আন্তর্জাতিক ডেস্ক: বাংলাদেশের টঙ্গীতে বিশ্ব ইজতেমা ময়দান ব্যবহার নিয়ে ফের প্রকাশ্যে এসেছে তাবলিগ জামাতের দুই পক্ষের বিরোধ। মাওলানা সাদ কান্ধলভির অনুসারীদের ওই ময়দানে আর কোনও ইজতেমা বা তাবলিগি কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ না দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন জোবায়েরপন্থী, অর্থাৎ সুরায়ে নেজামের নেতারা। একই সঙ্গে ২০১৮ ও ২০২৪ সালের সংঘর্ষের ঘটনায় দায়ের করা দুটি হত্যা মামলায় দ্রুত অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার দাবি তুলেছেন তাঁরা।
আগামী জানুয়ারির বিশ্ব ইজতেমার আগে এই অবস্থান ময়দান ব্যবহার ও দুই পক্ষের অংশগ্রহণ নিয়ে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। তবে সাদ অনুসারীদের নিষিদ্ধ করার দাবি উঠেছে মানেই সরকারি নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে, এমন নয়। শনিবারের দাবির পর প্রশাসনের নতুন কোনও সিদ্ধান্তের তথ্য সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনগুলিতে পাওয়া যায়নি।
বৈঠক শেষে কী দাবি উঠল?
শনিবার টঙ্গীর ইজতেমা ময়দানে আলেমদের পরামর্শ সভার পরে সংবাদ সম্মেলন করা হয়। সেখানে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির মুহিবুল্লাহ বাবুনগরীর পক্ষে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সংগঠনের মহাসচিব মাওলানা শায়েখ সাজিদুর রহমান।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর জানিয়েছে, দুই দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত সাদ অনুসারীদের ইজতেমায় অংশগ্রহণের বিরোধিতা করার কথা বলেছেন নেতারা। সরকারকে চাপ দেওয়া কিংবা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা হলে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জেলায় জেলায় কর্মসূচির হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে।
রাইজিংবিডির প্রতিবেদন অনুযায়ী, সভায় অংশগ্রহণকারীরা এ বিষয়ে সরকারের পদক্ষেপ চেয়েছেন। তবে পাওয়া প্রতিবেদনগুলিতে সাদপন্থীদের পাল্টা বক্তব্য উল্লেখ নেই। ফলে এই দাবিকে দুই পক্ষের সম্মত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
‘বিশ্ব তাবলিগ’ বলতে কী বোঝায়?
প্রচলিত কথায় ‘বিশ্ব তাবলিগ’ বলা হলেও আন্দোলনটির পরিচিত নাম তাবলিগ জামাত। এটি মুসলমানদের মধ্যে ধর্মীয় অনুশীলন, ব্যক্তিগত জীবনযাপন এবং ইসলামের শিক্ষা অনুসরণের আহ্বান জানানো একটি আন্তর্জাতিক ধর্মীয় আন্দোলন। ‘তাবলিগ’ বলতে ধর্মের বার্তা পৌঁছে দেওয়া বা প্রচারকে বোঝায়।
এর অনুসারীরা ছোট ছোট দলে বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে মসজিদকেন্দ্রিক আলোচনা ও ধর্মীয় কার্যক্রমে অংশ নেন। অন্য মুসলমানদের নামাজ ও ধর্মীয় অনুশীলনে উৎসাহিত করা তাঁদের কাজের অন্যতম উদ্দেশ্য।
কবে, কোথায় শুরু হয়েছিল তাবলিগ জামাত?
