ওয়াশিংটন থেকে প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে ইঙ্গিত মিলেছে, আমেরিকার ঘনিষ্ঠ উপসাগরীয় মিত্র দেশগুলি—বিশেষ করে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত—প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-কে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়ে যেতে উৎসাহ দিচ্ছে। তাদের মতে, এক মাস ধরে চলা মার্কিন নেতৃত্বাধীন বোমা হামলায় তেহরান এখনও পর্যাপ্তভাবে দুর্বল হয়নি, ফলে এই মুহূর্তে যুদ্ধ থামানো কৌশলগতভাবে ভুল হবে।
যুদ্ধের শুরুতে অবশ্য এই দেশগুলির মধ্যে এক ধরনের অস্বস্তি ছিল। তারা অভিযোগ করেছিল, আমেরিকা তাদের যথেষ্ট আগাম সতর্ক করেনি এবং তাদের উদ্বেগকেও গুরুত্ব দেয়নি। তখন আশঙ্কা করা হয়েছিল, এই সংঘাত গোটা অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই অবস্থানে পরিবর্তন এসেছে। এখন উপসাগরীয় বিশ্বের একাংশ মনে করছে, এই যুদ্ধই হয়তো একটি “ঐতিহাসিক সুযোগ”, যার মাধ্যমে ইরানের ধর্মীয় শাসনব্যবস্থাকে স্থায়ীভাবে দুর্বল করা সম্ভব।
সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও বাহরাইনের কর্মকর্তারা ব্যক্তিগত আলোচনায় জানিয়েছেন, তারা চান সামরিক অভিযান চলতে থাকুক—অন্তত ততদিন, যতদিন না ইরানের নেতৃত্বে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে বা তাদের নীতিতে মৌলিক বদল দেখা যায়। যদিও এই অবস্থান প্রকাশ্যে ঘোষণা করা হয়নি, তবুও একাধিক সূত্রে তা নিশ্চিত হয়েছে।
এই অবস্থান এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই কখনও ইঙ্গিত দিচ্ছেন যে ইরানের নেতৃত্ব আলোচনায় বসতে প্রস্তুত, আবার কখনও চুক্তি না হলে যুদ্ধ আরও জোরদার করার হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন। ফলে হোয়াইট হাউসের অবস্থান এখনও কিছুটা দোদুল্যমান বলেই মনে হচ্ছে।
অন্যদিকে, আমেরিকার অভ্যন্তরে এই যুদ্ধের জন্য জনসমর্থন অর্জন করা ট্রাম্পের পক্ষে সহজ হচ্ছে না। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ইতিমধ্যেই তিন হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। তবুও ট্রাম্প ক্রমশ আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠছেন যে তাঁর প্রধান উপসাগরীয় মিত্ররা এখন তাঁর পাশে রয়েছে।
তিনি এক বক্তব্যে দাবি করেন, “সৌদি আরব লড়ছে, কাতার লড়ছে, ইউএই লড়ছে, কুয়েত লড়ছে, বাহরাইন লড়ছে—সবাই লড়ছে।” যদিও বাস্তবে এই দেশগুলি তাদের ভূখণ্ডে মার্কিন ঘাঁটি ও সেনা মোতায়েনের সুযোগ দিয়েছে, সরাসরি আক্রমণে তারা অংশ নেয়নি।
তবে উপসাগরীয় দেশগুলির মধ্যেও মতভেদ স্পষ্ট। এক কূটনীতিকের মতে, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত সবচেয়ে বেশি চাপ দিচ্ছে সামরিক পদক্ষেপ জোরদার করার জন্য। বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাত আরও কঠোর অবস্থানে গিয়ে স্থল অভিযান চালানোর পক্ষেও মত দিচ্ছে। কুয়েত ও বাহরাইনও এই অবস্থানকে সমর্থন করছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের এই কড়া অবস্থানের পেছনে রয়েছে তাদের নিজস্ব অভিজ্ঞতা। ইরানের পক্ষ থেকে দুই হাজার তিনশোরও বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে পড়ার ফলে তাদের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে, ওমান ও কাতার বরাবরের মতোই কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তারা দীর্ঘদিন ধরেই ইরান ও পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে আসছে।
