ক্যাটরিনার প্রসব-পরবর্তী ফিটনেসের ভাবনা: নতুন মায়েদের ওজন কমানোর চাবিকাঠি তাড়াহুড়ো নয়, বরং ধাপে ধাপে শরীরকে সুস্থ করে তোলা।
সন্তান জন্মানোর পর ফের আগের চেহারায় ফিরতে হবে—নতুন মায়েদের ঘিরে সমাজের প্রত্যাশা এমনই। কিন্তু সেই প্রত্যাশার সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে শরীরের উপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করা কি আদৌ বুদ্ধিমানের কাজ? অভিনেত্রী ক্যাটরিনা কাইফের প্রসব-পরবর্তী ফিটনেস নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গি মনে করিয়ে দেয়, মাতৃত্বের পরে সুস্থ হয়ে ওঠার জন্য সময় প্রয়োজন। ওজন কমানোর তাড়ার চেয়ে শরীরের শক্তি, কর্মক্ষমতা ও সামগ্রিক সুস্থতা ফিরে পাওয়াই বেশি জরুরি।
প্রসবের পরে শরীরে নানা ধরনের শারীরিক, হরমোনজনিত ও মানসিক পরিবর্তন ঘটে। পেটের পেশি, শ্রোণিতলের পেশি, অস্থিসন্ধি ও বিপাকক্রিয়ায় পরিবর্তনের পাশাপাশি ঘুমের অভাব এবং নতুন দায়িত্বের চাপও শরীরকে ক্লান্ত করে তুলতে পারে। তাই অন্য কারও সঙ্গে নিজের সুস্থ হয়ে ওঠার তুলনা না করাই ভাল। প্রত্যেকের গর্ভাবস্থা, প্রসবের অভিজ্ঞতা এবং সেরে ওঠার গতি আলাদা।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, প্রসবের পরে ব্যায়াম শুরু করার আগে নিজের শারীরিক অবস্থা বুঝতে হবে এবং প্রয়োজনমতো চিকিৎসকের অনুমতি নিতে হবে। বিশেষ করে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের পরে ক্ষত শুকোনো ও পেটের পেশির নিরাময়ের দিকে নজর দেওয়া জরুরি। দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা, শ্রোণিতে ভারী ভাব, প্রস্রাব ধরে রাখতে অসুবিধা কিংবা ব্যায়ামের সময়ে পেটের মাঝখানে অস্বাভাবিক উঁচু হয়ে ওঠা দেখা দিলে চিকিৎসক বা পেলভিক-হেলথ ফিজিয়োথেরাপিস্টের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
প্রসব-পরবর্তী ফিটনেসের যাত্রা শুরু হতে পারে পাঁচটি ধাপে।
প্রথম ধাপ: সেরে ওঠাই প্রথম কাজ (০–৬ সপ্তাহ)
লক্ষ্য: শরীরকে বিশ্রাম দেওয়া, রক্তসঞ্চালন বজায় রাখা এবং স্বাভাবিক নড়াচড়ায় ধীরে ধীরে ফেরা।
সন্তান জন্মানোর পর প্রথম কয়েক সপ্তাহে ক্যালরি খরচের চেয়ে শরীরকে সেরে ওঠার সুযোগ দেওয়াই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে হালকা ও আরামদায়ক নড়াচড়া দিয়ে শুরু করা যেতে পারে।
কোমল শ্বাসপ্রশ্বাসের অনুশীলন: ডায়াফ্রাম ও পাঁজরের স্বাভাবিক নড়াচড়ার সঙ্গে শ্বাস নেওয়া ও ছাড়ার সমন্বয় ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে।
গোড়ালি ও পায়ের পাতার নড়াচড়া: রক্তসঞ্চালন বজায় রাখতে সাহায্য করে।
ঘাড় ও কাঁধের হালকা ব্যায়াম: পেশির আড়ষ্টতা কমাতে উপকারী হতে পারে।
শ্রোণিতলের পেশি সম্পর্কে সচেতনতা: পেশি আলতোভাবে সংকুচিত করা এবং তার পরে সম্পূর্ণ শিথিল করার অনুশীলন করা যেতে পারে, যদি তা স্বচ্ছন্দ লাগে।
অল্প সময় হাঁটা: চিকিৎসকের পরামর্শ ও শারীরিক অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শুরু করা যায়।
শরীর শিথিল করতে শবাসন বা ধীরে ধীরে শরীরের বিভিন্ন অংশের উপর মনোযোগ দেওয়ার অনুশীলনও কাজে আসতে পারে।
তবে এই পর্যায়ে ক্রাঞ্চ, সিট-আপ, প্ল্যাঙ্ক, দৌড়নো, লাফানো কিংবা ভারী জিনিস তোলার মতো ব্যায়াম এড়িয়ে চলুন। বিশেষত প্রসবের ধরন ও জটিলতার উপর নির্ভর করে ব্যায়াম শুরুর সময় আলাদা হতে পারে।
দ্বিতীয় ধাপ: শ্বাস ও পেশির সমন্বয় (৬–১০ সপ্তাহ)
লক্ষ্য: দেহভঙ্গি ঠিক রাখা এবং পেটের গভীর পেশি ও শ্রোণিতলের পেশির সমন্বয় ফিরিয়ে আনা।
চিকিৎসকের অনুমতি পাওয়ার পরে ধীরে ধীরে ব্যায়ামের পরিধি বাড়ানো যেতে পারে। এই পর্যায়ে জোরে ব্যায়াম করার চেয়ে নিয়ন্ত্রিত নড়াচড়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ডায়াফ্রাম ব্যবহার করে শ্বাসপ্রশ্বাস: শ্বাস নেওয়ার সময়ে পাঁজরের খাঁচা স্বাভাবিক ভাবে প্রসারিত হতে দিন। শ্বাস ছাড়ার সময়ে তলপেটের পেশি আলতোভাবে সক্রিয় করুন। পেট জোর করে ভিতরে টানবেন না কিংবা শ্বাস আটকে রাখবেন না।
পেলভিক টিল্ট: শ্রোণি আলতোভাবে সামনে-পিছনে কাত করার এই অনুশীলন কোমরের নীচের অংশের নড়াচড়া সহজ করতে সাহায্য করে।
সহজ ক্যাট-কাউ: মেরুদণ্ডের নমনীয়তা বাড়াতে এবং শ্বাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে শরীরের নড়াচড়ার সমন্বয় উন্নত করতে সহায়ক হতে পারে।
হালকা হাঁটা: শরীরের সহনশীলতা অনুযায়ী ধীরে ধীরে হাঁটার সময় বাড়ান।
কোনও ব্যায়ামে ব্যথা বা অস্বস্তি হলে তা বন্ধ করুন। প্রসবের পরে সুস্থ হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে শরীরের সংকেত উপেক্ষা করে ব্যায়ামের মাত্রা বাড়ানো উচিত নয়।
তৃতীয় ধাপ: ধড় ও শ্রোণিতলের শক্তি ফেরানো (১০–১২ সপ্তাহ)
লক্ষ্য: শরীরের স্থিতিশীলতা, পেশির নিয়ন্ত্রণ এবং স্বাভাবিক চলাফেরার ক্ষমতা বাড়ানো।
শরীর সেরে ওঠার অগ্রগতি সন্তোষজনক হলে আরও কিছু পরিকল্পিত ব্যায়াম যোগ করা যেতে পারে। তবে ব্যথা, শ্রোণিতে ভারী ভাব বা প্রস্রাব ধরে রাখতে অসুবিধা থাকলে ব্যায়ামের ধরন বদলানো এবং বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
সুপ্ত বদ্ধকোণাসন: শুয়ে করা এই বিশ্রামদায়ক যোগাসন নিতম্ব ও কুঁচকির অংশের পেশি শিথিল করতে সাহায্য করতে পারে।
সহজ গ্লুট ব্রিজ: নিতম্বের পেশি শক্তিশালী করে এবং কোমর ও শ্রোণির স্থিতিশীলতা বাড়াতে সাহায্য করে।