মাওলানা মুহাম্মদ ইলিয়াস কান্ধলভির উদ্যোগে ১৯২০-এর দশকে ভারতের মেওয়াত অঞ্চলে তাবলিগ আন্দোলনের সূচনা হয়। প্রতিষ্ঠার বছর হিসেবে বিভিন্ন সূত্রে ১৯২৬ বা ১৯২৭ সালের উল্লেখ পাওয়া যায়। পরে আন্দোলনটি উপমহাদেশের বাইরে ছড়িয়ে আন্তর্জাতিক পরিসর পায়। দিল্লির নিজামুদ্দিন মারকাজ এর গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক কেন্দ্র।
তবে তাবলিগ জামাত এবং বিশ্ব ইজতেমা একই বিষয় নয়। তাবলিগ জামাত হলো ধর্মীয় আন্দোলন; বিশ্ব ইজতেমা সেই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত একটি বৃহৎ সমাবেশ। ‘ইজতেমা’ শব্দের অর্থ সমাবেশ বা সম্মিলন। এখানে ধর্মীয় আলোচনা, বয়ান, প্রার্থনা এবং পরবর্তী তাবলিগি কার্যক্রমের প্রস্তুতি চলে।
বাংলাদেশে বিশ্ব ইজতেমার ইতিহাস
বর্তমান বাংলাদেশের ভূখণ্ডে টঙ্গীর আয়োজন শুরু হওয়ার আগেও তাবলিগের বড় সমাবেশ হয়েছে। বাংলাপিডিয়ায় চট্টগ্রামে ১৯৫৪ সালে এবং নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে ১৯৫৮ সালে সমাবেশের উল্লেখ রয়েছে। পরবর্তী সময়ে ঢাকার রমনা এবং টঙ্গীর পাগার এলাকাতেও আয়োজন হয়।
অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় ১৯৬৭ সাল থেকে টঙ্গীর তুরাগ নদীর তীরের বর্তমান স্থানে নিয়মিত ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। পরে সরকার এই আয়োজনের জন্য প্রায় ১৬০ একর জমি বরাদ্দ দেয়। দেশ-বিদেশের মুসলমানদের অংশগ্রহণে এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মুসলিম ধর্মীয় সমাবেশে পরিণত হয়েছে।
কেন দুই শিবিরে বিভক্ত অনুসারীরা?
তাবলিগ জামাতের নেতৃত্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি এবং কিছু ধর্মীয় বক্তব্যের ব্যাখ্যা নিয়ে মতপার্থক্য থেকে বিভাজন গভীর হয়।
একটি অংশ দিল্লির নিজামুদ্দিন মারকাজের মাওলানা সাদ কান্ধলভির নেতৃত্ব অনুসরণ করে। অন্য অংশ শুরা বা পরামর্শভিত্তিক পরিচালনার পক্ষে। বাংলাদেশে এই দ্বিতীয় অংশটি মাওলানা জোবায়েরের নেতৃত্বাধীন শিবির হিসেবে পরিচিত। নেতৃত্বের এই বিরোধ পরে কাকরাইল মসজিদ ও টঙ্গী ময়দানে কার্যক্রম পরিচালনার প্রশ্নেও প্রভাব ফেলে।
২০১৮ ও ২০২৪ সালের সংঘর্ষ কেন আলোচনায়?
২০১৮ সালের ১ ডিসেম্বর টঙ্গীর ইজতেমা ময়দানের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পক্ষের সংঘর্ষে অন্তত একজন নিহত এবং দুই শতাধিক আহত হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছিল।
২০২৪ সালের ১৮ ডিসেম্বর ফের সংঘর্ষ হয়। পরদিন দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে চারজনের মৃত্যুর কথা জানানো হয়। ওই ঘটনার পরে সাদ অনুসারীদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের হওয়ার খবরও প্রকাশিত হয়। শনিবারের সংবাদ সম্মেলনে পুরোনো দুই ঘটনার মামলায় দ্রুত অভিযোগপত্রের দাবি তোলা হয়েছে। অভিযোগ বা মামলায় নাম থাকা অবশ্য অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার সমান নয়।
২০২৭ সালের ইজতেমা কবে?
বাসসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ৩ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দুই পর্বের সময়সূচি ঘোষণা করেন। প্রথম পর্ব ৮ থেকে ১০ জানুয়ারি, দ্বিতীয় পর্ব ১৫ থেকে ১৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।
মন্ত্রী জানিয়েছিলেন, দুই পক্ষের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে এবং উভয় পক্ষই টঙ্গীর মাঠ ব্যবহারের দাবি জানিয়েছে। শান্তিপূর্ণ আয়োজন নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিল সরকার।