বাংলাস্ফিয়ার: ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর ছিল নির্বাচনী প্রচারাভিযানের সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায়। ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ৯১ লক্ষ নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, যা রাজ্যের মোট ভোটারের প্রায় ১২ শতাংশ। এই ছাঁটাইয়ের পটভূমিতে প্রথম দফায় ৯২ শতাংশেরও বেশি ভোটদানের হার দেখা গিয়েছে, যা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে একটি সংশয়ের প্রশ্ন উঠেছে: এই অভূতপূর্ব সংখ্যাটি কি প্রকৃত গণতান্ত্রিক উৎসাহের প্রতিফলন, নাকি ভোটার তালিকা সংকোচনের ফলে তৈরি হওয়া একটি পরিসংখ্যানী মায়া?

প্রশ্নটির গভীরে যেতে হলে প্রথমে ভোটদানের হার কীভাবে গণনা করা হয় সেটি বোঝা দরকার। ভোটদানের শতাংশ নির্ধারিত হয় মোট প্রদত্ত ভোটকে নিবন্ধিত ভোটার সংখ্যা দিয়ে ভাগ করে। অর্থাৎ হরটি ছোট হলে ভাগফল স্বাভাবিকভাবেই বড় হয়। একটি কাল্পনিক উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি স্পষ্ট করা যায়: ধরা যাক, একটি কেন্দ্রে আগে ৩ লক্ষ ভোটার ছিলেন এবং গত বার ২ লক্ষ ৪০ হাজার মানুষ ভোট দিয়েছিলেন, অর্থাৎ হার ছিল ৮০ শতাংশ। এসআইআরের পরে ভোটার সংখ্যা কমে ২ লক্ষ ৭০ হাজার হলে, সেই একই ২ লক্ষ ৪০ হাজার মানুষ ভোট দিলেও হার দাঁড়াবে ৮৮ শতাংশে। অর্থাৎ কোনো নতুন ভোটার না এলেও শুধু তালিকা সংকোচনের কারণেই হার ৮ শতাংশ বেড়ে যায়।
এই গাণিতিক যুক্তিটি অস্বীকার করার উপায় নেই। নির্বাচন কমিশনের তথ্য বলছে, অক্টোবর ২০২৫ থেকে এসআইআর প্রক্রিয়ায় ৯১ লক্ষ ২ হাজার ৫৭৭ জন ভোটারকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। ফলে মোট ভোটার সংখ্যা ৭ কোটি ৬৬ লক্ষ থেকে কমে ৬ কোটি ৭৫ লক্ষে নেমেছে, তবে পরে সম্পূরক তালিকায় কিছু সংযোজনের পর চূড়ান্ত সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬ কোটি ৮২ লক্ষে। যদি ধরে নেওয়া যায় যে ২০২১ সালে যত ভোট পড়েছিল, এবারও কাছাকাছি সংখ্যক ভোট পড়েছে, তাহলে হরের এই হ্রাস স্বয়ংক্রিয়ভাবে শতাংশের অঙ্কটিকে ফুলিয়ে তুলবে। পশ্চিমবঙ্গে ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ভোটদানের হার ছিল প্রায় ৭৭ থেকে ৭৮ শতাংশ। ১২ শতাংশ ভোটার তালিকা সংকোচন হলে, একই পরিমাণ ভোট পড়লেও শতাংশ তাত্ত্বিকভাবে ৮৮-৮৯ শতাংশের কাছে পৌঁছে যাওয়া উচিত। কিন্তু প্রথম দফায় ৯১.৮৩ থেকে ৯২.৮৮ শতাংশ ভোটদান, যা স্বাধীনতার পরে পশ্চিমবঙ্গে সর্বোচ্চ বলে দাবি করা হচ্ছে , সেটি শুধু গাণিতিক প্রতিফলন নয়, একটি প্রকৃত বৃদ্ধিও ঘটেছে বলে মনে হয়।
