Table of Contents
বাংলাস্ফিয়ার: বাংলার প্রশাসনিক ইতিহাসে এমন দৃশ্য খুব ঘনঘন দেখা যায় না। যে দুই পুলিশ অফিসারকে একসময় কার্যত নির্বাসনে পাঠানো হয়েছিল, যাঁদের নাম উচ্চারণ করলেই শাসকদলের অস্বস্তি ফুটে উঠত, আজ তাঁরাই আবার ফিরে এসেছেন ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে। শুধু ফিরে আসেননি, তাঁদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে সেই সময়কার অপশাসনের তদন্তের দায়িত্ব। যেন ইতিহাস নিজেই হঠাৎ করে নাট্যকার হয়ে উঠেছে।
এই কাহিনির দুই মুখ্য চরিত্র — দময়ন্তী সেন এবং জয়রামন। আর এই নাটকের রাজনৈতিক পরিচালক — শুভেন্দু অধিকারী।
বাংলার রাজনীতিতে ক্ষমতার পালাবদল নতুন কিছু নয়। কিন্তু ক্ষমতা বদলের পরে প্রশাসনিক স্মৃতির এমন প্রত্যাবর্তন বিরল। কারণ এখানে শুধু পদোন্নতি বা বদলির গল্প নেই। আছে অপমান, ভয়, রাজনৈতিক আনুগত্য, প্রশাসনিক নৈতিকতা এবং দীর্ঘ প্রতীক্ষার গল্প।
আনুগত্যই যোগ্যতা
দময়ন্তী সেনকে একসময় বাংলার সবচেয়ে দক্ষ পুলিশ অফিসারদের মধ্যে ধরা হত। কঠোর, শৃঙ্খলাবদ্ধ, এবং রাজনৈতিক চাপকে সহজে প্রশ্রয় না দেওয়ার জন্য তাঁর আলাদা পরিচিতি ছিল। প্রশাসনের ভেতরে অনেকেই বলতেন, তিনি “ফাইল দেখে নয়, তথ্য দেখে” সিদ্ধান্ত নেন। এই ধরনের অফিসাররা সব সরকারেরই প্রয়োজন হয়, কিন্তু সব সরকার তাঁদের পছন্দ করে না।
সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন প্রশাসনের নিরপেক্ষতা রাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে সংঘর্ষে আসে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জমানায় ধীরে ধীরে এমন এক প্রশাসনিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, যেখানে আনুগত্য অনেক সময় দক্ষতার থেকেও বড় যোগ্যতা হয়ে দাঁড়ায়। “কে কতটা কার্যকর” তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে ওঠে “কে কতটা অনুগত”। ফলে যে অফিসাররা নির্দেশ মেনে চলতেন, তাঁদের দ্রুত উত্থান হত। আর যাঁরা প্রশ্ন তুলতেন, নিয়মের কথা বলতেন, বা রাজনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর হয়ে উঠতেন, তাঁদের সরিয়ে দেওয়া হত নীরবে।
দময়ন্তী সেন সেই দ্বিতীয় শ্রেণির মধ্যে পড়ে যান। তাঁকে এমন জায়গায় পাঠানো হয়, যেখানে প্রশাসনিক গুরুত্ব কম, প্রভাব কম, দৃশ্যমানতা কম। সরকারি ভাষায় একে বলা হয় “রুটিন ট্রান্সফার”। কিন্তু বাংলার আমলাতন্ত্রে সবাই জানত, এটি আসলে নির্বাসন।
জয়রামনের ‘বদনাম’
জয়রামনের ক্ষেত্রেও ছবিটা খুব আলাদা ছিল না। তিনি প্রশাসনিক মহলে পরিচিত ছিলেন অত্যন্ত পদ্ধতিগত এবং নির্ভীক অফিসার হিসেবে। তদন্তে রাজনৈতিক পরিচয়কে গুরুত্ব না দেওয়ার বদনাম ছিল তাঁর। বাংলার রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এ এক ভয়ঙ্কর দোষ। কারণ এখানে দীর্ঘদিন ধরে পুলিশকে অনেক সময় আইনের রক্ষক নয়, রাজনৈতিক ব্যবস্থার সম্প্রসারিত হাত হিসেবেই দেখতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল শাসকশ্রেণি। ফলে জয়রামনকেও ধীরে ধীরে অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া হয়।
এই ঘটনাগুলি তখন খুব বড় খবর হয়নি। কারণ বাংলার জনজীবনে পুলিশ অফিসারের বদলি নতুন কিছু নয়। কিন্তু প্রশাসনের ভেতরে একটা ঠান্ডা বার্তা ছড়িয়ে পড়েছিল — “অতিরিক্ত সৎ হওয়ার দরকার নেই।”
এই সংস্কৃতির সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক এখানেই। কোনও সরকার প্রকাশ্যে কাউকে শাস্তি দেয় না। কাউকে গ্রেফতারও করে না। শুধু সরিয়ে দেয়। গুরুত্বহীন করে দেয়। অদৃশ্য করে দেয়। আর বাকিরা সেই দৃশ্য দেখে নিজেদের বদলে নেয়।
হিসাব চাওয়ার পালা
এই কারণেই আজকের প্রত্যাবর্তন এত তাৎপর্যপূর্ণ। ক্ষমতার পালাবদলের পরে শুভেন্দু অধিকারী যে কয়েকটি প্রতীকী পদক্ষেপ নিয়েছেন, তার মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত সম্ভবত এই দুই অফিসারের পুনর্বাসন। কারণ এটি কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, এটি একটি রাজনৈতিক বার্তাও।
বার্তাটি স্পষ্ট — “যাঁদের একসময় সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তাঁদেরই এখন ডাকা হচ্ছে হিসাব চাইতে।”
এখানেই নাটকীয়তা। যে আমলে তাঁরা উপেক্ষিত ছিলেন, আজ সেই আমলের ফাইলই তাঁদের টেবিলে ফিরে আসছে। যে ব্যবস্থার কাছে তাঁরা একসময় অস্বস্তিকর ছিলেন, আজ সেই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তদন্তের দায়িত্ব তাঁদের হাতে।
বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে এর মধ্যে একধরনের সাহিত্যিক ন্যায়বোধ আছে। যেন বহুদিন পরে কোনও উপন্যাসের অবহেলিত চরিত্র শেষ অধ্যায়ে ফিরে এসে কেন্দ্রীয় ভূমিকায় দাঁড়িয়েছে।
‘উইচ হান্ট’ নাকি প্রশাসনিক জবাবদিহি?
অবশ্য রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগও উঠছে। তৃণমূলের অনেক নেতা বলছেন, এটি আসলে “উইচ হান্ট”। তাঁদের অভিযোগ, প্রশাসনকে ব্যবহার করে পুরনো সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়া হচ্ছে।
এই যুক্তি পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কারণ ভারতীয় রাজনীতিতে ক্ষমতা বদলের পরে তদন্ত সংস্থার সক্রিয়তা নতুন ঘটনা নয়। দিল্লি থেকে কলকাতা — সর্বত্রই এই সংস্কৃতি আছে। কিন্তু তার মধ্যেও একটি প্রশ্ন থেকে যায় — যদি কোনও অফিসার সত্যিই সৎ এবং দক্ষ হন, তবে তাঁকে সরানো হয়েছিল কেন?
এই প্রশ্নটাই এখন মমতা জমানার জন্য অস্বস্তিকর। কারণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্তেরও স্মৃতি থাকে। ফাইল চুপ করে থাকে, কিন্তু ইতিহাস চুপ করে থাকে না।
আর বাংলার মানুষও গত এক দশকে অনেক কিছু দেখেছেন। দুর্নীতি, শিক্ষক নিয়োগ কেলেঙ্কারি, কয়লা ও গরু পাচার, রাজনৈতিক হিংসা, পুলিশি নিষ্ক্রিয়তা — এই সবকিছুর মধ্যে সাধারণ মানুষের একটা বড় অংশের মনে বিশ্বাস জন্মেছিল যে প্রশাসনের ভিতরে ভয় ঢুকে গেছে। অনেক অফিসার হয়তো চুপ থেকেছেন চাকরি বাঁচাতে। কেউ কেউ আপস করেছেন। কেউ কেউ সিস্টেমের অংশ হয়ে গিয়েছেন।
এই পটভূমিতে দময়ন্তী সেন ও জয়রামনের প্রত্যাবর্তনকে অনেকেই দেখছেন প্রশাসনিক প্রতীক হিসেবে — যেন বলা হচ্ছে, “সবাই মাথা নত করেনি।”
আসল পরীক্ষা এখন শুরু
তবে এখানেই শেষ নয়। আসল পরীক্ষা এখন শুরু।
কারণ ক্ষমতার পালাবদলের পরে “সৎ অফিসার” বলে যাঁদের সামনে আনা হয়, তাঁরা যদি পরে নতুন রাজনৈতিক ক্ষমতার হাতিয়ার হয়ে ওঠেন, তাহলে গোটা নৈতিক দাবিটাই ভেঙে পড়ে। বাংলার মানুষ ইতিমধ্যেই বহু “নিরপেক্ষ” অফিসারকে সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে অবস্থান বদলাতে দেখেছেন।
সুতরাং দময়ন্তী সেন এবং জয়রামনের সামনে এখন দ্বৈত চ্যালেঞ্জ। একদিকে তাঁদের প্রমাণ করতে হবে যে তাঁরা সত্যিই নিরপেক্ষ। অন্যদিকে দেখাতে হবে যে তদন্ত মানে প্রতিশোধ নয়, আইন।
যদি তাঁরা সেটা পারেন, তবে এই প্রত্যাবর্তন শুধুই রাজনৈতিক ঘটনা থাকবে না, এটি প্রশাসনিক ইতিহাসেরও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে উঠবে। আর যদি না পারেন, তবে এও বাংলার দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ইতিহাসে আরেকটি অধ্যায় হয়েই থেকে যাবে।
তবু আজকের মুহূর্তে দৃশ্যটা নিঃসন্দেহে নাটকীয়। একসময় যাঁদের করিডরের অন্ধকারে সরিয়ে রাখা হয়েছিল, আজ তাঁরাই আবার আলোয় ফিরে এসেছেন।
এবং ইতিহাসের সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার সম্ভবত এটাই — ক্ষমতা অনেক কিছু ভুলে যায়, কিন্তু অপমান কখনও পুরোপুরি হারিয়ে যায় না।