Table of Contents
বাংলাস্ফিয়ার: ভারতের অর্থনীতির জন্য এক অস্বস্তিকর সতর্কবার্তা বয়ে এনেছে এই মাস। আন্তর্জাতিক পুঁজির দৃষ্টি হঠাৎ করেই অন্যদিকে ঘুরে গেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা (এফআইআই) ভারতীয় শেয়ারবাজার থেকে এক মাসেই তুলে নিয়েছেন প্রায় ১.১৪ লক্ষ কোটি টাকা। এটি ইতিহাসে এক মাসে সর্বোচ্চ পুঁজি প্রত্যাহারের রেকর্ড। এর আগে অক্টোবর ২০২৪-এ সর্বোচ্চ বহির্গমন ছিল ৯৪,০১৭ কোটি টাকা, যা এবার ছাড়িয়ে গেছে।
সংখ্যাটা নিছক পরিসংখ্যান নয়। বিশ্লেষকদের মতে, এর মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে আস্থার সরে যাওয়া এবং আশঙ্কার জমাট বাঁধার স্পষ্ট ইঙ্গিত।
একাধিক কারণে বিনিয়োগকারীদের পিছু হটা
পশ্চিম এশিয়ার ক্রমবর্ধমান সংঘাত পরিস্থিতি বিশ্ববাজারে এক অদৃশ্য চাপ তৈরি করেছে। যুদ্ধের পরিস্থিতি যত তীব্র হচ্ছে, ততই অস্থির হয়ে উঠছে আন্তর্জাতিক তেলের বাজার। ভারতের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জন্য এই তেলের মূল্যবৃদ্ধি গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পরিস্থিতি আরও সংকটজনক করে তুলেছে রুপির ক্রমাগত দুর্বলতা। ডলারের বিপরীতে ভারতীয় মুদ্রা ইতিমধ্যেই ঐতিহাসিক নিম্নস্তরে পৌঁছেছে — প্রায় ₹৯৪.৫৬। এর ফলে আমদানি খরচ বাড়ছে, মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কা ঘনীভূত হচ্ছে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক ভারসাম্য চাপের মুখে পড়ছে।
বৈশ্বিক বাজারেও এই সময়ে অনিশ্চয়তার ছায়া ঘন হয়েছে। বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি এড়াতে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে উদীয়মান অর্থনীতিগুলো থেকে পুঁজি সরিয়ে নিচ্ছেন। ভারত, যা এতদিন উচ্চ প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনায় আন্তর্জাতিক পুঁজিকে আকৃষ্ট করে আসছিল, এখন সেই পুঁজিরই এক বড় অংশ হারাচ্ছে।
দ্বৈত চ্যালেঞ্জের মুখে নীতিনির্ধারকরা
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই পরিস্থিতি শুধু শেয়ারবাজারের ওঠানামার গল্প নয়। বিদেশি পুঁজির ধারাবাহিক প্রবাহ ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম ভিত্তি। সেই ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে পড়লে তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়বে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, এমনকি সরকারের রাজস্বের ওপরেও।
ফলে নীতিনির্ধারকদের সামনে এখন দ্বৈত চ্যালেঞ্জ — একদিকে রুপির পতন সামলানো, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনর্গঠন করা।
সালালাহ বন্দরে ড্রোন হামলা, মার্স্কের কার্যক্রম সাময়িক স্থগিত
এই আর্থিক অনিশ্চয়তার আবহেই উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক ঘটনাবলি। ওমানের সালালাহ বন্দরে হঠাৎ এক ড্রোন হামলায় এক শ্রমিক আহত হয়েছেন। বিশ্বখ্যাত শিপিং সংস্থা মার্স্ক সাময়িকভাবে তাদের কার্যক্রম স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে। কে এই হামলার দায় নিয়েছে তা এখনও স্পষ্ট নয়, তবে ঘটনার প্রতিধ্বনি ছড়িয়ে পড়েছে গোটা অঞ্চলজুড়ে।
ওমান সরকার এই আক্রমণকে তীব্র ভাষায় নিন্দা করেছে। ঘটনাটি আরও একবার প্রমাণ করে দিল যে পশ্চিম এশিয়া এখন এক অস্থির অগ্নিগর্ভ অঞ্চল, যেখানে যেকোনো মুহূর্তে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করতে পারে।
বৈশ্বিক পারস্পরনির্ভরতার কঠিন বাস্তবতা
ভারত থেকে পুঁজি প্রত্যাহার এবং মধ্যপ্রাচ্যে ড্রোন হামলা — এই দুটি আলাদা ঘটনাপ্রবাহ আসলে একই বৃহত্তর বাস্তবতার অংশ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বিশ্ব অর্থনীতি আজ গভীরভাবে পরস্পরনির্ভর। এক অঞ্চলের অস্থিরতা অন্য অঞ্চলের অর্থনীতিকে কাঁপিয়ে দিতে সক্ষম।
ভারতের সামনে তাই এখন কেবল অভ্যন্তরীণ নীতি প্রণয়নের প্রশ্ন নয়, বরং বৈশ্বিক ঝড় সামলে নিজেকে স্থিতিশীল রাখারও কঠিন পরীক্ষা।