Home খবর ইজরায়েলে হুথির প্রথম হামলা

ইজরায়েলে হুথির প্রথম হামলা

0 comments 5 views
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার: পশ্চিম এশিয়ার চলমান সংঘাত নতুন এক বিপজ্জনক মোড় নিল শনিবার। ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি জঙ্গিগোষ্ঠী প্রথমবারের মতো সরাসরি ইজরায়েলের ওপর হামলা চালাল। প্রায় এক মাস আগে শুরু হওয়া আমেরিকা-ইজরায়েল বনাম ইরান যুদ্ধে এই ঘটনা এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। শুধু যুদ্ধের বিস্তার নয়, বৈশ্বিক বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক বাজারেও বড় ধরনের অস্থিরতার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ইজরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, ইয়েমেন থেকে ছোঁড়া একটি ক্ষেপণাস্ত্র তারা মাঝ আকাশেই প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছে। হুথিরাও স্বীকার করেছে, এটি ছিল এই যুদ্ধে তাদের প্রথম সামরিক অভিযান। তারা দাবি করেছে, ইজরায়েলের একাধিক সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে। তবে এই হামলায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। ইজরায়েলের রহাত শহর থেকে পাওয়া খবর অনুযায়ী, হুথিদের এই যুদ্ধে প্রবেশ ইরান এবং লেবাননের হিজবুল্লাহর হামলার সঙ্গে সমন্বয় করে পরিচালিত হয়েছে।

গত এক মাসে ইরানের পাল্টা আক্রমণে হুথিদের অনুপস্থিতি আন্তর্জাতিক মহলে বিশেষ নজর কেড়েছিল। তারা কবে এবং কীভাবে এই যুদ্ধে নামবে — সেই অনিশ্চয়তা তেলের বাজারকে বিশেষভাবে অস্থির করে রেখেছিল। শুক্রবারই হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইয়াহিয়া সারি সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন, তাদের “আঙুল ট্রিগারের ওপরেই আছে।” তিনি সতর্ক করে বলেন, ইরানের ওপর আক্রমণ আরও বাড়লে, কোনো মিত্র আমেরিকা ও ইজরায়েলের পাশে দাঁড়ালে, অথবা লোহিত সাগর ব্যবহার করে কোনো মুসলিম দেশের বিরুদ্ধে হামলা চালানো হলে তারা পদক্ষেপ নেবে।

এর আগে গাজা যুদ্ধের সময় হুথিরা লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করতে দীর্ঘ অভিযান পরিচালনা করে। তারা দাবি করেছে, সেই অভিযানে চারটি জাহাজ ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে অন্তত দুটি ছিল পণ্যবাহী জাহাজ এবং এতে অন্তত আটজন নাবিক প্রাণ হারিয়েছেন। আমেরিকা হুথিদের সন্ত্রাসবাদী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করেছে। হুথিরা অবশ্য তাদের এই তথাকথিত “নৌ অবরোধ”কে ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতি সংহতি এবং ইজরায়েলবিরোধী অবস্থানের অংশ বলে দাবি করে আসছে।

এদিকে ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ায় পরিস্থিতি আরও গুরুতর হয়ে উঠেছে। বিশ্বের প্রায় ১৫ শতাংশ তেল এবং ২০ শতাংশ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ইরানের হামলা ও হুমকির কারণে এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।

গত বছরের মার্চ মাসে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুথিদের বিরুদ্ধে কয়েক সপ্তাহ ধরে সামরিক অভিযান পরিচালনা করেন, কারণ তারা লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল এবং মার্কিন সেনাদের লক্ষ্য করে একের পর এক হামলা চালাচ্ছিল। সেই অভিযানে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ও যুদ্ধবিমান ইয়েমেন জুড়ে হামলা চালায়, যার উদ্দেশ্য ছিল হুথিদের সামরিক শক্তি দুর্বল করা এবং একই সঙ্গে ইরানকে সতর্কবার্তা দেওয়া। প্রায় দু’মাস পর ওমানের মধ্যস্থতায় একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয় এবং ট্রাম্প দাবি করেন, হুথিরা “আত্মসমর্পণ” করেছে ও জাহাজে হামলা বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

