলে শাহরুখ জানিয়েছিলেন, পা দেখানোর চেয়ে নিজের মনের কথা খুলে বলা তাঁর কাছে অনেক সহজ।
২০২৪ সালে ‘দ্য শোবিজ ইন্ডিয়া আওয়ার’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শাহরুখ বলেছিলেন, “এটা কোনও গোপন কথা নয়। আমি চটি পরি না। খালি পায়ে থাকতে ভাল লাগে না। কেমন অস্বস্তি হয়। ঘুম থেকে উঠে বিছানা থেকে পা নামানোর সঙ্গে সঙ্গেই জুতো পরে নিই। পা মেঝে থেকে তুলে নিলেই কেবল জুতো খুলতে পারি।”
সিনেমায় খালি পায়ে অভিনয়ের প্রয়োজন হলেও অস্বস্তি কাটে না তাঁর। তাই মোজা বা সে ধরনের কিছু পরে নেন। শাহরুখের কথায়, “পা অনাবৃত করতে আমার অস্বস্তি হয়। পা দেখানোর চেয়ে নিজের অন্তর উন্মুক্ত করা সহজ।”
শুনতে মজার হলেও এই অভিজ্ঞতার সঙ্গে অনেকেই নিজেদের মিল খুঁজে পেতে পারেন। মনোচিকিৎসক ও সম্পর্কবিষয়ক প্রশিক্ষক ডেলনা রাজেশের মতে, আত্মবিশ্বাসী মানুষেরও এমন কিছু অস্বস্তি থাকতে পারে, যা বাইরে থেকে দেখলে অপ্রত্যাশিত মনে হয়।
ডেলনা বলেন, “আমরা প্রায়ই ধরে নিই, আত্মবিশ্বাস ব্যক্তিত্বের এমন একটি বৈশিষ্ট্য, যা কারও আছে, কারও নেই। কেউ যদি মঞ্চ মাতাতে পারেন, ক্যামেরার মুখোমুখি দাঁড়াতে পারেন, অনায়াসে কথা বলতে পারেন এবং জনসমক্ষে সবার মনোযোগ সামলাতে পারেন, তা হলে আমরা ভাবি, নিজের প্রতিটি দিক নিয়েই তিনি সমান স্বচ্ছন্দ। মানুষের মন কিন্তু সচরাচর এভাবে কাজ করে না।”
ছোট অস্বস্তির পিছনে কী কারণ?
প্রত্যেক অস্বস্তির পিছনে গভীর কোনও মনস্তাত্ত্বিক কারণ খুঁজতে হবে, এমন নয়। কখনও ব্যক্তিগত পছন্দ, কোনও অনুভূতি বা স্পর্শের প্রতি অনীহা কিংবা দীর্ঘদিনের অভ্যাস থেকেই এমন অস্বস্তি তৈরি হয়।
ডেলনার কথায়, “কখনও কখনও আমাদের কিছু পছন্দ-অপছন্দ তৈরি হয়, কোনও বিশেষ অনুভূতি বা স্পর্শ ভাল লাগে না, অথবা কিছু অভ্যাস এতটাই পরিচিত হয়ে ওঠে যে সেগুলিতেই আমরা স্বচ্ছন্দ বোধ করি। আবার কখনও ঠাট্টা-বিদ্রুপ, কোনও বিব্রতকর অভিজ্ঞতা, চেহারা নিয়ে বারবার মন্তব্য কিংবা বছরের পর বছর নিজের কোনও একটি বৈশিষ্ট্যের দিকে অতিরিক্ত নজর দেওয়ার কারণে সেই বিষয়টি নিয়ে সংকোচ তৈরি হতে পারে।”
অর্থাৎ, বাইরে থেকে কোনও বিষয় তুচ্ছ মনে হলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছে তা অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠতেই পারে। অন্যের চোখে সেই অস্বস্তি কতটা যুক্তিসংগত, তার উপর তার বাস্তবতা নির্ভর করে না।
সব সংকোচ কাটিয়ে উঠতে হবে?
নিজেকে গ্রহণ করার অর্থ নিজের প্রতিটি পছন্দ বা অস্বস্তি জোর করে বদলে ফেলা নয়। শাহরুখ যদি জুতো পরেই থাকতে স্বচ্ছন্দ বোধ করেন, তা হলে তাঁকে খালি পায়ে থাকতেই হবে—এমন কোনও নিয়ম নেই।
ডেলনা বলেন, “শাহরুখ খান যদি জুতো পরেই থাকতে পছন্দ করেন, তা হলে তাঁকে খালি পায়ে থাকতে ভালবাসতেই হবে—মনস্তত্ত্বের দিক থেকে এমন কোনও বাধ্যবাধকতা নেই। নিজেকে গ্রহণ করার অর্থ নিজের প্রত্যেক খেয়াল, পছন্দ কিংবা অস্বস্তি জোর করে মুছে ফেলা নয়।”
তবে নিজের কোনও দিক নিয়ে সংকোচ যখন জীবনযাপনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তখন বিষয়টি নিয়ে ভাবা জরুরি। নিজের চেহারা বা শরীরের কোনও বৈশিষ্ট্য অন্যের চোখে পড়ে যাওয়ার ভয়ে যদি কেউ ঘনিষ্ঠতা, ছবি তোলা, সাঁতার কাটা, সামাজিক মেলামেশা কিংবা পছন্দের পোশাক পরা এড়িয়ে চলেন, তা হলে সেই ভয়ের উৎস খতিয়ে দেখা প্রয়োজন হতে পারে।
ডেলনার মতে, “নিজের চোখে খুঁত বলে মনে হওয়া কোনও বিষয় অন্য কেউ দেখে ফেলবেন—এই প্রবল ভয়ে যদি কেউ ঘনিষ্ঠতা, ছবি তোলা, সাঁতার কাটা, সামাজিক মেলামেশা, বিশেষ কোনও পোশাক পরা কিংবা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা এড়িয়ে চলেন, তা হলে সেই এড়িয়ে চলার পিছনে কোন বিশ্বাস কাজ করছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন হতে পারে।”
আসলে আত্মবিশ্বাস মানেই নিজের প্রতিটি দিক নিয়ে সমান স্বচ্ছন্দ থাকা নয়। কেউ অনায়াসে মনের কথা বলতে পারেন, অথচ নিজের কোনও শারীরিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে পারেন। সাফল্যের শিখরে থেকেও কারও বিশেষ কোনও বিষয়ে সংকোচ থাকতে পারে।
ডেলনা বলেন, “এর মজাটা মানুষের একটি চমৎকার সত্যের মধ্যে লুকিয়ে আছে: নিজের যে দিকগুলি অন্যের সামনে প্রকাশ করতে আমাদের সবচেয়ে বেশি অসুবিধা হয়, সেই অস্বস্তি আমাদের কাছে বাস্তব হয়ে ওঠার জন্য অন্যের চোখে পুরোপুরি যুক্তিসংগত হওয়ার প্রয়োজন নেই।”
দ্রষ্টব্য: প্রতিবেদনটি প্রকাশ্যে উপলব্ধ তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞের বক্তব্যের ভিত্তিতে তৈরি। স্বাস্থ্যসংক্রান্ত নতুন কোনও অভ্যাস বা রুটিন শুরু করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।