দাঁড়িয়ে ধড় ঘোরানো: আলতো ও নিয়ন্ত্রিত নড়াচড়ায় মেরুদণ্ডের গতিশীলতা বাড়ানো যায়।
পাশে ঝোঁকা: শরীরের দু'পাশের পেশির নমনীয়তা বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে।
এই পর্যায়ে পেটের পেশির উপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করা বা শ্বাস আটকে ব্যায়াম করা এড়িয়ে চলুন। পেটের মাঝখানে অস্বাভাবিক উঁচু হয়ে ওঠা, ব্যথা কিংবা শ্রোণিতে চাপ অনুভব করলে ব্যায়াম থামিয়ে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
চতুর্থ ধাপ: দৈনন্দিন কাজের জন্য শরীরকে তৈরি করা (৩–৪ মাস বা তার পরে)
লক্ষ্য: পেশির সহনশীলতা বাড়ানো এবং দৈনন্দিন কাজের জন্য শরীরকে আরও সক্ষম করে তোলা।
শিশুকে কোলে নেওয়া, নিচু হওয়া, কিছু বহন করা কিংবা দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার মতো কাজের জন্যও শরীরের শক্তি প্রয়োজন। তাই এই পর্যায়ে দৈনন্দিন কাজের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যায়াম ধীরে ধীরে যোগ করা যেতে পারে।
হালকা স্কোয়াট: উরু ও নিতম্বের পেশি শক্তিশালী করে এবং ওঠাবসার ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।
সহজ অধোমুখ শ্বানাসন: শরীরের উপরের অংশের শক্তি ও কাঁধের নড়াচড়া বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। তবে অস্বস্তি হলে এই আসন এড়িয়ে চলুন।
বালাসন: পিঠ, কাঁধ ও নিতম্বের পেশি শিথিল করতে সহায়ক হতে পারে।
রেজিস্ট্যান্স ব্যান্ডের ব্যায়াম: হালকা প্রতিরোধের সাহায্যে পেশির শক্তি ও সহনশীলতা বাড়ানো যায়।
হাঁটার সময় বাড়ানো: শরীরের সহনশীলতা অনুযায়ী হাঁটার সময় ও গতি ধীরে ধীরে বাড়ান।
এই পর্যায়ে ব্যায়ামের মাত্রা বাড়ানোর পাশাপাশি পর্যাপ্ত বিশ্রামও জরুরি। এক দিন বেশি ব্যায়াম করে পরের দিন অতিরিক্ত ক্লান্ত হয়ে পড়ার চেয়ে নিয়মিত ও নিয়ন্ত্রিত অনুশীলন বেশি কার্যকর।
পঞ্চম ধাপ: শক্তি ও সহনশীলতা বাড়ানো (৪–৬ মাস বা তার পরে)
লক্ষ্য: পেশির শক্তি, হৃদ্যন্ত্রের কর্মক্ষমতা এবং সামগ্রিক ফিটনেসের উন্নতি।
শরীরের সুস্থ হয়ে ওঠা সন্তোষজনক হলে অনেকেই এই পর্যায়ে আরও সংগঠিত ফিটনেস কর্মসূচিতে যোগ দিতে পারেন। তবে সবার জন্য একই সময়সীমা প্রযোজ্য নয়। প্রসবের ধরন, জটিলতা, পেশির কার্যক্ষমতা এবং ব্যক্তিগত সুস্থতার উপর নির্ভর করে এই পর্যায়ে পৌঁছতে কম-বেশি সময় লাগতে পারে।
ব্যায়ামের তালিকায় থাকতে পারে—
স্কোয়াট ও নিচু ধাপে ওঠানামার মতো শক্তিবর্ধক ব্যায়াম।
হালকা ডাম্বেল ও রেজিস্ট্যান্স ব্যান্ডের সাহায্যে পেশির ব্যায়াম।
ধড়ের স্থিতিশীলতা বাড়ানোর অনুশীলন।
পিঠ, নিতম্ব ও শরীরের উপরের অংশের পেশি শক্তিশালী করার ব্যায়াম।