তাহলে এসআইআর-তত্ত্বের কতটা ভিত্তি আছে, আর কতটাই বা অতিরঞ্জন?  বাস্তব চিত্রটি সম্ভবত দুটি কারণের সমন্বয়। প্রথমত, গাণিতিক কারণ: তালিকা সংকোচন শতাংশের ভিত্তিকে বদলে দিয়েছে এবং এটি নিশ্চিতভাবেই অঙ্কটিকে স্ফীত করেছে। এটি তথ্য-জালিয়াতি নয়, বরং পরিমাপের পদ্ধতিগত একটি সীমাবদ্ধতা। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক কারণ: সিএএ, এনআরসি এবং এসআইআরকে কেন্দ্র করে বিশেষত সংখ্যালঘু ও অভিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে যে ভীতি ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল , সেটি ভোটারদের একটি বড় অংশকে বুথে টেনে এনেছে। বিজেপি সরকার এলে নাগরিকত্ব হারানোর আশঙ্কা থেকে তৃণমূলের পক্ষে ভোট নিশ্চিত করার একটি তীব্র উদ্দীপনা তৈরি হয়েছিল, যা প্রকৃত ভোটার উপস্থিতিকেও বাড়িয়েছে।
তবে এসআইআর-তত্ত্বের সমর্থকরা শুধু সংখ্যার অঙ্কেই সন্তুষ্ট নন। তাঁদের আরও গভীর অভিযোগ হলো, যে ৯১ লক্ষ নাম তালিকা থেকে কাটা গেছে, তার মধ্যে কতটুকু সত্যিকারের ভূতুড়ে বা মৃত ভোটার, আর কতটুকু জীবিত এবং ভোটাধিকারসম্পন্ন নাগরিক যাঁরা কেবল শনাক্তকরণ প্রক্রিয়ায় ধরা পড়েননি। ৬০ লক্ষেরও বেশিকে অনুপস্থিত বা মৃত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, আর ২৭ লক্ষের বিষয়টি ট্রাইব্যুনালের বিচারাধীন ছিল। অর্থাৎ একটি বড় সংখ্যার ভাগ্য এখনও অনিশ্চিত। যদি সেই ২৭ লক্ষের উল্লেখযোগ্য অংশ প্রকৃত ভোটার হয়ে থাকেন, তাহলে হরটি আরও বেশি কৃত্রিমভাবে ছোট হয়েছে, এবং ভোটদানের হারের সংখ্যাটি আরও বেশি ফাঁপা।
কিন্তু এই তত্ত্বের একটি সীমাবদ্ধতাও আছে। তালিকা সংকোচন যদি ভোটদানের হার বৃদ্ধির একমাত্র বা প্রধান কারণ হতো, তাহলে রাজ্যের সব কেন্দ্রে প্রায় সমানভাবে এই বৃদ্ধি দেখা যেত। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, দক্ষিণ দিনাজপুরে ভোটদানের হার ৯৫.২২ শতাংশে পৌঁছেছে, আর কোচবিহার ও বীরভূমেও ৯০ শতাংশের উপরে। এই আঞ্চলিক পার্থক্যগুলো নির্দেশ করে যে, শুধু পরিসংখ্যানী প্রক্রিয়া নয়, জেলাভেদে রাজনৈতিক প্রেরণা, প্রার্থীর পরিচিতি এবং স্থানীয় সংগঠনের শক্তিও এই সংখ্যাকে প্রভাবিত করেছে।
সারকথা হলো, এসআইআর-তত্ত্বটি আংশিকভাবে সত্য এবং গুরুত্বপূর্ণভাবে প্রাসঙ্গিক, কিন্তু এটি সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা নয়। ভোটার তালিকার ১২ শতাংশ সংকোচন শতাংশের হিসেবে যান্ত্রিকভাবে একটি ঊর্ধ্বমুখী চাপ তৈরি করেছে। এই চাপ ছাড়া ভোটদানের হার সম্ভবত ৮৫-৮৬ শতাংশের কাছাকাছি থাকত, যেটি উল্লেখযোগ্য হলেও স্বাধীনতার পরে সর্বোচ্চ হওয়ার দাবিদার হতো না। কিন্তু তালিকা সংকোচনের বাইরেও একটি প্রকৃত রাজনৈতিক উত্তেজনা ছিল, যা মানুষকে বুথে টেনেছে। তাই সংখ্যাটিকে সম্পূর্ণ বিভ্রম বলা যাবে না, আবার সম্পূর্ণ স্বাভাবিক উত্তেজনার প্রতিফলনও বলা যাবে না। এটি একটি মিশ্র ছবি, যেখানে পদ্ধতিগত পক্ষপাত এবং সত্যিকারের গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ দুটোই রয়েছে পাশাপাশি। প্রকৃত সংখ্যাটি বিশ্বাসযোগ্য কিনা তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হয়তো এটি: ৯১ লক্ষ ভোটারের তালিকাচ্যুতির মধ্যে কতজন সত্যিই তাঁদের ভোটাধিকার হারালেন? সেই উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত এই সংখ্যার নৈতিক মূল্য নিয়ে প্রশ্নটি খোলাই থাকবে।​​​​​​​​​​​​​​