ছায়াঘন, সংযত আবহ নির্মাণে সিদ্ধহস্ত চিত্রগ্রাহক পঙ্কজ কুমার। তাঁর দৃশ্যের আছে গভীরে বিঁধে যাওয়ার ক্ষমতা। ‘হায়দার’-এ অশান্ত উপত্যকার মোহময় তুষারের মধ্যে এক মানুষের মানসিক ভারসাম্য ভেঙে পড়ার তীব্রতা হোক, কিংবা ‘তলওয়ার’-এ দিল্লির একটি বাড়ির নিষ্প্রাণ ঘরগুলিতে জমে থাকা নৈতিক ধূসরতা—তাঁর ক্যামেরা সেই অভিজ্ঞতাকে মর্মস্পর্শী করে তোলে। নিজস্ব একটি জগৎ গড়ে তোলাই তাঁর কাজের কেন্দ্রে। তার সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রকাশ দেখা গিয়েছে ‘তুম্বাড়’(Tumbbad)-এর ছায়াময় দৃশ্যবৈভবে, যেখানে তাঁর ছবির গতিময়তা জন্ম দিয়েছিল এক বিধ্বংসী ভয়াল অভিজ্ঞতার।

‘ব্রহ্মাস্ত্র: পার্ট ওয়ান—শিবা’-র কাজ বাদ দিলে পঙ্কজ মূলত বাস্তবধর্মী দৃশ্যায়নের মধ্যেই থেকেছেন। তাঁর নির্মিত দৃশ্য তাই দীর্ঘস্থায়ী, প্রায় ছুঁয়ে দেখার মতো এক বাস্তব অনুভূতি তৈরি করে। সেই কারণেই নীতেশ তিওয়ারির ‘রামায়ণ’-এ তাঁর এই ভিন্ন পথে যাত্রা কৌতূহল জাগায়। রণবীর কাপুর, যশ ও সাই পল্লবী অভিনীত দুই পর্বের এই পৌরাণিক ছবির নির্মাণ বিপুল আয়তনের। এখানে দিগন্ত অনেক বিস্তৃত, জাঁকজমকই স্বাভাবিক রীতি।

শুরুতে কিছুটা ভয় পেয়েছিলেন বলে স্বীকার করেন পঙ্কজ। ৫ নভেম্বর ছবির মুক্তির আগে তিনি বললেন, “আগে যত ছবি করেছি, তার সব কিছুর চেয়ে এটি অনেক বড় হতে চলেছিল। কিন্তু একই সঙ্গে ছবিটির উচ্চাকাঙ্ক্ষা আমাকে প্রবল ভাবে টানছিল।”

শুধু প্রযোজনার বিশালত্ব নয়, ‘রামায়ণ’-এ কাজ করার অভিজ্ঞতা অন্য রকম হওয়ার আর একটি কারণও ছিল। উপমহাদেশের মানুষের কাছে এই মহাকাব্য অতি পরিচিত। পঙ্কজের কথায়, “এই কাহিনি নিয়ে প্রত্যেকেরই নিজস্ব কল্পনা রয়েছে। চ্যালেঞ্জ ছিল এমন ভাবে গল্পটিকে তুলে ধরা, যাতে যাঁরা এর সঙ্গে পরিচিত, তাঁদেরও মন ধরে রাখা যায়। আবার যাঁরা প্রথম এই জগতে প্রবেশ করছেন, তাঁদের কাছেও তা রোমাঞ্চকর হয়ে ওঠে।”

বছরের পর বছর ধরে সিনেমা, চিত্রকলা ও নাটকে নানা আঙ্গিকে এই কাহিনির রূপায়ণ হয়েছে। সাংস্কৃতিক প্রভাবের বিচারে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অভিযোজনগুলির মধ্যে রয়েছে ১৯৮৭ সালে সম্প্রচারিত টেলিভিশন ধারাবাহিক এবং ১৯৯৩ সালের জাপানি অ্যানিমেশন ছবি ‘রামায়ণ: দ্য লেজেন্ড অব প্রিন্স রামা’। অসামান্য কল্পনাশক্তির জোরে জাপানি ছবিটি নিজস্ব এক দৃশ্যভাষা তৈরি করেছিল। বহু বছর আগে দেখা সেই ছবিকে পঙ্কজ “একটি শিল্পকর্ম” বলেই মনে করেন। ছবিটি দেখে মুগ্ধ হওয়ার স্মৃতি এখনও তাঁর মনে রয়েছে।

“সেই সঙ্গে আমরা সকলেই তো ক্যালেন্ডারে রাম-রাবণের ছবি দেখতে দেখতে বড় হয়েছি। আমাদের সময়ে টেলিভিশনের ধারাবাহিকটিও প্রভাব ফেলেছিল,” বললেন তিনি। তবে নিজের কাজের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনও পূর্বনমুনাকে আঁকড়ে থাকতে চান না। “কোনও কিছুকে নতুন ভাবে দেখার সম্ভাবনাই আমাকে উত্তেজিত করে। আমার কাজ সব সময়েই সহজাত বোধ আর কল্পনাশক্তি—দুয়ের মিলিত ফল।”

আসন্ন ছবিটির দৃশ্যেও জাপানি অ্যানিমেশন ছবিটির মতো এক আকর্ষণের আভাস পাওয়া যায়। এখানেও গুরুত্ব পেয়েছে এক কল্পলোকের ভূদৃশ্য নির্মাণ। পঙ্কজ বললেন, “আমাদের কাছে পরিষ্কার ছিল, দৃশ্যরূপের শিকড় গভীর ভাবে ভারতেই থাকতে হবে। আমাদের রং উজ্জ্বল, গাঢ়। পাশ্চাত্যের দেশগুলির মতো এতটা মেপে, মিলিয়ে সাজানো নয়। একটি জায়গায় যদি অজস্র রং একসঙ্গে মিশে থাকে, তা হলে আমরা ভেবেছি সেই মিশ্রণকেই গ্রহণ করব। রঙের তীব্রতা খুব বেশি কমিয়ে দেব না।”

উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি বললেন, বনবাসের সময়ে রাম, সীতা ও লক্ষ্মণের পরনের কমলা রঙের পোশাক অরণ্যের ঘন সবুজের বিপরীতে ফুটে উঠেছে। “দৃশ্যত সেটা সুন্দর লাগছিল। একই সঙ্গে আমরা জানতাম, এই রং আমাদেরই—আমাদের সংস্কৃতি থেকেই উঠে এসেছে।”

তবে এই সব নান্দনিক সিদ্ধান্তের বাইরেও ‘রামায়ণ’-এর দৃশ্যগুলি পরিকল্পনার পিছনে ছিল অত্যন্ত খুঁটিনাটি প্রস্তুতি। কম্পিউটারে তৈরি দৃশ্যচিত্র বা সিজিআই এবং ভিজুয়াল এফেক্টস বা ভিএফএক্সের সাহায্যে ছবির দৃশ্যজগৎ গড়ে তুলতে শুটিং শুরুর আগেই ব্যাপক কাজ হয়েছিল। প্রথমে তৈরি করা হয় কল্পিত দৃশ্যজগতের নকশাচিত্র, যাকে বলা হয় ‘কনসেপ্ট আর্ট’। সেটিই ছিল এই জগৎ নির্মাণের ভিত্তি।

এর পরে আসে আগাম দৃশ্যায়ন বা ‘প্রি-ভিজুয়ালাইজেশন’-এর পর্যায়। ত্রিমাত্রিক চিত্রনির্মাণে দক্ষ একদল শিল্পী কম্পিউটার সফটওয়্যারের সাহায্যে ছবির গোটা জগৎ গড়ে তোলেন। ত্রিমাত্রিক পরিবেশে চরিত্রগুলির চলাফেরাও সেই প্রক্রিয়ার মধ্যে ধরা হয়। পঙ্কজ আরও নিবিড় ভাবে যুক্ত হন যখন প্রতিটি দৃশ্যকে আলাদা আলাদা শটে ভাগ করে পরিকল্পনা করা শুরু হয়। ক্যামেরা কী ভাবে চলবে, আলো কোথায় থাকবে, ফ্রেমের মধ্যে কোন উপাদান কী ভাবে সাজানো হবে—সবই তখন স্থির করা হয়।

