বাংলাস্ফিয়ার: ইডি-র তলব উপেক্ষা করে উধাও কলকাতা পুলিশের ডিসি শান্তনু সিনহা বিশ্বাস — কালীঘাটের বিশ্বস্ত মানুষটি এখন তদন্তের কেন্দ্রে। রোববার ভোরের আলো ফোটার আগেই, ঘড়িতে তখন সকাল সাতটা, এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের আধিকারিকরা বালিগঞ্জের ফার্ন রোডে এসে পৌঁছান। গন্তব্য — কলকাতা পুলিশের ডেপুটি কমিশনার শান্তনু সিনহা বিশ্বাসের বাড়ি। তল্লাশি শুরু হয় সেখানেই। কিন্তু কেন্দ্রীয় তদন্তকারীরা যাঁকে খুঁজছিলেন, তিনি সেখানে ছিলেন না। বিশ্বাস, যিনি পশ্চিমবঙ্গ ও কলকাতা পুলিশের ওয়েলফেয়ার কমিটির চিফ কোঅর্ডিনেটর ও নোডাল অফিসার, তাঁর বাসভবনে তাঁকে পাওয়া যায়নি। ইডি একই সঙ্গে বেহালা এলাকায় ব্যবসায়ী জয় কামদারের বাড়িতেও হানা দেয়। সান এন্টারপ্রাইজের ম্যানেজিং ডিরেক্টর কামদারকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ইডি দফতরে নিয়ে যাওয়া হয়।
শান্তনু সিনহা বিশ্বাসের নাম রাজনৈতিক মহলে পরিচিত হয়ে ওঠে মূলত তাঁর কালীঘাট পুলিশ স্টেশনে কর্মকালের সময় থেকে। বিশ্বাস একসময় কালীঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক ছিলেন। এই থানাটি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত। কালীঘাট থানা শুধু একটি পুলিশ স্টেশন নয়, এটি মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবনের সন্নিকটে অবস্থিত এবং দলীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচিত। সূত্রের মতে, সহকারী কমিশনার পদে থাকাকালীন বিশ্বাস সেই থানায় বসেই পুলিশবাহিনীর বদলি ও পোস্টিং নিয়ন্ত্রণ করতেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বাহিনীর অভ্যন্তরীণ সূত্র অনুযায়ী, এই বদলি-বাণিজ্য থেকে কোটি কোটি টাকা তোলা হত, যার একটি অংশ তৃণমূল কংগ্রেসের তহবিলে পৌঁছাত।
কয়লা কেলেঙ্কারির তদন্তে বিশ্বাসের নাম পাওয়ার পর তাঁকে আগেও তলব করা হয়েছিল। সেবার, যখন তিনি কালীঘাট থানায় এসিপি পদে কর্মরত ছিলেন, তখন তিনি নয়াদিল্লিতে ইডি অফিসে হাজিরা দিয়েছিলেন এবং বেশ কিছু নথিপত্র জমা দিয়েছিলেন, যা পরে পরীক্ষা করা হয়। কিন্তু তদন্ত সেখানেই থামেনি। বরং যত দিন গেছে, তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের পরিধি প্রসারিত হয়েছে।
এবারের তদন্তের সূত্রপাত সোনা পাপ্পু ওরফে বিশ্বজিৎ পোদ্দার নামের এক অভিযুক্ত অপরাধীকে ঘিরে। ইডির ৯ এপ্রিলের বিবৃতি অনুযায়ী, পোদ্দার ও তাঁর সহযোগীরা পশ্চিমবঙ্গে সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্রের কার্যক্রম চালিয়ে বেআইনিভাবে অর্থ উপার্জন করেছেন। পোদ্দার খোদ কলকাতার গোলপার্কের কানকুলিয়া রোডে সংঘর্ষের ঘটনায় পুলিশের কাছে ফেরার এবং এখনও পলাতক। বিস্ময়কর বিষয় হল, সোনা পাপ্পু সামাজিক মাধ্যমে লাইভে আসছেন, জনসমক্ষে দেখা দিচ্ছেন, অথচ পুলিশ তাঁকে ধরতে পারছে না। এই ব্যর্থতাই ইডির সন্দেহকে আরও গভীর করেছে — কেউ কি তাঁকে আড়াল করছে? প্রথম দফার তল্লাশিতে ১ এপ্রিল বিভিন্ন জায়গা থেকে ১ কোটি ৪৭ লক্ষ টাকা নগদ, সোনার গয়না ও ৬৭ লক্ষ ৬৪ হাজার টাকা মূল্যের রুপার সামগ্রী এবং একটি দেশীয় রিভলভার উদ্ধার করা হয়।
ইডি বিশ্বাসকে ৬ এপ্রিল সকালে নয়াদিল্লিতে হাজিরা দিতে বলেছিল। কিন্তু সেই তলবে তিনি সাড়া দেননি। তারপর ১৯ এপ্রিল যখন ইডি বাড়িতে পৌঁছায়, তখনও তিনি নেই। কোথায় আছেন এই মুহূর্তে — সেটাই বড় প্রশ্ন। একজন কর্মরত আইপিএস অফিসার, যাঁর কাজ আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা, তিনি কীভাবে কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থার নাগাল এড়িয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন — এই প্রশ্নটি এখন রাজ্যের রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে। বিরোধী দলের নেতারা অভিযোগ করছেন, রাজ্য সরকারের পূর্ণ মদতেই এই পলায়ন সম্ভব হচ্ছে।
ঘটনার সময়কালটিও উল্লেখযোগ্য। পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচন হওয়ার কথা ২৩ এবং ২৯ এপ্রিল। এই নির্বাচনের ঠিক আগে একজন সিনিয়র পুলিশ অফিসারের বাড়িতে ইডির হানা স্বাভাবিকভাবেই ব্যাপক রাজনৈতিক তরঙ্গ তৈরি করেছে। তৃণমূল কংগ্রেস এই অভিযানকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে চিহ্নিত করে দাবি করছে, বিজেপি কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলিকে হাতিয়ার করে নির্বাচনের মুখে রাজ্যকে অস্থির করতে চাইছে। বিরোধীরা পাল্টা জিজ্ঞেস করছেন — যদি অভিযোগই মিথ্যা, তাহলে শান্তনু সিনহা বিশ্বাস কোথায়? কেন তিনি মুখোমুখি হচ্ছেন না?
এই ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। গত কয়েক বছরে পশ্চিমবঙ্গে শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি, কয়লা পাচার, বালি মাফিয়া — প্রতিটি কেলেঙ্কারিতেই দেখা গেছে প্রশাসনিক আধিকারিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে একটি অলিখিত সমঝোতা। পুলিশ সংস্কার নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজ্য পুলিশবাহিনীর উপর শাসক দলের প্রভাব ভারতে নতুন কিছু নয়, কিন্তু যখন পুলিশকে প্রত্যক্ষভাবে অর্থসংগ্রহের যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তখন সেটি প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষয়ের চূড়ান্ত পর্যায়ের ইঙ্গিত দেয়। শান্তনু সিনহা বিশ্বাসের মামলা সেই একই দীর্ঘ অবক্ষয়ের আরেকটি অধ্যায় বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
ইডি সূত্র জানাচ্ছে, বিশ্বাসকে শীঘ্রই আবার তলব করা হতে পারে। জয় কামদারকে জিজ্ঞাসাবাদ থেকে যা বেরিয়ে আসবে, তা তদন্তকে নতুন মোড় দিতে পারে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, নির্বাচনের পর পরিস্থিতি আরও জটিল হবে। তৃণমূল ক্ষমতায় ফিরলে তদন্তের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন থাকবে, আর রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলে এই মামলা নতুন গতি পাবে। কিন্তু এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি সহজ — একজন পুলিশ অফিসার, যাঁর কাজ অপরাধীদের ধরা, তিনি নিজে পলাতক। এই দৃশ্যটি পশ্চিমবঙ্গের শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে যা বলছে, তার উত্তর হয়তো ভোটের পরেই মিলবে।