বৃহস্পতিবার ট্রাম্প জানান, তেহরানের সঙ্গে আলোচনায় কিছুটা অগ্রগতি হওয়ায় ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হামলা ১০ দিনের জন্য স্থগিত রাখা হবে। যুদ্ধ শেষ করার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র একটি ১৫ দফা প্রস্তাবও পেশ করেছে। তবে একই সঙ্গে পেন্টাগন আরও স্থলসেনা মোতায়েন শুরু করেছে, যা সংঘাত আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

মার্কিন সামরিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রায় ৪,৫০০ মেরিন ও নাবিক, যারা ট্রিপোলি অ্যাম্ফিবিয়াস রেডি গ্রুপের অংশ, ইতিমধ্যেই এই অঞ্চলে পৌঁছাতে শুরু করেছে। এই বাহিনীতে ৩১তম মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট রয়েছে, যেখানে প্রায় ২,২০০ সেনা আছে এবং তারা সমুদ্রপথ ও আকাশপথ উভয় দিক থেকে আক্রমণ পরিচালনায় প্রশিক্ষিত। এর পাশাপাশি মঙ্গলবার পেন্টাগন ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের আরও কয়েক হাজার সেনা মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানোর অনুমোদন দিয়েছে।

এই যুদ্ধে গত এক মাসে ১৩ জন মার্কিন সেনা প্রাণ হারিয়েছেন এবং অন্তত ৩০৩ জন আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে প্রায় এক ডজনের অবস্থা এখনও গুরুতর। সর্বশেষ ঘটনায়, শুক্রবার সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে ইরানের হামলায় অন্তত ১০ জন মার্কিন সেনা আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে দু’জনের অবস্থা গুরুতর।

এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই শনিবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ জানান, তিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা চলছে। সৌদি আরব, তুরস্ক ও মিশরের প্রতিনিধিরা রবিবার ইসলামাবাদে বৈঠকের জন্য পৌঁছানোর কথা রয়েছে।

এদিকে লেবাননে ইজরায়েল সমান্তরাল সামরিক অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে, যেখানে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ গোষ্ঠীকে নির্মূল করার চেষ্টা চলছে। এই সংঘাতে এক হাজারের বেশি মানুষ মারা গেছেন, প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ মানুষ ঘরছাড়া হয়েছেন এবং অসংখ্য বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে।

শনিবার ইজরায়েলি সেনাবাহিনী হিজবুল্লাহ-ঘনিষ্ঠ তিনজন সাংবাদিককে হত্যা করে, যাকে তারা লক্ষ্যভিত্তিক হামলা বলে দাবি করেছে। নিহতরা হলেন ফাতিমা ফাতৌনি, মোহাম্মদ ফাতৌনি এবং আলি শুয়াইব। লেবাননের তথ্যমন্ত্রী পল মরকোস এই ঘটনাকে “সাংবাদিকদের ওপর বারবার এবং ইচ্ছাকৃত আক্রমণ” বলে তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন।

ইজরায়েলি সেনাবাহিনী বিশেষভাবে আলি শুয়াইবকে লক্ষ্য করে দাবি করেছে, তিনি সাংবাদিকতার আড়ালে হিজবুল্লাহর একটি বিশেষ অভিযানে যুক্ত ছিলেন — ইজরায়েলি সেনাদের অবস্থান ফাঁস করা এবং হিজবুল্লাহর প্রচার ছড়ানোর কাজে সক্রিয় ছিলেন বলে তাদের দাবি। তবে লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন নিহতদের “নিজেদের পেশাগত দায়িত্ব পালনরত বেসামরিক মানুষ” হিসেবে উল্লেখ করেছেন। হামলার পর আল-আরাবি টিভিতে সম্প্রচারিত ভিডিওতে দেখা যায়, ধ্বংসস্তূপের মধ্যে ছড়িয়ে রয়েছে তাদের ক্যামেরা, মাইক্রোফোন ও ট্রাইপড। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী, যুদ্ধের সময় সাংবাদিকদের সুরক্ষা দেওয়া বাধ্যতামূলক।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles