মেদিনীপুর ও পুরুলিয়ার গ্রামীণ মাটি থেকে উৎপত্তি হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজস্ব রূপ ও শৈল্পিক নান্দনিকতার গুণাবলীতে কলকাতার আলোর উৎসবের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হয়ে উঠেছে ঐতিহ্যবাহী ‘দেওয়ালি পুতুল’ বা ‘দীপলক্ষ্মী পুতুল’। কালীপুজো, দীপাবলি এবং ছট পুজোর রাতে ঐতিহ্য ও লোকাচারের মেলবন্ধনে জলপ্রদীপের বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত বহুগুণী মাটির এই অনন্য সৃষ্টিগুলি শতাব্দীপ্রাচীন গ্রামীণ লোকশিল্পের স্বাক্ষর বহন করছে।

ছবি: দ্য টেলিগ্রাফ

শিল্প গবেষক ও সংগ্রাহক বিধান বিশ্বাসের গবেষণায় জানা যায়, বিংশ শতাব্দীর সত্তরের দশক পর্যন্ত এই দেওয়ালি পুতুলের পরিচিতি ও বেচাকেনা মূলত পশ্চিম মেদিনীপুর, পুরুলিয়া, আসানসোল, চুঁচুড়া এবং ঝাড়খণ্ড-বিহার সীমান্তবর্তী অঞ্চলের রাখাল ও কৃষিভিত্তিক সম্প্রদায়গুলির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে কলকাতার লোকশিল্প উৎসাহীদের হাত ধরে মেদিনীপুর থেকে এই মূর্তিগুলি শহরের পাইকারি বাজারে পৌঁছাতে শুরু করে। বর্তমানে কালীপুজোর প্রাক্কালে শিয়ালদহ সংলগ্ন জানবাজার, মাছুয়া বাজার এবং উত্তর থেকে দক্ষিণ কলকাতার বহু মেলায় এই ঐতিহ্যবাহী পুতুলের চাহিদা থাকে চোখে পড়ার মতো।

ছবি: দ্য টেলিগ্রাফ

মেদিনীপুরের ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্পী পরিবারে বিবাহসূত্রে আসা ৫০ বছর বয়সী শিল্পী সুতপা পাল জানান, দুর্গাপুজো শেষ হওয়ার পরপরই অত্যন্ত নিষ্ঠা ও পরিশ্রমের সঙ্গে এই পুতুল তৈরির প্রস্তুতি শুরু হয়। কুমোরের চাকায় মূর্তির নিম্নাংশ (যা দেখতে অনেকটা চওড়া স্কার্টের মতো) তৈরি করে তার ওপর হাতে বা ছাঁচে তৈরি মাথা, একাধিক হাত এবং ছোট মাটির প্রদীপ বসানো হয়। এই ঐতিহ্যবাহী পুতুলগুলির নকশায় যেমন নারী ও দেবীর আকৃতি দেখা যায়, তেমনই আবার ঘোড়া, হাতি কিংবা মা কালী ও দুর্গার রূপও ফুটিয়ে তোলা হয়। পুতুলগুলির সাজসজ্জার জন্য স্থানীয় খড়িমাটি এবং জামাকাপড়ে ব্যবহৃত নীল রঙের সংমিশ্রণ ব্যবহার করা হয়। নকশার কাজ রাখা হয় অত্যন্ত সরল—তুলির চওড়া টানে বিন্দু ও রেখার সাহায্যে।

ছবি: দ্য টেলিগ্রাফ

মেদিনীপুরের মির্জা বাজারে এক-একটি দেওয়ালি পুতুলের দাম ১৫০ টাকা থেকে ৩০০ টাকা হলেও জটিল কাজের নকশাদার বড় মূর্তির দাম ২,০০০ থেকে ৩,০০০ টাকা পর্যন্ত পৌঁছায়। শুধু বাঙালি পরিবারেই নয়, দীপান্বিতা লক্ষ্মীপুজোর দিন কিংবা চন্দননগর ও চুঁচুড়ার নানাবিধ হিন্দিভাষী সম্প্রদায়ের ছট পুজোতেও এই বহু-প্রদীপ যুক্ত মাটির মূর্তির বিপুল ব্যবহার রয়েছে। আধুনিক প্লাস্টিক ও চিনা আলোর দাপটে যখন মৃৎশিল্পের বহু অনুষঙ্গ হারিয়ে যেতে বসেছে, তখন এই ‘দেওয়ালি পুতুল’ কেবল গৃহস্থের ঘর আলো করছে না, বরং বাংলার লোকশিল্প ও কারিগরদের ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতেও এক নীরব বিপ্লব ঘটিয়ে চলেছে।

ছবি: দ্য টেলিগ্রাফ