Table of Contents
বাংলাস্ফিয়ারঃ পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের মরসুমে কলকাতার রাজনৈতিক আলোচনায় কিছু মুখ বারবার ফিরে আসে। হইচই, হুঙ্কার, পাল্টা অভিযোগ, মঞ্চে উঠে মাইক্রোফোনট কেড়ে নেওয়ার প্রতিযোগিতা। কিন্তু এই উত্তাল পরিবেশে একজন মানুষ আছেন যিনি নিঃশব্দে, নিশ্চিন্তে, একটি বিশেষ স্বস্তির মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। তিনি বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। এবারের ভোটে তিনি প্রার্থী নন, সভাপতি। এবং এই দুটির মধ্যবর্তী যে অস্বস্তিকর শূন্যতা, সেটাই তাঁর সবচেয়ে বড় স্বস্তির কারণ।
শমীকের এই গল্প কেবল একটি নির্বাচনের নয়, বরং এক যত্নশীলভাবে রচিত রাজনৈতিক জীবনকাহিনি। যেখানে ব্যর্থতার ঝুঁকি ছায়ার মতো পাশে থাকলেও তা কখনও চূড়ান্ত আঘাত করেনি; ক্ষমতা কখনও সরাসরি করায়ত্ত না হলেও তাঁর পরিচিতির পরিধি সঙ্কুচিত হয়নি।
প্রথম সুখ: না-লড়ার রক্ষাকবচ
২০২৬-এর নির্বাচনে শমীক ভট্টাচার্য প্রার্থী হননি। ২০২৪-এর এপ্রিলে রাজ্যসভায় নির্বাচিত হওয়ায় তাঁর কাছে এবারের বিধানসভা ছিল সরাসরি সংঘাত এড়িয়ে যাওয়ার এক মোক্ষম সুযোগ। এই স্বস্তির শিকড় লুকিয়ে আছে তাঁর অতীতের নির্বাচনী পরিসংখ্যানে।
শ্যামপুকুর (২০০৬), বসিরহাট (২০১৪ লোকসভা), দমদম (২০১৯) কিংবা রাজারহাট-গোপালপুর (২০২১)—নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়া শমীকের জন্য বরাবরই কঠিন ছিল। একমাত্র জয়টি এসেছিল ২০১৪-র উপনির্বাচনে, অতি সামান্য ব্যবধানে। অর্থাৎ, ভোটের ময়দানে তিনি মোটেও ‘অজেয়’ নন। এই প্রেক্ষাপটে, এমন এক হাই-ভোল্টেজ নির্বাচনে প্রার্থী না হওয়া তাঁর জন্য শাপে বর। হারলে নেতৃত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হতো, আর না লড়ে সভাপতির অলঙ্কৃত চেয়ারে বসে ঝুঁকিহীন পরিচিতি উপভোগ করাটাই বুদ্ধিমানের কাজ।
দ্বিতীয় সুখ: মঞ্চ আছে, দায় নেই
রাজনীতিতে সেই পদটিই সবচেয়ে আকর্ষণীয়, যেখানে কৃতিত্ব নেওয়া যায় কিন্তু দায় অন্যের কাঁধে চাপানো যায়। ২০২৫-এর জুলাইয়ে রাজ্য সভাপতির দায়িত্ব পাওয়া শমীক আজ সেই বিরল সুবিধাজনক অবস্থানে।
এবারের নির্বাচনে বিজেপির রণকৌশল মূলত দিল্লি-চালিত। প্রার্থী তালিকা থেকে প্রচারের অভিমুখ—সবই কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণে। ফলে ফল ভালো হলে শমীক সাংবাদিক সম্মেলনে মধ্যমণি হয়ে ‘সাফল্যের কারিগর’ হিসেবে আবির্ভূত হতে পারবেন। আর ফল মন্দ হলে? খুব সহজেই বলা যাবে, “আমি তো কেবল সংগঠনের কাজে ছিলাম, মূল সিদ্ধান্ত তো ছিল কেন্দ্রের।” এই দ্বি-পাক্ষিক সুরক্ষা কবচই তাঁর রাজনৈতিক টিকে থাকার শ্রেষ্ঠ ফর্মুলা।
তৃতীয় সুখ: বক্তৃতার বাজার বনাম ভোটের ময়দান