দ্রুত হাঁটা এবং শরীরে কম ধাক্কা লাগে এমন অ্যারোবিক ব্যায়াম।
দৌড়নো, লাফানো বা বেশি ধাক্কা লাগে এমন ব্যায়াম শুরু করার আগে পেটের দেয়াল ও শ্রোণিতলের পেশির কার্যক্ষমতা এবং শরীরের ধাক্কা সহ্য করার ক্ষমতা যাচাই করা জরুরি। প্রয়োজনে পেলভিক-হেলথ ফিজিয়োথেরাপিস্টের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে।
শুধু পেটের পেশি নয়, নজর দিন শ্রোণিতলেও
প্রসব-পরবর্তী ফিটনেসের ক্ষেত্রে শ্রোণিতলের পেশির পুনর্বাসন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই পেশিগুলি মূত্রথলি, জরায়ু ও অন্ত্রকে সমর্থন দেয়। পাশাপাশি প্রস্রাব-পায়খানা নিয়ন্ত্রণ এবং শরীরের নড়াচড়ার সময়ে ধড়ের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতেও সাহায্য করে।
কেগেল ব্যায়ামের মাধ্যমে শ্রোণিতলের পেশি সংকুচিত ও শিথিল করার অনুশীলন করা হয়। কিন্তু এই ব্যায়াম সবার জন্য সমান উপযোগী নয়। কারও কারও শ্রোণিতলের পেশি আগে থেকেই অতিরিক্ত টানটান থাকে। তাঁদের ক্ষেত্রে বারবার পেশি সংকুচিত করার বদলে শ্বাসপ্রশ্বাস, পেশি শিথিল করা এবং নড়াচড়ার সমন্বয় ফিরিয়ে আনার অনুশীলন বেশি উপকারী হতে পারে।
একই ভাবে, ধড়ের পেশির পুনর্বাসনের অর্থ শুধু পেটের মেদ কমানো নয়। পেটের দেয়ালের কার্যক্ষমতা ও শরীরকে সমর্থন দেওয়ার ক্ষমতা ফিরিয়ে আনাও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ওজন কমানোর তাড়া নয়, সুস্থতাই লক্ষ্য
প্রসবের পরে ওজন কত দ্রুত কমবে, তা শুধু ব্যায়ামের উপর নির্ভর করে না। পুষ্টিকর খাবার, পর্যাপ্ত জলপান, ঘুম, মানসিক সুস্থতা এবং শরীরকে সেরে ওঠার সুযোগ দেওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ। স্তন্যপান করালে শরীরের অতিরিক্ত শক্তির প্রয়োজন হতে পারে। তাই এই সময়ে অতিরিক্ত ক্যালরি কমিয়ে দেওয়া বা কঠোর ডায়েট অনুসরণ করা ঠিক নয়।
মনে রাখতে হবে, মাতৃত্বের আগের চেহারায় দ্রুত ফিরে যাওয়াই প্রসব-পরবর্তী ফিটনেসের একমাত্র লক্ষ্য নয়। বরং শিশুর যত্ন নেওয়া, দৈনন্দিন কাজ সামলানো এবং নিজের জীবনকে উপভোগ করার জন্য শরীরকে আরও শক্তিশালী, সুস্থ ও সহনশীল করে তোলাই আসল কথা।
কারণ, সুস্থ হয়ে ওঠা কোনও দৌড় নয়। নিজের শরীরকে সময় দিয়ে, তার প্রয়োজন বুঝে এগিয়ে যাওয়াই নতুন মায়েদের ফিটনেসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
পাঠকের মন্তব্য ০
শালীন ও বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করুন। মন্তব্য অনুমোদনের পর প্রকাশ হবে।
মন্তব্য করতে আপনার বাংলাস্ফিয়ার অ্যাকাউন্টে লগইন করুন। সদস্যতা কেনার প্রয়োজন নেই।
এখনও কোনো অনুমোদিত মন্তব্য নেই।