ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে গত প্রায় এক সপ্তাহ ধরে চলা পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন আজ মঙ্গলবার চরম আকার ধারণ করেছে। সকাল থেকেই শ্রমিক-পুলিশের পাল্টাপাল্টি ধাওয়া, টিয়ারশেল আর সাউন্ড গ্রেনেডের শব্দে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় মিরপুর। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে, নিরাপত্তার স্বার্থে সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয় মেট্রোরেলের তিনটি স্টেশন। তবে এই শ্রমিক অসন্তোষের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য—পোশাক শ্রমিকের ‘ছদ্মবেশে’ নাশকতার চেষ্টার অভিযোগে এরই মধ্যে নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন আওয়ামী লীগের ৩৩ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
গত কয়েক দিন ধরেই মিরপুরসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে উত্তেজনা চলছিল। গত বৃহস্পতিবার মিরপুরে প্রায় ছয় ঘণ্টা সড়ক অবরোধ করেন শ্রমিকেরা। এরপর শনিবার কারখানার ভেতরে শুরু হওয়া বিক্ষোভ পরে আবারও সড়কে ছড়িয়ে পড়ে। রোববার যানবাহনে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। গতকাল সোমবার মিরপুর ১৪ ও মিরপুর ২ এলাকায় শ্রমিকদের সড়কে নামতে বাধা দেয় পুলিশ। টিয়ারশেল ছুড়ে তাঁদের ছত্রভঙ্গ করা হয়।
এরই ধারাবাহিকতায় আজ মঙ্গলবার সকালে মিরপুর ১১ সেকশনে মেট্রো স্টেশনের নিচে বড় ধরনের সংঘর্ষ বাধে। পুলিশ আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। এ সময় পুলিশকে টিয়ারগ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করতে দেখা যায়। বিক্ষুব্ধ শ্রমিকেরা একপর্যায়ে পুলিশের গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেন। ট্রাফিক পুলিশের বক্সও ভাঙচুর করা হয়।
পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে। মিরপুর-১০, মিরপুর-১১ এবং পল্লবী মেট্রো স্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। নিরাপত্তার স্বার্থে এই স্টেশনগুলোতে ট্রেন থামা ও যাত্রী ওঠানামা পুরোপুরি বন্ধ রাখা হয়। এতে সাধারণ যাত্রীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েন।
ঢাকার বাইরে গাজীপুর, সাভার ও আশুলিয়াতেও এই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক দীর্ঘক্ষণ অবরোধ করে রাখেন শ্রমিকেরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গাজীপুরে পুলিশের পাশাপাশি বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। বিশৃঙ্খলা এড়াতে গাজীপুর, সাভার ও আশুলিয়া এলাকার প্রায় ৪০০ পোশাক কারখানায় আজ সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
এদিকে শ্রমিক আন্দোলনের আড়ালে রাজনৈতিক মদদ ও নাশকতার অভিযোগ উঠেছে। ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) আজ মঙ্গলবার সকালে এক বার্তায় জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ৩৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তারকৃতরা সবাই কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী। তাঁরা পোশাক শ্রমিকের ‘ছদ্মবেশে’ আন্দোলনে ঢুকে নাশকতার চেষ্টা করছিলেন। তবে প্রাথমিকভাবে তাঁদের বিস্তারিত নাম-পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।
সরকারের পক্ষ থেকেও সরাসরি রাজনৈতিক ইন্ধনের কথা বলা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী অভিযোগ করেছেন, সাধারণ শ্রমিকদের মাঠে নামিয়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে করা হচ্ছে। তিনি এর জন্য জামায়াতে ইসলামী ও আওয়ামী লীগকে দায়ী করেছেন। তাঁর দাবি, শ্রমিক সেজে মূলত রাজনৈতিক কর্মীরাই পুলিশের গাড়িতে আগুন দিচ্ছেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও একই ধরনের সন্দেহের কথা জানিয়েছে। ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার মো. মহিদুল ইসলাম জানান, শ্রমিকদের বেতন নির্ধারণের জন্য শ্রম মন্ত্রণালয় এরই মধ্যে ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। তাই এখন সড়ক আটকে জনদুর্ভোগ তৈরির কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। পুলিশের ধারণা, এই আন্দোলনের পেছনে রাষ্ট্রবিরোধী কোনো গোষ্ঠী জড়িত থাকতে পারে।
উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং শ্রমমন্ত্রী মালিক ও শ্রমিক নেতাদের সাথে জরুরি বৈঠক করেছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কড়া ভাষায় জানিয়েছেন, যৌক্তিক আন্দোলনের নামে যারা সহিংসতা করছে, তাদের মূল উদ্দেশ্য ভিন্ন। নাশকতার চেষ্টা করা হলে তা কঠোর হাতে দমন করা হবে।
বর্তমানে দেশের প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতে বিপুলসংখ্যক পুলিশ, র্যাব ও বিজিবি মোতায়েন রয়েছে।
এর আগে দেশে সর্বশেষ বড় শ্রমিক আন্দোলন হয়েছিল ২০২৪ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে। তখন রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরপরই শ্রমিকেরা বকেয়া বেতন ও ১৮ দফা দাবিতে রাস্তায় নেমেছিলেন। এরও আগে ২০২৩ সালের অক্টোবর-নভেম্বর মাসে মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে বড় ধরনের আন্দোলন হয়েছিল। তখন ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে সেই বেতনে সংসার চলছে না জানিয়ে শ্রমিকেরা এবার ৩০ হাজার টাকা বেতনের দাবিতে রাজপথে নেমেছেন। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন তাঁরা।
পাঠকের মন্তব্য ০
শালীন ও বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করুন। মন্তব্য অনুমোদনের পর প্রকাশ হবে।
এই প্রতিবেদনে নতুন মন্তব্য গ্রহণ বন্ধ রয়েছে।
এখনও কোনো অনুমোদিত মন্তব্য নেই।