শমীক ভট্টাচার্যকে যাঁরা চেনেন, তাঁরা জানেন — ভদ্রলোক বলেন ভালো। বাংলা উচ্চারণ পরিষ্কার, শব্দচয়নে একটি সাহিত্যিক মেজাজ আছে। যেখানে সমসাময়িক রাজনীতি চিৎকার আর কুৎসায় অভ্যস্ত, সেখানে শমীকের গলায় রূপক ও ইতিহাসের ছোঁয়া থাকে। কিন্তু এই বুদ্ধিবৃত্তিক বাগ্মিতা মধ্যবিত্তের ড্রয়িংরুমে বাহবা পেলেও বুথ স্তরে ভোট টানে না। যখন রাজনৈতিক বক্তব্য হয়ে ওঠে প্রতিটি বাক্যে প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করার প্রতিযোগিতা, যখন দিপ্তিমান হুঙ্কার আর নোংরা কাদা ছোড়ার মধ্যে দিয়ে রাজনৈতিক যুদ্ধ পরিচালিত হয়, তখন সুললিত ছন্দবদ্ধ বাংলা অনেকটা খড়কুটোর মতো উড়ে যায়। তবুও, শমীকের এই গুণটি তাঁকে একটি বিশেষ নিরাপত্তা দেয়। ক্যামেরার সামনে তাঁর এই ‘উপস্থাপনযোগ্যতা’ তাঁকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে টিকিয়ে রাখে।
চতুর্থ সুখ: শিকড়হীনতার বিশেষ স্বাধীনতা
রাজনীতিতে যাঁদের নিজস্ব অনুগামী আছে, নিজস্ব জনভিত্তি আছে, তাঁরা একটি অদ্ভুত দায়বদ্ধতায় আটকে থাকেন। তাঁদের হিসাব দিতে হয় — কর্মীদের কাছে, ভোটারদের কাছে, সংগঠনের কাছে। কিন্তু শমীক ভট্টাচার্য সেই দায়বদ্ধতা থেকে মুক্ত।
তাঁর রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়েছিল ১৯৭১ সালে RSS-এ যোগ দেওয়ার মধ্য দিয়ে। পরবর্তীকালে ভারতীয় জনতা যুব মোর্চার দক্ষিণ হাওড়া মন্ডল থেকে শুরু করে হাওড়া জেলা এবং রাজ্য স্তরে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব সামলেছেন। দীর্ঘ সাংগঠনিক পরিচিতি আছে, কিন্তু নিজস্ব কোনো ক্যাডার-বেস নেই, কোনো জেলা বা অঞ্চলে নিজের বলে দাবি করার মতো কোনো মাটি নেই।
এই শিকড়হীনতা আপাতদৃষ্টিতে দুর্বলতা মনে হলেও, তাঁর ক্ষেত্রে এটিই পরম স্বাধীনতা। যে নেতার হারানোর মতো কোনো ঘাঁটি নেই, তাঁকে কোনো ঘাঁটি রক্ষার চিন্তাও করতে হয় না। তিনি এক রাজনৈতিক যাযাবর, যাঁর কোনো স্থানীয় দায় নেই, তাই কোনো স্থানীয় ব্যর্থতাও তাঁকে স্পর্শ করে না।
পঞ্চম সুখ: প্রভাব ও অন্তরাল
রাজ্য সভাপতি হিসেবে প্রার্থী নির্বাচনে তাঁর ব্যক্তিগত পছন্দের প্রতিফলন থাকা স্বাভাবিক। এবারও তার ব্যত্যয় হয়নি বলেই মনে করা হচ্ছে। এই প্রার্থী নির্বাচনের প্রক্রিয়াটি বরাবরই পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায় — কারণ এখানে যোগ্যতা, জনপ্রিয়তা বা সাংগঠনিক ক্ষমতার চেয়ে অনেক সময় ব্যক্তিগত আনুগত্য বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। নিজের অনুগামীদের টিকিট পাইয়ে দিতে পারলে দলের অন্দরে প্রভাব বাড়ে। যদি তাঁরা জেতেন, তবে শমীক শক্তিশালী হবেন। আর হারলে দায় তো সেই আদি ও অকৃত্রিম—’কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের’। এই ‘প্রভাব খাটানো অথচ জবাবদিহি না করা’র এই অবস্থানটি রাজনৈতিক কৌশলের পাঠ্যপুস্তকের একটি ক্লাসিক পৃষ্ঠা।
ষষ্ঠ সুখ: ইতিহাসের এক মজার বিন্দু
শমীক ভট্টাচার্যের রাজনৈতিক পরিচয়ের একটি তথ্য প্রায়ই অলক্ষ্যে থেকে যায়। ২০১৪ সালের উপনির্বাচনে বসিরহাট দক্ষিণ থেকে জিতে তিনি হন বিধানসভার ইতিহাসে বিজেপির দ্বিতীয় বিধায়ক — প্রথমজন ১৯৯৯ সালে নির্বাচিত হয়েছিলেন। অর্থাৎ ২০১৪-র আগে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উপস্থিতি ছিল প্রায় প্রতীকী। সেই পরিবেশে জেতাটা নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য।
