রাঙামাটির পর্যটনকেন্দ্র সাজেকে টানা ১৪ দিন ধরে অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধ চলছে। বুধবারও সকাল থেকে সাজেক সড়কে কোনো ধরনের যান চলাচল করেনি। এর ফলে সাজেক এলাকায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এছাড়া উৎপাদিত কৃষিপণ্য বাজারে নিতে না পেরে চরম বিপাকে পড়েছেন স্থানীয় জুমচাষিরা।

অবরোধের কারণে যান চলাচল বন্ধ থাকায় ধারদেনা করে সংসার চালাচ্ছেন পর্যটকদের পরিবহনে যুক্ত শত শত গাড়ির চালক ও সহকারী। ঋণের কিস্তি পরিশোধ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন অনেক গাড়ির মালিকও। খাগড়াছড়ির যানবাহন মালিক সমিতির সভাপতি আয়ুস চাকমা জানান, সাজেকে চলাচলকারী প্রায় দেড় হাজার যানবাহনের চালক ও সহকারীদের আয় বন্ধ হয়ে গেছে। জেলাটিতে যানবাহন খাতে প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকা লোকসান হচ্ছে।

এদিকে সাজেকে টানা অবরোধের প্রতিবাদে পার্বত্য চট্টগ্রাম রক্ষা কমিটি ৪৮ ঘণ্টার পাল্টা অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। বুধবার ও বৃহস্পতিবার (৪ ও ৫ নভেম্বর) এ কর্মসূচি পালন করা হবে। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সংগঠনটির সদস্যসচিব বিন্দু লাল চাকমা স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। এর ফলে সাজেকে সংকট নিরসনে প্রশাসন ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে সংলাপের উদ্যোগ আপাতত ঝুলে গেছে।

পাঁচ দফা দাবির চারটিতে সমঝোতার অগ্রগতি হলেও মূল বিরোধের জায়গায় সিদ্ধান্ত না আসায় অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধ প্রত্যাহার হয়নি। যদিও আন্দোলনকারী সংগঠন দুটি – সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশন – উৎপাদিত কৃষিপণ্য এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের পরিবহনের ওপর অবরোধ শিথিল করার ঘোষণা দিয়েছে। এছাড়া রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স, বিদ্যুৎ সরবরাহের গাড়ি, ধর্মীয় ও বিবাহ কাজে ব্যবহৃত গাড়ি এবং সাংবাদিকদের গাড়ি জরুরি প্রয়োজনে আওতামুক্ত রয়েছে। তবে তাদের পাঁচ দফা দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত অবরোধ চলবে বলে জানানো হয়েছে।

গত ২৬ অক্টোবর আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সরকারি প্রতিনিধি দলের বৈঠকে পাঁচ দফা দাবির চারটিতে সমঝোতার কথা জানানো হয়। তবে সাজেক এলাকা থেকে জেএসএস সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার দাবিতে মতপার্থক্য থাকায় আলোচনা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি। বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমেনা মারজান জানিয়েছেন, নতুন করে বৈঠকের বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি। এছাড়া নিরাপত্তাজনিত কারণে সাজেকভ্যালি পর্যটনকেন্দ্র পরবর্তী নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত বন্ধ থাকবে।

সাজেক রিসোর্ট-কটেজ মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক রাহুল চাকমা বলেন, অবরোধের কারণে পর্যটননির্ভর অর্থনীতিতে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে। পর্যটক না থাকায় ১১৬টির বেশি রিসোর্ট, ১৪টি রেস্তোরাঁ ও শতাধিক দোকানপাট কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। এতে এ পর্যন্ত প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।

অন্যদিকে, সাজেকের সঙ্গে বাঘাইছড়ি উপজেলা সদর ও খাগড়াছড়ির সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হওয়ায় চাল-ডালসহ খাদ্যসামগ্রীর চরম সংকট দেখা দিয়েছে। সাজেক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অতুলাল চাকমা এবং ২ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য অনিত্য ত্রিপুরা জানিয়েছেন, স্থানীয়দের মজুত খাবার শেষ হয়ে আসছে এবং রুইলুইপাড়ার দোকানগুলোতেও পণ্য ফুরিয়ে গেছে।

সাজেক থানার ওসি তোফাজ্জল হোসেন জানান, পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণ থাকলেও সড়কে বড় কোনো যান চলাচল করছে না। দীর্ঘদিন ধরে চলমান এ সংকট নিরসনে এখনো কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা না যাওয়ায় কবে নাগাদ সাজেকের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয়রা।