সৌদি আরব আমেরিকাকে স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, এখনই যুদ্ধ থামালে কোনও “ভাল চুক্তি” সম্ভব হবে না—অর্থাৎ এমন একটি সমঝোতা, যা উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। তাদের মতে, একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানের জন্য ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করা, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করা, মিত্র গোষ্ঠীগুলিকে সমর্থন বন্ধ করা এবং ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালী অবরোধ করার ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া জরুরি।
এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য হয় ইরানের বর্তমান ধর্মতান্ত্রিক শাসনের মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন, নয়তো সেই ব্যবস্থাকেই সরিয়ে দিতে হবে—এমনটাই মনে করছে সৌদি নেতৃত্ব।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের মন্ত্রী নোরা আল কাবি আরও কঠোর ভাষায় বলেন, “যে শাসনব্যবস্থা সাধারণ মানুষের ওপর ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়, বৈশ্বিক বাণিজ্যকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে এবং মিত্র গোষ্ঠীগুলিকে সমর্থন করে—তা আর গ্রহণযোগ্য নয়।”
অন্যদিকে, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, ইরানকে কখনও পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের সুযোগ দেওয়া যাবে না, কারণ তাদের আদর্শ অত্যন্ত বিপজ্জনক—এবং এই বিষয়ে তাদের প্রতিবেশীরাও একমত।
সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান-ও মনে করেন, ইরানের সামরিক শক্তি ও ধর্মীয় নেতৃত্বকে আরও দুর্বল করা উপসাগরীয় অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থে প্রয়োজন। তবে একইসঙ্গে সৌদি আরব উপলব্ধি করছে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে ইরানের পাল্টা আঘাতের ঝুঁকি বাড়বে—বিশেষ করে তাদের তেলভিত্তিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর।
এই প্রেক্ষাপটে সৌদি সরকার জানিয়েছে, তারা শেষ পর্যন্ত একটি রাজনৈতিক সমাধানই চায়, তবে আপাতত তাদের প্রধান অগ্রাধিকার নিজেদের জনগণ ও অবকাঠামোর সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
এদিকে, ট্রাম্প বারবার তুলে ধরছেন যে উপসাগরীয় দেশগুলি তাঁর সঙ্গে ঐক্যবদ্ধভাবে রয়েছে। এমনকি তিনি ন্যাটো দেশগুলির সমালোচনাও করেছেন, যারা এই যুদ্ধে অংশ নেয়নি। তিনি সৌদি যুবরাজকে “যোদ্ধা” এবং “অসাধারণ ব্যক্তি” বলেও প্রশংসা করেছেন।
তবে এখনও পর্যন্ত ট্রাম্প উপসাগরীয় দেশগুলিকে সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণের আহ্বান জানাননি। এর একটি বড় কারণ হতে পারে—একাধিক দেশের বাহিনী একসঙ্গে আকাশপথে কাজ করলে জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা। যুদ্ধের শুরুতেই ভুলবশত কুয়েতি বাহিনীর গুলিতে তিনটি মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার ঘটনাও সেই আশঙ্কাকে বাড়িয়ে দিয়েছে।
সব মিলিয়ে, পরিস্থিতি এখন এক জটিল সমীকরণে দাঁড়িয়ে—একদিকে উপসাগরীয় দেশগুলির যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার চাপ, অন্যদিকে দীর্ঘায়িত সংঘাতের সম্ভাব্য বিপর্যয়কর পরিণতি। এই দ্বিধাবিভক্ত বাস্তবতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আমেরিকার প্রতিটি সিদ্ধান্ত এখন শুধু পশ্চিম এশিয়া নয়, গোটা বিশ্বের ভবিষ্যৎকেই প্রভাবিত করতে পারে।