কিন্তু এই ইতিহাসটি শমীকের বর্তমান রাজনীতির সঙ্গে একটি বিরোধাভাস তৈরি করে। সেদিনের বিজেপি একটি ছোট, সংগ্রামী দল ছিল যেখানে প্রতিটি কর্মীর ব্যক্তিগত অবদান ছিল মূল্যবান। আজকের বিজেপি একটি রাজ্য জয়ের আনন্দে বিভোর বিশাল সংগঠন। সেই পরিবর্তনের মধ্যে শমীকের চরিত্রটি অদ্ভুতভাবে স্থির থেকেছে — সংগঠন-কেন্দ্রিক, বক্তৃতা-নির্ভর, নিজস্ব মাটিহীন।
সপ্তম সুখ: ঘোষণার আর্ট
এবারের ভোটের আগে শমীকের বক্তব্যগুলি লক্ষ্য করলে একটি প্যাটার্ন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি বলেছেন, কেন্দ্রীয় বাহিনী থাকুক বা না থাকুক, পুলিশ দিয়ে ভোট করালেও তৃণমূল হারবে এবং বিজেপি জিতবেই। এই ধরনের বিশাল দাবি করা রাজনীতিতে একটি সুপরিচিত কৌশল। যদি ভবিষ্যদ্বাণী মেলে, তাহলে দূরদর্শী নেতার তকমা পাওয়া যায়। না মিললে? মানুষ অনেক কথাই ভুলে যায়।
শমীক আরও বলেছেন যে মানুষ এখন ইডি-সিবিআই নিয়ে ভাবছে না, এবং তৃণমূলের হুঁশিয়ারি প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছেন যে বাচ্চারা অনেক কথা বলে, অবুঝ শিশু বাপকেও লাথ মারে। ব্যক্তিত্ব আছে, কিন্তু কার্যকারণ সম্পর্কটি অস্পষ্ট। দলের কি ইডি-সিবিআই-নির্ভর প্রচার ছেড়ে দেওয়া উচিত, নাকি মানুষের মনে সেই প্রসঙ্গটি এখন অকার্যকর হয়ে গেছে, সেই তফাৎটি তিনি ঘুচিয়ে দেন স্বভাবসিদ্ধ বাগ্মিতায়।
উপসংহার: রুটলেস ওয়ান্ডারারের জয়গান
ইংরেজিতে একটি কথা আছে – ‘টেফলন পলিটিশিয়ান’ (Teflon Politician), যার গায়ে কিছু আটকায় না। ব্যর্থতার দায় পিছলে যায়, সাফল্যের আলো ঠিকই ধরে রাখা যায়। শমীক ভট্টাচার্য সেই বিরল প্রজাতির বাঙালি রাজনীতিক যিনি এই বিশেষ গুণটি রপ্ত করেছেন।
তিনি একজন রুটলেস ওয়ান্ডারার— সংগঠনের মানুষ, কিন্তু সংগঠনের বাইরেও বিচরণ অবাধ। বক্তৃতার মানুষ, কিন্তু বক্তৃতা ছাড়া জনমত তৈরিতে তেমন অবদান নেই। নীতির মানুষ, কিন্তু কোন নীতি বা কোন এজেন্ডাটি তাঁর নিজস্ব, সেটা কেউ ঠিক বলতে পারে না।
এই চরিত্রটি বাংলার রাজনীতিতে একটি পরিচিত ধরনের প্রতিনিধি। এমন মানুষরা সাধারণত রাজনীতিতে টিকে থাকেন দীর্ঘ সময় কারণ তাঁদের হারানোর তেমন কিছু নেই, কিন্তু অর্জন করার সুযোগ সবসময় খোলা থাকে।
২০২৬ সালে পশ্চিমবঙ্গের ভোট যে ফলাফলই দিত না কেন, শমীক ভট্টাচার্যের রাজনৈতিক জীবনে সম্ভবত বড় কোনো আঘাত আসত না। তবে বিজেপির এই ল্যান্ডস্লাইড বিজয়ের পর তিনি আরও দ্বিগুণ আত্মবিশ্বাসে, কোনো প্রেস ক্লাবে বা দলের সদর দপ্তরে পরিপাটি পোশাকে বসে চশমাটা ঠিক করতে করতে শাণিত ভাষায় বক্তব্য রাখবেন। সাংবাদিক বৈঠকে বুদ্ধিদীপ্ত ও তাত্ত্বিক কামড়ে প্রতিপক্ষকে কুপোকাত করাই তাঁর চেনা রাজনীতি, আর সেখানেই তাঁর স্বস্তি ও সুখ।
এবং হয়তো এটাই ২০২৬-এর বাংলার রাজনীতির সবচেয়ে বড় রসাত্মক বাস্তবতা—যে মানুষটি এই ঐতিহাসিক পালাবদলের পর সবচেয়ে বড় ও তৃপ্তির হাসি হাসছেন, তিনি নিজে কিন্তু নির্বাচনী লড়াইয়ের মাঠেই ছিলেন না!