Home দৃষ্টিভঙ্গিবিশ্লেষণ বিজয়ের তামিলনাড়ু: একটি রাজনৈতিক ভূমিকম্পের অর্থ

বিজয়ের তামিলনাড়ু: একটি রাজনৈতিক ভূমিকম্পের অর্থ

0 comments 7 views
A+A-
Reset

রাজ্য রাজনীতিতে ঐতিহাসিক পটপরিবর্তন

বাংলাস্ফিয়ারঃ চেন্নাইয়ের রাজভবনে যেদিন বিজয় মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন, সেদিন শুধু একটা সরকার বদলায়নি। তামিলনাড়ুর ষাট বছরের রাজনৈতিক হিসেবনিকেশ একেবারে উলটে গেছে। তামিলনাড়ুর বিধানসভা নির্বাচনে তামিলাগা ভেট্রি কাজাগাম বা টিভিকে প্রথমবার ভোটে নেমেই একক বৃহত্তম দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে, এবং ড্রাভিডিয়ান দলগুলির ৫৯ বছরের একাধিপত্যের অবসান ঘটিয়েছে। ডিএমকে এবং এআইএডিএমকে — এই দুই দলের মধ্যে পালাবদলের যে অদৃশ্য চুক্তিতে তামিলনাড়ুর রাজনীতি দশকের পর দশক আটকে ছিল, তাকে একজন চলচ্চিত্র অভিনেতা প্রায় একা ভেঙে দিলেন।
এটিই তামিলনাড়ুর ইতিহাসে প্রথম হ্যাং অ্যাসেম্বলি। টিভিকে ১০৮টি আসন পেয়েছে, কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য দরকার ছিল ১১৮। ডিএমকে নেতৃত্বাধীন এসপিএ পেয়েছে মাত্র ৭৩টি আসন, যার মধ্যে ডিএমকে ৫৯টি এবং কংগ্রেস ৫টি। এনডিএ পেয়েছে ৫৩টি আসন, যার মধ্যে এআইএডিএমকে ৪৭টি এবং বিজেপি মাত্র একটি। ক্ষমতার এই নতুন অঙ্কে সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনা হল এম কে স্তালিনের ব্যক্তিগত পরাজয় — কোলাথুর কেন্দ্র থেকে স্তালিন হেরে গিয়েছেন, যেখানে তিনি আগে পরপর তিনবার জিতেছিলেন।

এই ঘটনার মানে বুঝতে হলে একটু পেছনে ফিরতে হবে। ১৯৬৭ সালের পর থেকে কংগ্রেস আর তামিলনাড়ুতে ক্ষমতায় আসেনি। তারপর থেকে ডিএমকে আর এআইএডিএমকের মধ্যে পালাক্রমে শাসন চলছিল। প্রতিটি দলই দ্রাবিড় রাজনীতির আদর্শ — পেরিয়ারের সমাজ সংস্কার, হিন্দিবিরোধী আন্দোলনের ঐতিহ্য, এসব বহন করত। কিন্তু দশকের পর দশকে সেই আদর্শ মিলিয়ে গিয়ে জায়গা নিয়েছে জাতপাতের সমীকরণ, পরিবারতন্ত্র আর দুর্নীতি।

নির্বাচনী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিএমকে সরকারের বিরুদ্ধে জমে ওঠা ক্ষোভ, বিজয়ের ফ্যানক্লাবগুলোকে সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তিতে বদলে দেওয়ার দক্ষতা আর টিভিকের জোরালো ডিজিটাল প্রচার — এই তিনটে মিলিয়েই বিজয়ের এই উত্থান। কিন্তু ছবিটা আরও বড়। উত্তর তামিলনাড়ু এবং পশ্চিমের কোঙ্গু অঞ্চলে টিভিকে রীতিমতো একচেটিয়া দাপট দেখিয়েছে— এলাকাগুলো ছিল এআইএডিএমকের ঘাঁটি। সালেম, কোয়েম্বাটুর, ইরোড, তিরুচিরাপল্লি, মাদুরাই — শহরের পর শহরে টিভিকে দুই দলকেই পিছনে ফেলেছে। এই শহুরে ভোটারদের বড় অংশ তরুণ, শিক্ষিত। তারা দ্রাবিড় রাজনীতির পুরনো বুলিতে আর আস্থা রাখেন না। তারা চাকরি চান, স্টার্টআপ চান, পরিষ্কার প্রশাসন চান।

