বাংলাস্ফিয়ার: ২৩ ও ২৯ এপ্রিল, ২০২৬ — দুটি দিন যা ইতিহাসের পাতায় থাকবে।
ভোরের আলো ফোটার আগেই মুর্শিদাবাদের একটি গ্রামের বাসিন্দারা লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন। বয়স্ক মহিলারা শাড়ির আঁচল সামলে হাঁটছিলেন বুথের দিকে, তরুণরা ফোন হাতে সেলফি তুলছিলেন। কিন্তু এবার যা ছিল না তা হলো ভয়। কোনো রাইফেল হাতে গুন্ডা নয়, কোনো বোমার শব্দ নয়, কোনো বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ার খবর নয়। পাঁচ দশকের অভ্যেস ভেঙে, এপ্রিলের রোদ্দুর মাখা দুটো দিনে পশ্চিমবঙ্গ এমন একটি নির্বাচন দেখল যা রাজ্যের ইতিহাসে আগে কখনো দেখা যায়নি।
পশ্চিমবঙ্গে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ৯২.৪৭ শতাংশ ভোট পড়েছে — স্বাধীনতার পর থেকে রাজ্যে এটিই সর্বোচ্চ। প্রথম দফায় ২৩ এপ্রিল ৯৩.১৯ শতাংশ ভোট পড়েছে, যা রাজ্যের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ। রাজনৈতিক মতপার্থক্য যতই তীব্র হোক, একটি বিষয়ে শত্রুপক্ষও একমত — গত অর্ধশতকে এই রাজ্যে এমন ভোট হয়নি।


যে ইতিহাস এই ভোটকে অসাধারণ করে তোলে

পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী ইতিহাস বলতে গেলে একটি রক্তাক্ত অধ্যায়ের কথাই মনে আসে। ১৯৭২ সালের বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেস বিরোধী দলের উপর সহিংস দমন চালিয়ে ক্ষমতায় আসে বলে অভিযোগ রয়েছে। এরপর ১৯৭৭ সালে ক্ষমতায় আসার পর বাম ফ্রন্ট কংগ্রেসের চেয়েও বেশি তীব্রতায় রাজনৈতিক সহিংসতার সংস্কৃতি অব্যাহত রাখে। পঞ্চায়েত ভোট থেকে লোকসভা, প্রতিটি নির্বাচনে বাংলার মাটি রক্তে রঞ্জিত হয়েছে কোনো না কোনোভাবে।
জাতীয় অপরাধ রেকর্ড ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৯ সাল থেকে বাংলায় প্রতি বছর গড়ে ২০টি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের পর থেকে টিএমসি ও বিজেপি কর্মীদের মধ্যে অন্তত ৪৭টি রাজনৈতিক হত্যার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। ২০১৮ সালের পঞ্চায়েত ভোটে একদিনেই ১০ জনের মৃত্যু হয়েছিল, আর টিএমসি বিরোধী প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা না দিতে বাধ্য করে ৩৪ শতাংশ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতে নিয়েছিল। এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালের ভোটের শান্তিপূর্ণ পরিবেশকে বিচার করলেই বোঝা যায়, কতটা বড় পরিবর্তন ঘটেছে।

কমিশনের কৌশল: ঘোষণা থেকে বাস্তবায়ন

এই ভোটের স্থপতি হিসেবে নির্বাচন কমিশনের নাম সবার আগে আসছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক ভোটের আগেই ৪৮০ কোম্পানি আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেয়, যা দুটি ধাপে মার্চের শুরু থেকেই রাজ্যে পাঠানো হয়। কিন্তু এটুকুতেই থামেনি কমিশন।
দ্বিতীয় দফার ১৪২টি আসনে ভোটের জন্য সাতটি জেলায় ২,৩২১ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা হয়। শুধু কলকাতাতেই ছিল ২৭৩ কোম্পানি। এর সঙ্গে ছিলেন ১৪২ জন সাধারণ পর্যবেক্ষক, ৯৫ জন পুলিশ পর্যবেক্ষক এবং ১০০ জন ব্যয় পর্যবেক্ষক। ড্রোন ক্যামেরা আকাশ থেকে নজর রেখেছে সংবেদনশীল এলাকাগুলির উপর।
প্রযুক্তির ব্যবহারও ছিল চোখে পড়ার মতো। রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ কুমার আগরওয়াল জানান, এবার ওয়েবকাস্টিং ছিল একশো শতাংশ নির্ভুল। ইভিএম রেকর্ড করতে ক্যামেরার অবস্থান নির্ধারণ থেকে শুরু করে জেনারেটর কোথায় দরকার, ইন্টারনেট নেই এমন এলাকায় আলাদা প্রোটোকল — সব কিছুই আগে থেকেই পরিকল্পনা করা হয়েছিল। ৪১,০০১টি বুথের সবকটিই ছিল ওয়েবকাস্টিং নজরদারির আওতায়।
আগরওয়াল ভোটের দিন ঘোষণা করেন, “ভোট সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণভাবে হচ্ছে, কোনো অভিযোগ আসছে না।” এই বক্তব্য যে শুধু আনুষ্ঠানিক কথা ছিল না, তার প্রমাণ দিনের শেষে পরিষ্কার হয়ে যায়।

দুই দফায় দুটি ভিন্ন বাংলা

২৩ এপ্রিলের প্রথম দফায় ভোট হয়েছিল মূলত উত্তরবঙ্গ এবং কিছু মধ্যবঙ্গের আসনে যেখানে বিজেপির শক্তিশালী ঘাঁটি রয়েছে। সেখানে বিচ্ছিন্ন কিছু উত্তেজনার ঘটনা ঘটলেও প্রথম দফায় কোনো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি। মুর্শিদাবাদের নওদায় পাথর ছোঁড়া, দমকলে সিপিএম-টিএমসি সংঘর্ষ, বিজেপি প্রার্থী সুভেন্দু সরকারের উপর হামলার অভিযোগ — এসব ছিল। কিন্তু গুলি চলেনি, লাশ পড়েনি।
২৯ এপ্রিলের দ্বিতীয় দফা ছিল আরও জটিল — কলকাতা, হাওড়া, নদিয়া, হুগলি, উত্তর ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা। এটাই টিএমসির মূল শক্তিক্ষেত্র। সেদিন সকাল থেকেই ভবানীপুরে মুখোমুখি হয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী, একই বুথ এলাকায় এসে পৌঁছেছিলেন প্রায় একই সময়ে। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হওয়ার সব উপাদান ছিল। তবু বড় কোনো সংঘর্ষ হয়নি।
দ্বিতীয় দফায় সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত ৯২.৪৭ শতাংশ ভোট পড়েছে। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, সেই সংখ্যা আরও বাড়বে কারণ বিকেল ৬টার আগে লাইনে দাঁড়ানো ভোটাররা তখনও ভোট দিচ্ছিলেন। সারা দিনে ছোটখাটো কিছু সংঘর্ষ হলেও কোনো বড় সহিংসতার খবর পাওয়া যায়নি।


যে প্রশ্নগুলো থেকেই যায়

এই উজ্জ্বল চিত্রের কিছু অন্ধকার দিকও রয়েছে, যা নিরপেক্ষ মূল্যায়নের স্বার্থে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। দিনের শেষে ৩৯৭টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ১,৩৮৩টি তাজা বোমা উদ্ধার হয়েছে রাজ্য জুড়ে। এগুলো সংগ্রহ করা ছিল এবং কমিশনের সতর্ক পদক্ষেপে ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি — এই সত্যটি দুটো দিকেই আলো ফেলে। একদিকে কমিশনের কৃতিত্ব, অন্যদিকে বাংলার নির্বাচনী সংস্কৃতিতে এখনো হিংসার শিকড় কতটা বেশি গভীর।

ইভিএম বিকৃতির বিষয়টিও উঠে এসেছে। উত্তর চব্বিশ পরগনা, হাওড়া ও পূর্ব বর্ধমানে ওয়েবকাস্টিংয়ের মাধ্যমেই বুথের ভেতরে কারচুপির চেষ্টা ধরা পড়ে। দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার ২৬টির বেশি বুথে কালো টেপ দিয়ে ইভিএম বোতাম ঢেকে রাখা হয়েছিল বলে অভিযোগ। কমিশন এই ঘটনাগুলিতে কঠোর ব্যবস্থার কথা জানিয়েছে এবং পুনর্ভোটের সিদ্ধান্তও নেওয়া হচ্ছে। ভোটার তালিকা থেকে ৯১ লক্ষেরও বেশি নাম বাদ দেওয়ার বিষয়টিও রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে, যা এখনো বিচারবিভাগীয় পর্যালোচনাধীন।
তৃণমূলের অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেছেন, হাওড়ার উদয়নারায়ণপুরে কেন্দ্রীয় বাহিনীর ধাক্কায় এক বৃদ্ধ ভোটার মারা গেছেন। তদন্তে ঘটনাটির সত্যতা যা-ই বেরোক, একটিও নিশ্চিত রাজনৈতিক সহিংসতাজনিত মৃত্যু না হওয়াটাই ইতিহাসের পরিবর্তন।

ভোটারদের কথা: নীরব বিপ্লব

তৃণমূল কংগ্রেস বলছে, এত বেশি মানুষ ভোট দিতে এসেছেন কারণ তারা মনে করেছেন এটাই তাদের শেষ সুযোগ — যাদের নাম ভোটার তালিকা থেকে কাটা পড়েছে, তারাও ছুটে এসেছেন। কংগ্রেস নেতা অধীর রঞ্জন চৌধুরীর মন্তব্য ছিল, কেন্দ্রীয় বাহিনীর উপস্থিতির কারণেই মানুষ এত বড় সংখ্যায় ভোট দিতে পারছেন। দুটো ব্যাখ্যাতেই একটা সত্য লুকিয়ে আছে — বাংলার মানুষ ভোট দিতে চান, বাধা না থাকলে তারা ভোট দেন।
কিন্তু শুধু বাহিনী দিয়ে ৯৩ শতাংশ ভোট হয় না। কোচবিহার থেকে কলকাতা, ঝাড়গ্রাম থেকে জলপাইগুড়ি — লক্ষ লক্ষ মানুষ ভোর থেকে লাইনে দাঁড়িয়েছেন, রোদে পুড়েছেন, তবু কারো হাতের নির্দেশের অপেক্ষা না করেই নিজের রায় জানিয়েছেন। এটি একটি নীরব নাগরিক বিবৃতি।

বাংলার সুনাম এবং সামনের পথ

এই রেকর্ড ভোটকে গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের শক্তিশালী স্বীকৃতি হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। দশকের পর দশক ধরে বাংলার ভোট মানেই ছিল বুথ দখল, ব্যালট পেপার পুড়িয়ে দেওয়া, রাস্তায় লাশ। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পরে ব্যাপক পোস্ট-পোল সহিংসতা হয়েছিল, যার মধ্যে ধর্ষণ ও হত্যার মতো গুরুতর অপরাধও অন্তর্ভুক্ত ছিল। সেই প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালের ভোটের শান্তিপূর্ণ পরিসংহার একটি বড় ইঙ্গিত।
তবু প্রশ্ন থাকে। কেন্দ্রীয় বাহিনীর বিপুল মোতায়েন সত্ত্বেও ইভিএম কারচুপির চেষ্টা, বোমা মজুত, ভয় দেখানোর ঘটনা — এগুলো মনে করিয়ে দেয় যে একটি ভোটের শান্তি এবং একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন এক কথা নয়। আগামীকাল বাহিনী চলে যাবে — এই উদ্বেগটাই এখন সবচেয়ে বড়। কমিশনের ঘোষণা অনুযায়ী, ভোটের পরেও প্রায় ৭০০ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী রাজ্যে মোতায়েন থাকবে।
৪ঠা মে গণনা হবে। ফলাফল যা-ই হোক, ২৩ ও ২৯ এপ্রিল ২০২৬ পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে একটি বিশেষ জায়গা নেবে। এই রাজ্য প্রমাণ করল যে এখানে গণতন্ত্র বাঁচে, মানুষ ভোট দিতে চায়, শুধু প্রয়োজন ছিল একটু নিরাপত্তার নিশ্চয়তা। সেটুকু পেলে বাংলার মানুষ কী করতে পারেন, তার উত্তর ৯২.৪৭ শতাংশের সংখ্যাটাই দিয়ে দেয়।​​​​​​​​​​​​​​​​