Table of Contents
বাংলাস্ফিয়ার: ভারতের বিদ্যুৎ চাহিদা ২৬০.৪৫ গিগাওয়াট ছুঁয়ে নতুন রেকর্ড গড়েছে। সংখ্যাটি নিছক একটি পরিসংখ্যান নয়। এটি আসলে আজকের ভারতের অর্থনীতি, জলবায়ু, নগরজীবন, মধ্যবিত্তের জীবনধারা এবং রাষ্ট্রীয় পরিকাঠামোর সীমাবদ্ধতার এক সম্মিলিত প্রতিচ্ছবি। গরম যত বাড়ছে, বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা ততই ভয়ঙ্কর মাত্রা নিচ্ছে। আর সেই নির্ভরতার কেন্দ্রে রয়েছে একটি বস্তু—শীতাতপ নিয়ন্ত্রক যন্ত্র।
বিলাসদ্রব্য থেকে প্রয়োজনীয়তা: ভারতীয় মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রার রূপান্তর
একসময় ভারতে এয়ার কন্ডিশনার ছিল বিত্তশালীদের বিলাসদ্রব্য। এখন তা ক্রমশ মধ্যবিত্তের “প্রয়োজনীয়তা”-য় পরিণত হচ্ছে। দিল্লি, জয়পুর, লখনউ, পটনা বা কলকাতার মতো শহরে মে-জুন মাসে যে তাপপ্রবাহ তৈরি হচ্ছে, তা আর কেবল অস্বস্তিকর নয়, অনেক ক্ষেত্রে বিপজ্জনক। ৪৪ থেকে ৪৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে যখন তাপমাত্রা ওঠানামা করে, তখন ঘরের ভেতরে টিকে থাকাও কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে লক্ষ লক্ষ পরিবার একই সময়ে শীতাতপ নিয়ন্ত্রক যন্ত্র চালু করছে। বিদ্যুতের চাহিদা তখন আচমকাই বিস্ফোরিত হচ্ছে।
এই চিত্রটি ভারতের অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। গত এক দশকে দেশে বিদ্যুতায়ন বেড়েছে, আয় কিছুটা বেড়েছে, শহুরে জীবনযাত্রার বিস্তার ঘটেছে। ফলে বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির ব্যবহারও বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু সমস্যা হল, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহের পরিকাঠামো সেই হারে আধুনিক হয়নি। ফলে চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গোটা ব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে।
পিক ডিমান্ডের অগ্নিপরীক্ষা
ভারতের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হল এর “শীর্ষ চাহিদা” বা peak demand সামলানোর সীমিত ক্ষমতা। সাধারণ সময়ে বিদ্যুতের চাহিদা তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত থাকে। কিন্তু দুপুর থেকে সন্ধ্যার মধ্যে, বিশেষত গরমের দিনে, যখন কোটি কোটি মানুষ একইসঙ্গে শীতাতপ নিয়ন্ত্রক যন্ত্র চালায়, তখন আচমকা চাহিদা আকাশছোঁয়া হয়ে যায়। এই মুহূর্তগুলিই বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ মন্ত্রক ইতিমধ্যেই জানিয়ে দিয়েছে, চলতি গ্রীষ্মে বিদ্যুতের চাহিদা ২৭০ গিগাওয়াটেও পৌঁছতে পারে। অর্থাৎ বর্তমান রেকর্ড হয়তো সামনের দিনগুলিতে আবার ভাঙবে। প্রশ্ন হল, ভারত কি সেই চাপ সামলানোর জন্য প্রস্তুত?
এই প্রশ্নের উত্তর খুব আশাব্যঞ্জক নয়।
কয়লানির্ভরতা ও কার্বন নির্গমন: জলবায়ু সংকটের এক বিপরীতমুখী যাত্রা
ভারতের বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অংশ এখনও কয়লাভিত্তিক। গরম যত বাড়ে, বিদ্যুতের চাহিদা তত বাড়ে, আর সেই বাড়তি বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য আরও বেশি কয়লা পোড়াতে হয়। অর্থাৎ জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার বদলে আমরা উল্টোদিকে হাঁটছি। একদিকে তাপপ্রবাহ বাড়ছে। অন্যদিকে সেই তাপপ্রবাহ মোকাবিলা করতে গিয়ে আরও বেশি জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে আরও বেশি কার্বন নির্গমন হচ্ছে। এটি এক ভয়ঙ্কর দুষ্টচক্র।
শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের সামাজিক বৈষম্য
এই দুষ্টচক্রের সামাজিক মাত্রাও রয়েছে। যাঁদের সামর্থ্য আছে তাঁরা শীতাতপ নিয়ন্ত্রক যন্ত্র কিনছেন। যাঁদের সামর্থ্য নেই তাঁরা অসহনীয় গরমে জীবন কাটাচ্ছেন। অর্থাৎ জলবায়ু পরিবর্তন ভারতে নতুন ধরনের বৈষম্যও তৈরি করছে। শহরের সচ্ছল মানুষ নিজেদের ঘর ঠান্ডা রাখতে পারছেন, কিন্তু ফুটপাতবাসী, দিনমজুর, গ্রামীণ দরিদ্র বা বস্তিবাসীর কাছে গরম এখন প্রায় মৃত্যুঝুঁকির সমান।
প্রতি বছর ভারতে হাজার হাজার মানুষ তাপপ্রবাহে আক্রান্ত হন। অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা সরকারি হিসাবেও ধরা পড়ে না। কারণ তাপজনিত অসুস্থতা অনেক সময় হৃদরোগ, ডিহাইড্রেশন বা অন্য জটিলতার আড়ালে লুকিয়ে যায়। ফলে বিদ্যুতের বাড়তি চাহিদা কেবল অর্থনৈতিক বিষয় নয়, এটি জনস্বাস্থ্যের প্রশ্নও।
কংক্রিটের জঙ্গল ও ‘শহুরে তাপ দ্বীপ’ এর অদৃশ্য অভিশাপ
আরও উদ্বেগের বিষয় হল, শহরগুলির নির্মাণশৈলী নিজেই তাপমাত্রা বাড়িয়ে তুলছে। কংক্রিটের বহুতল, কমে যাওয়া সবুজ এলাকা, অতিরিক্ত গাড়ি, সংকীর্ণ রাস্তা—সব মিলিয়ে “শহুরে তাপ দ্বীপ” বা urban heat island তৈরি হচ্ছে। অর্থাৎ শহর আশপাশের এলাকার তুলনায় আরও বেশি উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। ফলত শীতাতপ নিয়ন্ত্রক যন্ত্রের প্রয়োজনীয়তা আরও বাড়ছে।
কিন্তু এই নির্ভরতারও একটি অদৃশ্য मूल्य আছে।
একটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রক যন্ত্র শুধু বিদ্যুৎ খরচই করে না, বাইরের পরিবেশেও অতিরিক্ত তাপ ছড়িয়ে দেয়। অর্থাৎ ঘরের ভেতর ঠান্ডা করতে গিয়ে শহরের বাইরের বাতাস আরও উত্তপ্ত হয়। দিল্লি বা গুরগাঁওয়ের মতো শহরে বহু বিশেষজ্ঞ মনে করেন, ব্যাপক হারে এয়ার কন্ডিশনার ব্যবহারের ফলে রাতের তাপমাত্রাও অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে।
বিদ্যুৎ বণ্টন সংস্থাগুলির আর্থিক সংকট
অন্যদিকে বিদ্যুৎ বণ্টন সংস্থাগুলির আর্থিক অবস্থাও চিন্তার বিষয়। বহু রাজ্যে বিদ্যুৎ সংস্থাগুলি বিপুল লোকসানে চলছে। রাজনৈতিক কারণে অনেক সময় ভর্তুকি দিয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়, কিন্তু সেই খরচের বোঝা ক্রমে অসহনীয় হয়ে উঠছে। যদি বিদ্যুতের চাহিদা এভাবেই বাড়তে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি প্রায় অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে।
বিকল্প ভাবনার খোঁজে
এই পরিস্থিতিতে শুধু আরও বিদ্যুৎ উৎপাদন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন সম্পূর্ণ নতুন ধরনের চিন্তাভাবনা।
প্রথমত, ভবনের নকশা বদলাতে হবে: ভারতে বহু পুরনো স্থাপত্যে এমন ব্যবস্থা ছিল যাতে ঘর তুলনামূলক ঠান্ডা থাকে—উঁচু ছাদ, খোলা উঠোন, বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা, পুরু দেওয়াল। আধুনিক শহুরে নির্মাণে সেসব প্রায় হারিয়ে গেছে। এখন প্রয়োজন “তাপ-সহনশীল” নগর পরিকল্পনা।
দ্বিতীয়ত, শক্তি-সাশ্রয়ী যন্ত্র ব্যবহারে জোর দিতে হবে: ভারতের বাজারে এখনও বহু নিম্নমানের শীতাতপ নিয়ন্ত্রক যন্ত্র বিক্রি হয় যা অতিরিক্ত বিদ্যুৎ খরচ করে। উন্নত মানের শক্তি-সাশ্রয়ী যন্ত্র বাধ্যতামূলক করা জরুরি।
তৃতীয়ত, নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার দ্রুত বাড়াতে হবে: সৌরশক্তি বিশেষ করে গরমের সময়ে অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে, কারণ সূর্যের তেজ যখন বেশি, তখনই বিদ্যুতের চাহিদাও বেশি থাকে। কিন্তু এখনও সৌরবিদ্যুৎ সঞ্চয়ের প্রযুক্তি ও গ্রিড পরিকাঠামো যথেষ্ট উন্নত নয়।
ক্রমশ উত্তপ্ত হতে থাকা পৃথিবীতে টিকে থাকার লড়াই
সবশেষে, এই সংকট আমাদের আরও বড় একটি সত্যের সামনে দাঁড় করাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়। এটি ইতিমধ্যেই বর্তমান বাস্তবতা। ভারতের মতো গরমপ্রবণ দেশে এর অভিঘাত আরও তীব্র হবে। বিদ্যুতের এই রেকর্ড চাহিদা তাই উন্নয়নের প্রতীক যেমন, তেমনি এক গভীর সতর্কবার্তাও।
কারণ প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত শুধু এতটুকুই নয় যে, আমরা কত বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারব। আসল প্রশ্ন হল—এক ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠা পৃথিবীতে আমরা আদৌ কতদিন এইভাবে বাঁচতে পারব?