Home খবর বৃদ্ধ বাপ-মাকে না দেখলেই বেতন কাটা

বৃদ্ধ বাপ-মাকে না দেখলেই বেতন কাটা

0 comments 6 views
A+A-
Reset

তেলেঙ্গানায় এক নতুন সামাজিক বার্তা নিয়ে এগোচ্ছে সরকার—যে রাজ‍্য সরকারি কর্মচারি সন্তান  বৃদ্ধ বাবা-মায়ের দেখভাল করবেনা মাসের শেষে তার বেতন কাটা যাবে। শোনায় কঠোর, কিন্তু এর পিছনে রয়েছে এক গভীর সামাজিক সঙ্কট, যা শুধু তেলেঙ্গানা নয়, সমগ্র ভারতেই ক্রমশ প্রকট হয়ে উঠছে।

 

রাজ্যের প্রশাসনিক সূত্রে জানা যাচ্ছে, এই প্রস্তাবটি মূলত সরকারি কর্মচারীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য করার কথা ভাবা হচ্ছে। অর্থাৎ, যাঁরা সরকারি চাকরিতে রয়েছেন এবং আর্থিকভাবে সক্ষম হয়েও নিজেদের বৃদ্ধ মা-বাবার দেখভাল করছেন না তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সেই ব্যবস্থার মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত পদক্ষেপ হোল বেতন থেকে নির্দিষ্ট অংশ কেটে সরাসরি বাবা-মায়ের ভরণপোষণের জন্য দেওয়া।

 

এই উদ্যোগের পিছনে যুক্তিটা সরল কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ। গত কয়েক বছরে দেখা যাচ্ছে বৃদ্ধ মা-বাবাকে অবহেলা করা, তাঁদের একা ফেলে রাখা বা সম্পূর্ণভাবে আর্থিক দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার ঘটনা বাড়ছে। শহুরে জীবন, নিউক্লিয়ার পরিবার, কর্মব্যস্ততা সব মিলিয়ে পারিবারিক কাঠামো বদলে যাচ্ছে। সেই পরিবর্তনের ধাক্কায় সবচেয়ে অসহায় হয়ে পড়ছেন বয়স্ক মানুষরা।

 

ভারতে ইতিমধ্যেই একটি আইন রয়েছে—২০০৭ সালের ‘Maintenance and Welfare of Parents and Senior Citizens Act’। এই আইনে বলা হয়েছে, সন্তানের আইনত দায়িত্ব রয়েছে তাঁদের বাবা-মায়ের ভরণপোষণ করার। প্রয়োজনে বৃদ্ধরা ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ করতে পারেন এবং সন্তানদের মাসিক ভাতা দিতে বাধ্য করা যায়। কিন্তু বাস্তবে এই আইন প্রয়োগ খুব একটা কার্যকর হয়নি। অনেকেই আইনের কথা জানেন না আবার অনেক ক্ষেত্রেই সামাজিক লজ্জা বা পারিবারিক দ্বন্দ্বের ভয়ে অভিযোগ করতে চান না।

 

তেলেঙ্গানা সরকার মনে করছে শুধু আইনের অস্তিত্ব যথেষ্ট নয় এর প্রয়োগকে দৃশ্যমান এবং বাস্তব করতে হবে। তাই তারা প্রশাসনিক স্তরে এমন একটি ব্যবস্থা আনতে চাইছে, যেখানে অভিযোগ প্রমাণিত হলে সরাসরি বেতনের ওপর হস্তক্ষেপ করা যাবে। এতে একদিকে যেমন বাবা-মায়েরা নিশ্চিতভাবে আর্থিক সহায়তা পাবেন, অন্যদিকে সন্তানদের কাছেও একটি স্পষ্ট বার্তা যাবে—দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগ নেই।

 

তবে এই প্রস্তাব ঘিরে বিতর্কও কম নয়। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন রাষ্ট্র কী ব্যক্তিগত পারিবারিক সম্পর্কে এতটা হস্তক্ষেপ করতে পারে? বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানের সম্পর্ক তো শুধুই আর্থিক নয়, সেখানে মানসিক দূরত্ব, পারিবারিক বিবাদ, এমনকি অত্যাচারের ইতিহাসও থাকতে পারে। সেই জটিল সম্পর্ককে কি শুধুমাত্র বেতনের অঙ্ক দিয়ে মাপা সম্ভব?

 

আরও একটি বড় প্রশ্ন হচ্ছে, এই নিয়ম কীভাবে কার্যকর করা হবে? কে নির্ধারণ করবে যে কোনও ব্যক্তি সত্যিই বাবা-মায়ের দায়িত্ব নিচ্ছেন না? অভিযোগের ভিত্তি কী হবে? মিথ্যা অভিযোগের সম্ভাবনা কি নেই? প্রশাসনিকভাবে এই পুরো প্রক্রিয়া চালানো সহজ নয়, এবং এর অপব্যবহারের ঝুঁকিও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

 

তবু এই উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে।এটি সমাজকে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করাচ্ছে। আমরা কি সত্যিই আমাদের বৃদ্ধ বাবা-মায়ের প্রতি দায়িত্ব পালন করছি? আধুনিকতার দোহাই দিয়ে কি আমরা সম্পর্কের মৌলিক দায় এড়িয়ে যাচ্ছি?

 

তেলেঙ্গানার এই প্রস্তাব হয়তো নিখুঁত নয়, এতে ত্রুটি থাকতে পারে, কিন্তু এটি এক ধরনের সতর্কবার্তা। পরিবার নামের যে প্রতিষ্ঠানটি ভারতীয় সমাজের মেরুদণ্ড হিসেবে এতদিন টিকে ছিল সেটির ভিত কি নড়বড়ে হয়ে যাচ্ছে? যদি হয়ে থাকে, তাহলে শুধু আইন নয়, সামাজিক সচেতনতা এবং মূল্যবোধের পুনর্গঠনই হতে পারে এর প্রকৃত সমাধান।

 

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা আইনের নয়, নৈতিকতার।বাবা-মা আমাদের জন্য যা করেছেন, তার প্রতিদান কি আমরা দিতে পারছি? নাকি সেই দায় এখন আইনের দোরগোড়ায় ঠেলে দিতে হচ্ছে?

 

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles