বাংলাস্ফিয়ার: গত সপ্তাহে ‘অশালীন’ কাজের অভিযোগে সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। এই শাস্তির যৌক্তিকতা জানতে চেয়ে রিয়াধকে কূটনৈতিক নোট পাঠিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। কোন আইনি ব্যবস্থায় তাঁদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়ে থাকতে পারে, তা নিয়েই এই ব্যাখ্যা।
ঘটনার বিস্তারিত জানতে সৌদি সরকারের জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে বাংলাদেশ। এর মধ্যেই প্রশ্ন উঠছে, কোন অপরাধে মৃত্যুদণ্ড হবে, তা সৌদি আরব কী ভাবে নির্ধারণ করে? এই ব্যবস্থার কতটা ইসলামি আইনের উপর প্রতিষ্ঠিত, আর কতটা বিচারক ও রাষ্ট্রের বিবেচনাধীন ক্ষমতার উপর নির্ভরশীল? অতীতে সেখানে মৃত্যুদণ্ডের রায় কী ভাবে দেওয়া হয়েছে?
ঘটনা সম্পর্কে এখনও পর্যন্ত কী জানা গিয়েছে?
এই ঘটনার সম্পূর্ণ তথ্য এখনও প্রকাশ করা হয়নি।
তবে জানা গিয়েছে, পবিত্র মক্কা নগরীর একটি মসজিদের ভিতরে কথিত অশালীন কাজের অভিযোগে এক বাংলাদেশি পুরুষ ও এক বাংলাদেশি নারীকে আদালত দোষী সাব্যস্ত করার পরে ১৪ অক্টোবর তাঁদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। কিছুদিন আগে তাঁরা সৌদি আরবে এসেছিলেন।
পরের দিন জেদ্দায় বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশন মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য চেয়ে সৌদি বিদেশ মন্ত্রককে একটি ‘নোট ভারবাল’, অর্থাৎ আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক নোট পাঠায়। ১৮ অক্টোবর ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূতকেও আর একটি চিঠি দেওয়া হয়।
কোন মসজিদে ঘটনাটি ঘটেছিল, ‘অশালীনতা’ বলতে ঠিক কী কাজ বোঝানো হয়েছে কিংবা ওই দু’জনকে কবে গ্রেফতার করা হয়েছিল—এমন তথ্য চাওয়া হলেও সৌদি বিদেশ মন্ত্রক এখনও তা জানায়নি। বলা হয়েছে, ‘তা’জির’ বিধানের আওতায় তাঁদের বিচার হয়েছিল।
এর আগে জানা গিয়েছিল, ওই অঞ্চলে বন্দি বাংলাদেশি নাগরিকদের সম্পর্কে তথ্য চেয়েছিল জেদ্দায় বাংলাদেশের কনস্যুলেট জেনারেল। বন্দিদের তালিকায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দু’জনের নাম ছিল। কিন্তু তাঁদের কী সাজা হয়েছে, সে সম্পর্কে কোনও তথ্য ছিল না। অন্য দিকে, গাল্ফ নিউজ জানিয়েছে, বিচারিক কর্তৃপক্ষ মৃত্যুদণ্ডের রায় বহাল রাখার পরে রাজকীয় আদেশে তা চূড়ান্ত অনুমোদন পায়।
ইসলামি আইনের অংশ হিসেবে ‘তা’জির’কে কী ভাবে বুঝতে হবে?
সৌদি আরব ও বাংলাদেশ—দু’টিই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ।
বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থার কাঠামো একটি ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্রের মতো; দেশের আইনি ব্যবস্থা ইসলামি আইন দ্বারা পরিচালিত হয় না। যদিও বাংলাদেশ সরকারের ২০২২ সালের জনশুমারি ও গৃহগণনা অনুযায়ী, দেশের জনসংখ্যার ৯০ শতাংশেরও বেশি মুসলিম।
অন্য দিকে, সৌদি আরব প্রধানত শরিয়াভিত্তিক আইনি ব্যবস্থা অনুসরণ করে। ফৌজদারি, দেওয়ানি ও ব্যক্তিগত আইনসংক্রান্ত মামলার নিষ্পত্তিও মূলত সেই ভিত্তিতে হয়। তবে রাষ্ট্রের প্রণীত আইনও শাসনব্যবস্থায় ভূমিকা পালন করে, এবং দেশভেদে তার ধরন আলাদা। যেমন, নারীদের গাড়ি চালানো নিয়ে বিধিনিষেধ ইসলামি আইন থেকে উদ্ভূত নয়।
এখানে যে সূক্ষ্ম বিষয়টি বোঝা প্রয়োজন, তা হল—ইসলামি ফৌজদারি আইন কোনও একক, সর্বত্র অভিন্ন বিধিসংহিতা নয়। এর প্রয়োগ অনেকাংশেই ব্যাখ্যানির্ভর।
১৯৩২ সালে বর্তমান সৌদি রাজ্য একীভূত হওয়ার পর থেকে সেখানকার বিচারিক ব্যাখ্যা মূলত হাম্বলি মাযহাবের উপর প্রতিষ্ঠিত। এই ধরনের চারটি প্রধান মাযহাব রয়েছে।
হাম্বলি মতধারায় বিচারকের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিসর সবচেয়ে কম। রায় দেওয়ার ক্ষেত্রে এই মতধারা কোরআন ও হাদিসের পাঠের উপর গভীর ভাবে নির্ভরশীল। হাদিসে নবী মহম্মদের বাণী ও আচরণসংক্রান্ত বিবরণ রয়েছে, যা সুন্নাহর সঙ্গে যুক্ত।
বিশেষত ফৌজদারি আইনের ক্ষেত্রে মোটামুটি তিনটি শ্রেণিবিভাগ স্বীকৃত—হুদুদ, কিসাস ও তা’জির। আইনবিশারদ শিবলি মাল্লাত তাঁর ‘ম্যাপিং সৌদি ক্রিমিনাল ল’ গবেষণায় এমন একটি ব্যবস্থার বর্ণনা দিয়েছেন, যেখানে কিছু অপরাধের বিচার হয় রাষ্ট্রের প্রণীত আইনে, আর অন্যগুলির বিচার হয় হুদুদ, কিসাস ও তা’জিরের প্রথাগত শ্রেণিবিভাগ অনুযায়ী।
হুদুদ বলতে এমন অপরাধ বোঝায়, যেগুলির জন্য ইসলামি আইনে নির্দিষ্ট শাস্তির বিধান রয়েছে। ঐতিহ্যগত ভাবে এই বিধানগুলির ভিত্তি কোরআন ও হাদিস। হুদুদ অপরাধের সাধারণ উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয় জিনা বা অবৈধ যৌনসঙ্গম, চুরি এবং কোনও কোনও ব্যাখ্যায় ধর্মত্যাগ।
সাতটি অপরাধকে হুদুদ হিসেবে চিহ্নিত করার ধারণাটি ধর্মীয় আইনজ্ঞদের ব্যাখ্যার উপর প্রতিষ্ঠিত। কোরআনে স্পষ্ট ভাবে সাতটি অপরাধের এমন কোনও তালিকা দেওয়া নেই। হুদুদ শাস্তি প্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রমাণের কঠোর শর্ত পূরণ করতে হয়। অপরাধ ও মাযহাব অনুযায়ী তার মধ্যে প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য এবং নির্দিষ্ট ধরনের প্রমাণের প্রয়োজন হতে পারে।
এই শর্তগুলির পাশাপাশি একটি নীতিও রয়েছে: যুক্তিসঙ্গত সন্দেহ থাকলে হুদুদ শাস্তি এড়িয়ে চলতে হবে। ফলে এই ধরনের অপরাধে দোষ প্রমাণ করা কঠিন হতে পারে, বিশেষত যেখানে সবচেয়ে কঠোর শাস্তির প্রশ্ন জড়িত।
কিসাসকে সাধারণ ভাবে প্রতিশোধমূলক বা সমতুল্য প্রতিকারমূলক শাস্তি বলা হয়। এর মাধ্যমে অপরাধের শিকার ব্যক্তি প্রতিকার দাবি করার সুযোগ পান। এর শাস্তি বিভিন্ন ধরনের এবং কোরআনে তার বিধান রয়েছে। এর মধ্যে ‘দিয়া’ বা ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থাও থাকতে পারে। এই ব্যবস্থার যুক্তি বিচারকের বিবেচনাধীন শাস্তির যুক্তি থেকে আলাদা। পূর্বপরিকল্পিত ও পূর্বপরিকল্পনাহীন হত্যাসহ মানুষের জীবনের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধ এই আলোচনার অন্তর্ভুক্ত।
অন্য দিকে, তা’জির বলতে এমন অপরাধের জন্য বিবেচনাধীন শাস্তিকে বোঝায়, যেখানে নির্ধারিত ‘হদ’ শাস্তি প্রযোজ্য নয় অথবা যা কিসাসের বিধানের আওতায় পড়ে না। জনশৃঙ্খলা বা সমাজের স্বার্থের পক্ষে ক্ষতিকর বলে বিবেচিত নানা আচরণ এর অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। প্রযোজ্য আইনি কাঠামোর মধ্যে বিচারক উপযুক্ত শাস্তি নির্ধারণ করেন।
সৌদি আরবে এই শেষের শ্রেণিটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
তা’জির এমন কোনও নির্দিষ্ট অপরাধতালিকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, যার প্রতিটির জন্য আগেই শাস্তি নির্ধারণ করে দেওয়া আছে। ঐতিহাসিক ভাবে অপরাধের গুরুত্ব ও শাস্তির কঠোরতা নির্ধারণে বিচারকদের যথেষ্ট বিবেচনাধীন ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তবে কোনও মামলা তা’জিরের আওতায় বিচার করা হচ্ছে বলেই যে তাতে স্বয়ংক্রিয় ভাবে মৃত্যুদণ্ড হবে, এমন নয়।
ফলে বাংলাদেশ সরকারের সম্ভাব্য প্রশ্নটি হল: তাঁদের নাগরিকদের আচরণে এমন কী ছিল, যার জন্য মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হল—বিশেষত যখন সেই আচরণের বিস্তারিত তথ্যই প্রকাশ করা হয়নি?
তা হলে মৃত্যুদণ্ড কেন? সৌদি আরবে এই শাস্তি কী ভাবে প্রয়োগ করা হয়?
২০২১ সালে সৌদি সরকার স্বীকার করেছিল, দেশের আইনি ব্যবস্থায় আরও পূর্বানুমানযোগ্যতা প্রয়োজন—অর্থাৎ কোন ঘটনায় কী আইনি পরিণতি হতে পারে, তা আগাম বোঝার সুযোগ বাড়ানো দরকার। সে বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুবরাজ মহম্মদ বিন সলমন একগুচ্ছ আইনি সংস্কারের কর্মসূচি ঘোষণা করেন।
কিন্তু কোনও ঘোষণা এবং কার্যকর করা যায় এমন আইন এক বিষয় নয়।
এই ঘটনায় তথ্য আদানপ্রদানের অভাব ছাড়াও বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে তা’জির এবং তার আওতায় বিবেচনাধীন ক্ষমতার বিস্তার। নানা ধরনের অপরাধে এই ক্ষমতা প্রয়োগ করা হয়। শাস্তি হতে পারে কারাদণ্ড, জরিমানা অথবা কোনও কোনও ক্ষেত্রে—এই ঘটনার মতো—মৃত্যুদণ্ড।
তা’জির অপরাধে মৃত্যুদণ্ড বিশেষ ভাবে বিতর্কিত। কারণ, এই শাস্তি এমন কোনও একক, সর্বজনস্বীকৃত অপরাধতালিকার সঙ্গে যুক্ত নয়, যেখানে প্রতিটি অপরাধের জন্য নির্দিষ্ট শাস্তি স্থির করা আছে। ফলে প্রশ্ন ওঠে: ঠিক কোন আচরণকে অপরাধ বলা হচ্ছে, কোন আইনি নীতির ভিত্তিতে নির্দিষ্ট শাস্তি দেওয়া হচ্ছে এবং অভিযুক্ত ব্যক্তির জন্য কী কী সুরক্ষা রয়েছে?
তা’জিরের পরিসর নিয়ে আইনজ্ঞদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। আধুনিক সৌদি আইনি চর্চাও গড়ে উঠেছে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া ধর্মীয় আইনব্যাখ্যা এবং রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ—উভয়ের মধ্য দিয়ে।
বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মৃত্যুদণ্ডবিষয়ক বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সৌদি আরবে অন্তত ৩৫৬ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। ২০২৪ সালে সংখ্যাটি ছিল ৩৪৫; তাঁদের মধ্যে ১২২ জনের মৃত্যুদণ্ড হয়েছিল মাদকসংক্রান্ত অপরাধে। ২০২৫ সালে মোট ৩৫৬টি মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের মধ্যে ২৪০টিই ছিল মাদকসংক্রান্ত অপরাধের জন্য।
বাংলাদেশের মতো দেশের ক্ষেত্রে এই ঘটনার গুরুত্ব একটি মামলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। সৌদি আরবের অভিবাসী শ্রমিকদের একটি বড় অংশ বাংলাদেশের নাগরিক। বিদেশে গুরুতর অভিযোগের মুখোমুখি হওয়া নাগরিকদের জন্য আইনি সহায়তা পাওয়ার সুযোগ, কার্যকর কনস্যুলার যোগাযোগ এবং ফৌজদারি মামলার কার্যক্রম সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।