বাংলাস্ফিয়ার: পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে যা হচ্ছে তাকে রাজনৈতিক বিতর্ক বললে কমই বলা হয়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মধ্যে যে বাকযুদ্ধ চলছে, তাতে প্রতিটি কথার পেছনে আছে কৌশল, আধা-সত্য, এবং কখনো কখনো সরাসরি মিথ্যার ছায়া। কে কতটা সত্যি বলছেন, সেটাই এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

মহিলা সংরক্ষণ বিল: কে আসলে কার পক্ষে?

লোকসভায় মহিলা সংরক্ষণ বিল — সংবিধানের ১৩১তম সংশোধনী — পাস হয়নি। বিলের পক্ষে ভোট পড়েছিল ২৯৮টি, বিপক্ষে ২৩০টি। তবে সাংবিধানিক সংশোধনীর জন্য দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা, অর্থাৎ ৩৫২টি ভোট দরকার ছিল, যা পাওয়া যায়নি।
এই ব্যর্থতাকে হাতিয়ার বানিয়ে মোদী বাংলায় একের পর এক সভা করেছেন। বাঁকুড়া থেকে মেদিনীপুর — সর্বত্র একই বার্তা। “বাংলার বোনেরা চেয়েছিলেন ৩৩ শতাংশ সংরক্ষণ। মোদী সেটা নিশ্চিত করেছিলেন। তারা চেয়েছিলেন এটা ২০২৯ থেকেই চালু হোক। কিন্তু তৃণমূল চায়নি বাংলার মেয়েরা রাজনীতিতে আসুক,” বলেছেন তিনি।
এটা কতটা সত্যি? আংশিক সত্যি। কারণ তৃণমূল যা করেছে সেটা আরেকটু জটিল।
মমতা পাল্টা বলছেন, “তারা মহিলাদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের আসল দাবিকে হাতিয়ার বানিয়ে নিজেদের সংকীর্ণ এজেন্ডা চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল। ব্যর্থ হয়েছে।” তাঁর যুক্তি — তৃণমূল সংরক্ষণের বিরুদ্ধে নয়, বরং সীমানা পুনর্নির্ধারণের বিরুদ্ধে।
এই দাবিও পুরোপুরি মিথ্যে নয়। বিলটি শুধু মহিলা সংরক্ষণের কথা বলেনি। এর সঙ্গে জুড়ে ছিল সীমানা পুনর্নির্ধারণ, যেখানে ২০১১ সালের জনগণনার ভিত্তিতে লোকসভার আসন পুনর্বণ্টন হতো। এর ফলে দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলো — কেরালা, তামিলনাড়ু — আসন হারাতে পারত। বাংলার ক্ষেত্রেও প্রশ্ন ছিল উপস্থিত।
অমিত শাহ সংসদে বলেন, বিতর্কে অংশ নেওয়া ৫৬ জন মহিলা সাংসদ সহ ১৩০ জন বক্তার বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে গেছে বিরোধী জোট আসলে মহিলা সংরক্ষণেরই বিরোধী। কিন্তু এটা বিজেপির পক্ষের বয়ান, যা নিরপেক্ষভাবে প্রমাণসাপেক্ষ।

মমতার আসল রেকর্ড: দাবি ও বাস্তব

তৃণমূলের নারী প্রতিনিধিত্বের দাবিটি তথ্যের দিক থেকে মজবুত। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল তাদের ৪২ জন প্রার্থীর মধ্যে ১২ জন মহিলা মনোনীত করে, এবং তারা সবাই জেতেন। বর্তমান লোকসভায় তৃণমূলের ৩৭.৯৩ শতাংশ সাংসদ মহিলা, যা সব বড় দলের মধ্যে সর্বোচ্চ। বিজেপির ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ১২.৯২ শতাংশ।
তাহলে কি মোদীর দাবি একেবারেই ভিত্তিহীন? মোটেও নয়। কারণ রাজ্য বিধানসভায় তৃণমূলের মহিলা বিধায়কের হার মাত্র ১৪ শতাংশ। লোকসভায় উজ্জ্বল ছবি আর রাজ্যের বিধানসভায় অনুজ্জ্বল বাস্তবতা — এই দ্বন্দ্বটুকু মমতা আলোচনায় আনেন না।

ভোটার তালিকা: মুছে যাওয়া নামের গল্প

এই নির্বাচনের আরেকটি বড় বিতর্ক হলো এসআইআর — স্পেশাল ইন্টেনসিভ রিভিশন। এই প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গের প্রায় ৯০ লক্ষ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে — রাজ্যের ৭ কোটি ৬০ লক্ষ ভোটারের প্রায় ১২ শতাংশ।
মমতা বলছেন, “এসআইআর প্রক্রিয়া পশ্চিমবঙ্গে পক্ষপাতদুষ্টভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে, বিজেপির সুবিধার জন্য।” তাঁর দাবিকে সমর্থন করে কিছু তথ্য। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মুসলিম-অধ্যুষিত জেলাগুলোতে বাদ পড়ার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি — মুর্শিদাবাদে ৪ লক্ষ ৬০ হাজার, উত্তর ২৪ পরগনায় ৩ লক্ষ ৩০ হাজার, মালদহে ২ লক্ষ ৪০ হাজার।
সাবার ইনস্টিটিউটের গবেষণায় দেখা গেছে, নন্দীগ্রামে ৯৪.৫ শতাংশ বাদ পড়া ভোটার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের। মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদন দেখাচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে নথিপত্র সঠিক থাকা সত্ত্বেও নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, নামের বানানের সামান্য ফারাকের কারণে।
বিজেপির পাল্টা দাবি — এই প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করা। কিন্তু একটি বেসরকারি গবেষণা সংস্থা দেখিয়েছে, সামগ্রিকভাবে মুসলিম নয়, মতুয়া হিন্দু সম্প্রদায়ের নামও ব্যাপকভাবে বাদ পড়েছে। অর্থাৎ, সমস্যাটি শুধু সাম্প্রদায়িক নয়, প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলাও কাজ করেছে।

হেলিকপ্টার ঘটনা ও ঝালমুড়ি রাজনীতি

প্রচারের মাঝে এক ছোট ঘটনাও বড় বিতর্কে পরিণত হয়েছে। ঝাড়গ্রামে সভার পর মোদী ঝালমুড়ি খাচ্ছিলেন, সেই ছবি ভাইরাল হয়। মমতা অভিযোগ করলেন, এই ‘এক্সটেন্ডেড স্ন্যাক ব্রেক’-এর কারণে ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেন ও তাঁর স্ত্রী বিধায়ক কল্পনা সোরেনকে হেলিকপ্টার নামানোর অনুমতি দেওয়া হয়নি। এর মধ্যে থেকে মমতা আদিবাসী বিরোধী মনোভাবের অভিযোগ তুললেন।
এই দাবির সত্যতা আংশিক যাচাইযোগ্য — হেলিকপ্টার নামানোর অনুমতি না পাওয়ার ঘটনাটি ঘটেছিল, তবে সেটা সরাসরি ঝালমুড়ির কারণে কিনা, তা আর বলা সম্ভব নয়।

বিচারক কে?

দুই নেতার বক্তব্য মেলালে যা বেরিয়ে আসে তা হলো — উভয়ই তথ্য ব্যবহার করেন, কিন্তু সুবিধামতো অংশটুকু নিয়ে। মোদী মহিলা সংসদে তৃণমূলের উজ্জ্বল রেকর্ড এড়িয়ে যান, মমতা বিধানসভার হতাশাজনক চিত্র আড়াল করেন। এসআইআর প্রশ্নে মমতার দাবি তথ্যনির্ভর, কিন্তু পুরো ছবিটা শুধু মুসলিম ভোটারদের নয়। মোদীর ‘অনুপ্রবেশকারী’ তত্ত্বের পাশে আছে নথিসহ বাদ পড়া লক্ষ লক্ষ ভারতীয় নাগরিকের বেদনার ইতিহাস।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি বাইরের মানুষের কাছে বরাবরই জটিল। এই নির্বাচনে সত্যিটা আরও জটিল। ভোটার নিজেই সিদ্ধান্ত নেবেন — ঠিক কোন অর্ধেক সত্যকে তিনি বিশ্বাস করবেন।