তপশিলি সম্প্রদায়ের জন্য সংরক্ষিত ৪৬টি আসনের মধ্যে টিভিকে জিতেছে ২৪টিতে। কোনো নতুন দলের পক্ষে এটা সত্যিই অভূতপূর্ব। দ্রাবিড় দলগুলোর দলিত ভোটভিত্তিতে বিজয় যে ফাটল ধরালেন, সেটার প্রভাব বহু বছর থাকবে।

এখন স্বাভাবিক প্রশ্ন — বিজয় কি শুধুই একজন তারকা-রাজনীতিক, নাকি তার পেছনে কোনো রাজনৈতিক দর্শন আছে? টিভিকে আম্বেদকর, পেরিয়ার আর কামরাজের আদর্শে নিজেদের মধ্য-বাম বলে দাবি করে। ধর্মনিরপেক্ষতা, সামাজিক ন্যায়বিচার, সাম্য আর দুই-ভাষা নীতি — এগুলো তার ঘোষিত মতাদর্শ। কিন্তু আদর্শ ঘোষণা করা আর সরকার চালানো এক জিনিস নয়। টিভিকে একটি দল যেমন, একটি পরীক্ষাও তেমনই।

সরকার গঠনের প্রক্রিয়াটিও কম নাটকীয় ছিল না। রাজ্যপাল রাজেন্দ্র বিশ্বনাথ আর্লেকার বিজয়কে ১১৮ জন বিধায়কের সমর্থন-পত্র দেখাতে বলেন, কারণ তার মতে বিজয়ের কাছে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই — এই অভিযোগ মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়। এর পরেই বিজয়কে দেওয়া মুখ্যমন্ত্রী-নির্বাচিতের নিরাপত্তা বহর প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। একটি নির্বাচিত সরকারের পথে এ ধরনের বাধা ভারতীয় সাংবিধানিক রাজনীতিতে গভীর প্রশ্ন তোলে। কংগ্রেসের সাংসদ জ্যোতিমণি সরাসরি বললেন, বিজেপি-নিযুক্ত রাজ্যপাল রাজভবনকে রাজনীতির আখড়া বানিয়েছেন। রাজ্যপালের এই বিলম্ব এবং নিরাপত্তা বহর প্রত্যাহারের মতো ঘটনা থেকে স্পষ্ট যে কেন্দ্রীয় সরকার বিজয়ের ক্ষমতা গ্রহণকে মোটেই স্বস্তির চোখে দেখছে না।

বাম দলগুলো টিভিকেকে সমর্থনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় সরাসরি বলেছে — ১০ মের মধ্যে সরকার না হলে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হবে, যা আসলে হবে বিজেপির ছদ্ম-শাসন। শেষ পর্যন্ত বাম দলগুলোর বাইরে থেকে সমর্থন আর কংগ্রেসের সঙ্গে জোট বেঁধে ১০ই মে বিজয় ও তার মন্ত্রিসভা শপথ নেন। তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে একটি নতুন অধ্যায়ের শুরু হয়।

সর্বভারতীয় রাজনীতিতে কম্পন

তামিলনাড়ুর এই ঘটনার ঢেউ শুধু চেন্নাইতেই থামছে না।

সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে বিজেপির দক্ষিণ ভারত কৌশলে। মাত্র একটি আসন পেয়েছে দলটি — রীতিমতো বিপর্যয়। ২০২৪-এর লোকসভায় কিছুটা মাথা তুলেছিল তারা। কিন্তু ২০২৫-এর এপ্রিলে এআইএডিএমকের সঙ্গে জোট বাঁধা আর কে অন্নামালাইকে রাজ্য সভাপতির পদ থেকে সরানো — এই দুটো সিদ্ধান্তই তরুণ ও শহুরে ভোটারদের কাছে দলটিকে অপ্রাসঙ্গিক করে দিয়েছে। তামিলনাড়ুতে বিজেপির পরিচয় এখন একটি অর্থহীন জোট-সঙ্গী হিসেবেই স্থির হয়ে গেছে। টিভিকে বিজেপিকে সরাসরি আদর্শিক প্রতিপক্ষ বলেছে, আর কংগ্রেস টিভিকেকে সমর্থনের শর্তই রেখেছে যে বিজেপির সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখা যাবে না। ফলে আগামী পাঁচ বছর তামিলনাড়ু আর দিল্লির মধ্যে একটা টানটান, সম্ভাব্য সংঘর্ষমুখর সম্পর্ক থাকবে বলেই মনে হচ্ছে।

কংগ্রেসের জন্যও এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ মোড়। ইন্ডিয়া জোটের ছাতার নিচে তারা এতদিন ডিএমকের সঙ্গী ছিল। কিন্তু তামিলনাড়ু কংগ্রেস এবার নিজেই ডিএমকে ছেড়ে বিজয়ের পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিল, আর দিল্লির কংগ্রেস নেতৃত্ব সেই সিদ্ধান্ত রাজ্যের উপরেই ছেড়ে দিল। এতে ইন্ডিয়া জোটের ভেতরের ফাটল আরও স্পষ্ট হয়ে গেল, ডিএমকে কার্যত জোটের মধ্যে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ল। এর গভীরে আরও একটা টানাপোড়েন আছে। কংগ্রেস দীর্ঘদিন ধরে ইন্ডিয়া জোটে নেতৃত্বের দাবিদার, কিন্তু আঞ্চলিক দলগুলোর সঙ্গে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব সেই নেতৃত্বকে বারবার প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। তামিলনাড়ুতে কংগ্রেস যে পথ নিল, সেটা আসলে বিরোধী রাজনীতিতে আঞ্চলিক দলগুলোর ক্রমবর্ধমান স্বাধীনতারই প্রতিফলন।

ফেডারেলিজমের প্রশ্নটাও সামনে আসছে। বিজয় জুলাই ২০২৪ থেকেই নিট পরীক্ষা বাতিল আর শিক্ষাকে রাজ্যের হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি তুলছেন। এটা শুধু শিক্ষার প্রশ্ন নয় — ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর মূলে আঘাত করার প্রশ্ন। তামিলনাড়ু চিরকালই কেন্দ্রীয় আধিপত্যের বিরুদ্ধে সবচেয়ে সরব রাজ্যগুলোর একটি। বিজয়ের হাতে সেই সুর আরও চড়া হবে।

তাহলে কি এই উত্থান শুধু তামিলনাড়ুর গল্প? ভারতে তারকা-রাজনীতির ইতিহাস পুরনো — এনটি রামা রাও, এমজি রামচন্দ্রন, অমিতাভ বচ্চন। কিন্তু বিজয়ের ক্ষেত্রে ফারাক এটাই যে তিনি কোনো প্রতিষ্ঠিত দলের আশ্রয় নেননি, কোনো রাজনৈতিক পরিবারের ছায়া নেই পেছনে। মাত্র দুই বছরে দল গড়ে প্রথম ভোটেই রাজ্য শাসনের চাবিকাঠি পেলেন। ৮৫.১ শতাংশ ভোটার উপস্থিতি — রাজ্যের ইতিহাসে সর্বোচ্চ — এই সংখ্যাটাই বলে দেয়, মানুষ শুধু কাউকে সরাতে নয়, নতুন কিছু চাইতেই বেরিয়েছিলেন।

তামিলনাড়ুর মানুষ এবার রায় দিয়েছেন বদলের পক্ষে। সেই বদল কতটা আসল হবে, কতটা পুরনো রাজনীতির ফাঁদে আটকাবে — সেটা আগামী পাঁচ বছরে বোঝা যাবে। তবে এটুকু এখনই বলা যায়: ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্রে তামিলনাড়ু আর আগের মতো পূর্বাভাসযোগ্য নয়। আর সেটাই হয়তো সবচেয়ে বড় পরিবর্তন।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles