বাংলাস্ফিয়ার: রোববার সন্ধ্যায় ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ঘোষণা করল, তেহরান পরবর্তী দফা আলোচনায় অংশ নেওয়ার কোনো পরিকল্পনা করছে না। একইসঙ্গে ইরানের সামরিক বাহিনী অভিযোগ করল, আমেরিকা ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে। এই ঘোষণা এলো ঠিক সেই সময়ে, যখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানালেন তিনি ইসলামাবাদে মার্কিন আলোচক দল পাঠাচ্ছেন — এবং একইসঙ্গে ইরানের অবকাঠামো ধ্বংসের হুমকি পুনরায় উচ্চারণ করলেন।

 

জাহাজ আটক ও পাল্টা হুমকি

রোববার ট্রাম্প জানালেন, হরমুজ প্রণালির কাছে মার্কিন অবরোধ ভেঙে এগিয়ে আসার চেষ্টা করায় ইরানের একটি মালবাহী জাহাজ আটক করা হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় তিনি লিখলেন, “জাহাজটি আমাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে, দেখছি ভেতরে কী আছে।”

ইরানের সামরিক বাহিনী জানাল, জাহাজটি চীন থেকে আসছিল। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে এক সামরিক মুখপাত্র হুঁশিয়ারি দিলেন, “ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সশস্ত্র বাহিনী মার্কিন সামরিক বাহিনীর এই সশস্ত্র জলদস্যুতার জবাব শিগগিরই দেবে।”

 

আলোচনা শুরুর আগেই সংকট

আমেরিকা জানিয়েছিল, মার্কিন-ইজরায়েলি-ইরান যুদ্ধ থামানোর লক্ষ্যে সোমবার পাকিস্তানে একটি প্রতিনিধিদল পাঠানো হবে। কিন্তু ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থার ভাষ্য — “পরের দফায় অংশ নেওয়ার এখন কোনো পরিকল্পনা নেই” — শুরু হওয়ার আগেই এই আলোচনাকে বিপদে ফেলে দিল।

ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের নেতৃত্বে বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জামাতা জারেড কুশনারকে নিয়ে মার্কিন প্রতিনিধিদলের ইসলামাবাদে ফেরার কথা রয়েছে।

সরকারি সংবাদ সংস্থা ইরনা জানাল, তেহরানের অনুপস্থিতির কারণ হলো “ওয়াশিংটনের অতিরিক্ত দাবি, অবাস্তব প্রত্যাশা, অবিরাম অবস্থান বদল, বারবার পরস্পরবিরোধী বক্তব্য এবং চলমান নৌ-অবরোধ — যাকে ইরান যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন বলে মনে করে।”

 

প্রণালি বিরোধ ও যুদ্ধবিরতি প্রশ্নে পাল্টাপাল্টি

এর আগের দিন শনিবার ইরান হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে কঠোর বিধিনিষেধ পুনরায় জারি করে — মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে প্রণালি খুলে দেওয়ার চুক্তি করা সত্ত্বেও। মার্কিন নৌ-অবরোধ না তোলায় ইরান এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

ট্রাম্প অভিযোগ করলেন, শনিবার সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার পর ইরান দুটি বাণিজ্যিক জাহাজে গুলি চালিয়ে যুদ্ধবিরতি ভেঙেছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘায়ি পাল্টা বললেন, মার্কিন নৌ-অবরোধই আসলে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন এবং এটি “বেআইনি ও অপরাধমূলক।” সোশ্যাল মিডিয়ায় তিনি লিখলেন, ইরানের জনগণের ওপর ইচ্ছাকৃতভাবে সম্মিলিত শাস্তি চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের সমতুল্য।

রোববার সকালে জাহাজ-ট্র্যাকিং ওয়েবসাইটে দেখা গেছে, দুটি তরলীভূত পেট্রোলিয়াম গ্যাস ট্যাংকার প্রণালির দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু আধা-সরকারি তাসনিম বার্তা সংস্থা জানাল, ইরানের সশস্ত্র বাহিনী সেগুলো ফিরিয়ে দিয়েছে।

 

ট্রাম্পের চরমপত্র

রোববার ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বললেন, বুধবার দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি শেষ হওয়ার আগে ইসলামাবাদে যে আলোচনা হওয়ার কথা, সেটাই ইরানের জন্য “শেষ সুযোগ।” তিনি বললেন, “ইরান যদি এই চুক্তিতে সই না করে, পুরো দেশটা উড়িয়ে দেওয়া হবে।” আগের হুমকির পুনরাবৃত্তি করে তিনি জানালেন, চুক্তি না হলে ইরানের প্রতিটি বিদ্যুৎকেন্দ্র ও প্রতিটি সেতু ধ্বংস করা হবে। আমেরিকার প্রস্তাবিত চুক্তিতে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া এবং ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত না রাখার শর্ত রয়েছে। ট্রাম্প এটিকে “অত্যন্ত ন্যায্য ও যুক্তিসঙ্গত” বলে অভিহিত করেছেন।

তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ট্রাম্পের এই ধরনের হুমকি এই যুদ্ধজুড়ে একটি পরিচিত ছন্দ মেনে চলছে — বহুবার এরকম কড়া বক্তব্যের পরেই উত্তেজনা প্রশমনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। দুই সপ্তাহ আগেও তিনি হঠাৎ যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছিলেন, যেখানে মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে বলেছিলেন ইরানের “পুরো সভ্যতা আজ রাতেই মরবে।”

 

কূটনৈতিক তৎপরতা

শনিবার রাতে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইরানের প্রধান আলোচক ও সংসদ স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের কালিবাফ বললেন, “কূটনীতির ময়দানে কোনো পিছুটান নেই।” তবে দুপক্ষের মধ্যে বিরাট ব্যবধান রয়ে গেছে বলে তিনি স্বীকার করলেন।

পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানাল, রোববার উপপ্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ ইসহাক দার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে কথা বলেছেন। সেই ফোনালাপে “অঞ্চল ও বিশ্বের শান্তি ও স্থিতিশীলতার স্বার্থে যত দ্রুত সম্ভব সংলাপ অব্যাহত রাখার প্রয়োজনীয়তা” নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের মধ্যেও একটি ফোনালাপের পরিকল্পনা রয়েছে। জাতিসংঘে মার্কিন দূত মাইক ওয়াল্টজ এবিসি নিউজকে বললেন, নতুন দফা আলোচনায় “অবিশ্বাস্য রকম তাৎপর্যপূর্ণ” ফলাফল আসবে বলে তিনি আশাবাদী।

 

অর্থনৈতিক চাপ ও রাজনৈতিক হিসাব

বিশ্বের মোট তেল বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সাধারণত হরমুজ প্রণালি দিয়ে যায়। যুদ্ধ যতদিন চলছে, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট ততই গভীর হচ্ছে। শুক্রবার প্রণালি খুলে দেওয়ার ঘোষণায় বছরের পর বছরের মধ্যে এক দিনে তেলের দাম সবচেয়ে বেশি পড়ে গিয়েছিল এবং শেয়ারবাজার সর্বকালীন উচ্চতায় উঠেছিল — বিনিয়োগকারীরা ভেবেছিলেন সংকট শিগগিরই কাটবে। কিন্তু প্রণালি এখনো বন্ধ থাকায় সোমবার বাজার খুলতেই নতুন অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।

তেহরানের কাছে হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখাটা সম্ভবত সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার — এটি ট্রাম্পের ওপর রাজনৈতিক চাপ তৈরি করছে। নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসে দলের সরু সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে মরিয়া রিপাবলিকানদের কারণে এই যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজে পেতে ট্রাম্পের ওপর চাপ ক্রমেই বাড়ছে।

 

যুদ্ধের বিস্তৃত প্রেক্ষাপট

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার মাঝেই মার্কিন-ইজরায়েলি হামলার মধ্য দিয়ে এই যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। আট সপ্তাহ ধরে চলা এই যুদ্ধে ইরান ও লেবাননে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন।

গত সপ্তাহে ইরানের সঙ্গে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির পাশাপাশি ইজরায়েল ও লেবাননও আলাদা যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। লেবাননে ইজরায়েলি আক্রমণে ১০ লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। ইজরায়েল বলছে, তেহরানের মিত্র শক্তিশালী শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহকে দমন করতেই এই অভিযান চালানো হয়েছে — হিজবুল্লাহ ইরানের পক্ষে সমর্থনে সীমান্ত পেরিয়ে হামলা চালাচ্ছিল।