“ফলে শুটিং করতে পৌঁছনোর আগেই প্রত্যেকে জানতেন, ঠিক কী করতে হবে। সমস্ত দৃশ্য এ ভাবেই পরিকল্পনা করে তোলা হয়েছে। এই প্রথম কোনও ছবির শুটিং-পূর্ব প্রস্তুতিতে আমি এতটা সময় দিয়েছি। ব্যাপারটা যেন আগাম দৃশ্যায়নের পর্যায়েই গোটা ছবিটি এক বার তৈরি করে ফেলা। তার পরে শুটিংয়ের সময়ে আবার কাজ করা, এবং শুটিং-পরবর্তী পর্যায়ে আরও এক বার। আমরা ছবিটি তিন বার বানিয়েছি,” হেসে বললেন তিনি।

প্রযুক্তির সাহায্যে এত বিপুল আয়োজন, সিজিআই ও ভিএফএক্সে দৃশ্য নির্মাণের মধ্যে আবেগের গভীরতা হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও থাকে। পঙ্কজ জানালেন, নেপথ্যে এত বড় মাপের কর্মকাণ্ড চললেও নীতেশ নিশ্চিত করেছিলেন, ছবির আবেগের প্রবাহ যেন অক্ষুণ্ণ থাকে।

“আবেগটা যদি ঠিক ভাবে ধরতে না পারেন, তা হলে এত প্রযুক্তিগত কাজের কোনও মূল্যই থাকে না,” বললেন পঙ্কজ। তাঁর কথায়, শুটিংয়ের সময়েও প্রয়োজনমতো বদলের সুযোগ ছিল। “আগাম দৃশ্যায়ন শুধু ঠিক করে দেয় ক্যামেরা কী ভাবে চলবে। বাকিটা নির্ভর করে সেই দৃশ্যে অভিনেতারা কী ভাবে অভিনয় করছেন তার উপর। পরিস্থিতির প্রয়োজনে শুটিং চলাকালীন ক্যামেরার কোণ বদলে নেওয়ার স্বাধীনতাও আমাদের ছিল।”

সেটে পরের চ্যালেঞ্জ ছিল সবুজ পর্দার সামনে শুটিং এবং সেই অনুযায়ী আলোর ব্যবস্থা করা। পঙ্কজের মতে, বিস্তীর্ণ খোলা প্রান্তরে বহু চরিত্রকে নিয়ে একটি দৃশ্য দেখানোর সময় সূর্যালোকের মতো আলো তৈরি করা কঠিন। বিশেষত, প্রত্যেকের জন্য একটিমাত্র ছায়া বজায় রাখাটাই ছিল বড় সমস্যা।

“অনেকগুলি আলাদা আলো ব্যবহার করলে একাধিক ছায়া পড়ে। তাতেই বোঝা যায় আলোটা কৃত্রিম। স্বাভাবিক দেখানোর জন্য আমরা আলোর উৎস একটিই রেখেছিলাম। তার জন্য আলো বসানোর একটি বিশাল কাঠামো তৈরি করি। সেখানে অনেকগুলি আলো বসিয়ে কাপড়ের মধ্যে দিয়ে সেই আলো ছড়িয়ে নরম করে নিই,” ব্যাখ্যা করলেন পঙ্কজ।

তার পরেও কিছু দৃশ্য বাইরে, রোদেই তুলতে হয়েছিল। কারণ, সেই সব সেট স্টুডিয়োর মধ্যে ধরানো সম্ভব ছিল না। এর মধ্যে পঙ্কজের সবচেয়ে মনে আছে স্বয়ংবরের দৃশ্যটি। সেখানে রামকে ধনুক তুলে নিয়ে তাতে জ্যা পরাতে হবে। বিরাট একটি প্রাঙ্গণে সেই দৃশ্য ঘটে। চারপাশে বিপুল দর্শকসমাবেশ, সকলেই উত্তেজিত হয়ে সেই ঘটনা দেখছেন।

প্রাকৃতিক আলোয় দৃশ্যটি তোলার সমস্যার কথা মনে করলেন পঙ্কজ। সূর্যের গতিবিধির উপর তো তাঁর কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই। শুটিংয়ের জায়গা আগাম দেখতে গিয়ে সূর্যালোকের গতিপথ ধরে পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি। তাঁর ইচ্ছে ছিল, রাম যখন তির তুলে ধরবেন, তখন সূর্য যেন আকাশের একটি নির্দিষ্ট জায়গায় থাকে। তাতে মুহূর্তটির নাটকীয়তা আরও তীব্র হবে। কিন্তু শুটিংয়ের দিন সূর্য মেঘের আড়ালে ঢেকে থাকায় সমস্ত পরিকল্পনা থমকে গেল।

“সেদিন শটটা আদৌ নিতে পারব কি না, সেই দুশ্চিন্তায় বুক ধড়ফড় করছিল। শুটিংয়ের দিনক্ষণ নিয়েও জটিলতা ছিল। কাজ শেষ করার জন্য আমাদের হাতে শুধু ওই একটি দিনই ছিল। কিন্তু আমি স্থির করেছিলাম, প্রাকৃতিক সূর্যালোকই ব্যবহার করব। দৃশ্যটিকে ভিএফএক্সের সাহায্যে তৈরি করতে চাইনি,” বললেন তিনি।

ঠিক প্রয়োজনের মুহূর্তে সূর্য বেরিয়ে আসায় সমস্যার অবসান হয়। দৃশ্যটি ক্যামেরায় ধরার জন্য তাঁদের হাতে ছিল মাত্র ১৫ মিনিট।

“রণবীরও বুঝেছিল, তখন কতটা তাড়াহুড়ো প্রয়োজন। ও খুব দ্রুত তৈরি হয়ে নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে পড়ল। কী সুন্দর সব অভিব্যক্তি দিয়েছিল! আর সূর্যও ছিল ঠিক সেই জায়গায়, যেখানে আমি চেয়েছিলাম। আমরা কিছু অসাধারণ শট পেলাম। প্রকৃতিতে যখন এমন জাদু ঘটে, তখন মন ভরে যায়,” বললেন পঙ্কজ।

স্টুডিয়োয় নিখুঁত পরিকল্পনা আর বাস্তব জায়গায় গিয়ে শুটিং—এই দুইয়ের মিশ্রণ থেকেই তৈরি হয়েছে ‘রামায়ণ’-এর দৃশ্যজগৎ। এই দু’ভাবে শুটিং করার মধ্যে এক আকর্ষণীয় বৈপরীত্য রয়েছে। ভিএফএক্স ও সিজিআই ব্যবহারে বাস্তবতা যেন অ্যানিমেশনের রূপ পায়। অন্য দিকে, বাস্তব স্থানের প্রত্যক্ষ উপস্থিতি মুহূর্তটিকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দৃঢ় ভাবে বসিয়ে দেয়। প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহার কি কোনও দৃশ্যের বিশ্বাসযোগ্যতায় ব্যাঘাত ঘটায়? পঙ্কজ মনে করেন, কোন পদ্ধতি বেছে নেওয়া হবে, তা নির্ভর করে কী ধরনের গল্প বলা হচ্ছে তার উপর।

“গল্পটি যদি বাস্তবধর্মী কোনও জগতে ঘটে, তা হলে বাস্তব জায়গায় গিয়ে শুটিং করা জরুরি। কিন্তু গল্প যদি কল্পলোকের হয়, তা হলে আসল কথা হল, কতটা শিল্পসম্মত ভাবে আপনি সেই জগৎ গড়ে তুলতে পারলেন। সব দৃশ্যের আয়োজন তো বাস্তবে পাওয়া যায় না। তাই আপনাকে সে সব তৈরি করতে হয়। যে কোনও শিল্পকর্মেরই প্রকাশের নানা পথ রয়েছে। বাস্তবতার মধ্যে দিয়ে তাকে জীবন্ত করে তোলা যায়, আবার কল্পনানির্ভর কৃত্রিমতার মধ্যে দিয়েও যায়। একমাত্র বিচার্য হল, কাজটা আপনি ভাল করতে পেরেছেন কি না।”

নিজের বক্তব্য আরও স্পষ্ট করতে পঙ্কজ সিনেমাকে ব্যাখ্যা করলেন ‘বাস্তবপ্রতীতি’ হিসেবে—অর্থাৎ এমন এক অভিজ্ঞতা, যা দর্শকের কাছে সত্য বলে মনে হয়।

“আপনি যে জগৎ তৈরি করেছেন, তার নিজস্ব সত্যটাই আসল। সেই অভিজ্ঞতা দর্শককে দেওয়ার মতো যথেষ্ট কাজ যদি করে থাকেন, তা হলেই উদ্দেশ্য সফল। শেষ পর্যন্ত আপনি তো শুধু একটি গল্প বলছেন না; সেই গল্প তাঁদের দেখাচ্ছেন।”

‘রামায়ণ’ প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাবে ৫ নভেম্বর।