আমেরিকার রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব দিনের সাক্ষী রইল দেশটি। শনিবার জুড়ে “নো কিংস” শিরোনামে আয়োজিত ৩,৩০০-রও বেশি কর্মসূচিতে, এবং বিশ্বের এক ডজনেরও বেশি দেশে মিলিয়ে, ৮০ লক্ষেরও বেশি মানুষ রাস্তায় নেমে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানালেন। আয়োজকদের দাবি, এক দিনে এত ব্যাপক গণসমাবেশ আমেরিকার ইতিহাসে আগে কখনও দেখা যায়নি। এই আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক সংস্থা মুভঅন-এর ডেপুটি কমিউনিকেশনস ডিরেক্টর ব্রিট জ্যাকোভিচ একে সরাসরি “ঐতিহাসিক” বলে বর্ণনা করেছেন।
এটি ছিল “নো কিংস” আন্দোলনের তৃতীয় পর্ব। এর আগে গত অক্টোবরে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভেও প্রায় ৭০ লক্ষ মানুষ অংশ নিয়েছিলেন। এই আন্দোলনের পেছনে রয়েছে একাধিক সংগঠন—ইন্ডিভিজিবল, ৫০৫০১ আন্দোলন, বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন এবং তৃণমূল স্তরের নাগরিক উদ্যোগ। ফলে এটি কোনও একক রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি নয়; বরং এটি বিস্তৃত জনঅসন্তোষের সম্মিলিত বহিঃপ্রকাশ।
এই বিক্ষোভের পেছনে জমা হয়েছে বহুস্তরীয় ক্ষোভ। অভিবাসন দপ্তরের অভিযানে ধরপাকড়, ইরান যুদ্ধ নিয়ে অসন্তোষ, ভোটাধিকার নিয়ে উদ্বেগ—সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ একসঙ্গে বিস্ফোরিত হয়েছে। ৫০৫০১ আন্দোলনের জাতীয় সমন্বয়ক সারা পার্কার স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, “গতবারের পর থেকেই আমরা দেখছি জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বেড়েছে, তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইরানে একটি অবৈধ যুদ্ধ। মানুষ স্বাভাবিকভাবেই ক্ষুব্ধ।”
সবচেয়ে বড় সমাবেশগুলির একটি হয়েছিল মিনেসোটার টুইন সিটিজ—মিনিয়াপোলিস ও সেন্ট পল-এ। সেখানে প্রায় দুই লক্ষ মানুষ রাজ্য রাজধানীর আশেপাশের রাস্তায় জড়ো হন। এই সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন বার্নি স্যান্ডার্স, যিনি তাঁর বক্তৃতায় ধনকুবেরদের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক প্রভাবের তীব্র সমালোচনা করেন। একই মঞ্চে সংগীত পরিবেশন করেন ব্রুস স্প্রিংস্টিন, আর তাঁর গান ঘিরে ভিড় থেকে ওঠে স্লোগান—“আইস আউট নাও!”
এই সমাবেশে বিশেষভাবে স্মরণ করা হয় মিনিয়াপোলিসের দুই বাসিন্দা—রেনি গুড ও অ্যালেক্স প্রেট্টি—যাঁরা ফেডারেল অভিযানে নিহত হন। তাঁদের নাম বারবার উঠে আসে প্ল্যাকার্ডে। এমনকি অভিনেত্রী জেন ফন্ডা রেনি গুডের স্ত্রীর একটি বার্তাও পড়ে শোনান, যা সমাবেশে এক আবেগঘন পরিবেশ সৃষ্টি করে।
নিউ ইয়র্ক শহরেও ছিল বিপুল জনসমাগম। টাইমস স্কোয়ার থেকে সেন্ট্রাল পার্ক—বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মিছিল এসে একত্রিত হয়। মিছিলে সামনের সারিতে ছিলেন রবার্ট ডি নিরো, লেটিশিয়া জেমস, জুমানে উইলিয়ামস, আল শার্পটন এবং পদ্মা লক্ষ্মী। তাঁদের হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল—“আমরা আমাদের গণতন্ত্র রক্ষা করি—মানুষ আগে, ধনকুবের নয়।”
এই বিক্ষোভে উঠে এসেছে নানা বার্তা—এলজিবিটিকিউ+ অধিকারের সমর্থনে পতাকা, ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতির চিহ্ন, আবার একইসঙ্গে অভিবাসন নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। তবে সবচেয়ে জোরালো সুর ছিল যুদ্ধবিরোধী অবস্থান। অনেকেই স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন—তাঁরা স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান এবং উন্নত অবকাঠামো চান; অন্তহীন যুদ্ধ নয়।
ওয়াশিংটন ডিসিতেও প্রতিবাদকারীরা জড়ো হন। লিংকন মেমোরিয়ালের সামনে কিছু ফিলিস্তিনি মা বিশাল পতাকা হাতে দাঁড়িয়ে জানান, তাঁদের করের টাকা যুদ্ধের পেছনে ব্যয় করা হচ্ছে, অথচ দেশের অভ্যন্তরে মানুষ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনতেই হিমশিম খাচ্ছে। অন্যদিকে শিকাগোতে হাজার হাজার মানুষ “ট্রাম্প মাস্ট গো নাও” স্লোগান তুলে গ্রান্ট পার্কে সমবেত হন। শহরের মেয়র ব্র্যান্ডন জনসন বলেন, “আমাদের আন্দোলন আরও বিস্তৃত, আমাদের সংকল্প আরও দৃঢ়।”
সব মিলিয়ে, “নো কিংস” আন্দোলন শুধুমাত্র একটি প্রতিবাদ নয়—এটি আমেরিকার অভ্যন্তরে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা অসন্তোষের বিস্ফোরণ। অভিবাসন নীতি, অর্থনৈতিক চাপ, যুদ্ধ এবং নাগরিক অধিকারের প্রশ্ন—সবকিছু একসঙ্গে এসে এই আন্দোলনকে এক বৃহত্তর রাজনৈতিক সঙ্কেত হিসেবে তুলে ধরেছে। ভবিষ্যতে এর প্রভাব কতটা গভীর হবে, তা সময় বলবে, তবে এটুকু নিশ্চিত—আমেরিকার গণতান্ত্রিক পরিসরে এক তীব্র দ্বন্দ্ব এখন স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান।