বাংলাস্ফিয়ার: শনিবার আমেরিকার নানা প্রান্তে এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের সাক্ষী হল দেশ। শহরের রাস্তা, চত্বর, সেতু, রাজ্য ক্যাপিটল, সর্বত্র নামল মানুষের ঢল। মিনিয়াপোলিস–সেন্ট পল, যাকে একসঙ্গে ‘টুইন সিটিজ’ বলা হয়, সেখানে স্টেট ক্যাপিটলের সামনে জড়ো হলেন হাজার হাজার মানুষ। তাঁদের অনেকেই স্মরণ করছিলেন সম্প্রতি নিহত দুই আন্দোলনকারীকে — রেনি গুড এবং অ্যালেক্স প্রেট্টিকে। ওরেগনের পোর্টল্যান্ডে মোড়ে মোড়ে ভিড় জমিয়ে বিক্ষোভকারীরা জানালেন, “এটা এখন আর শুধু সমস্যা নয়, এটা একটা জাতীয় সঙ্কট, যা একেবারে অন্য স্তরে পৌঁছে গেছে।” আরকানসাসের লিটল রকে দুই হাজারেরও বেশি মানুষ নদী পেরিয়ে মিছিল করলেন। এক প্রতিবাদকারীর হাতে উঠল ব্যঙ্গাত্মক প্ল্যাকার্ড — “MAGA মানে এখন ‘Morons Are Governing America’।”
এই সব দৃশ্য আসলে বৃহত্তর এক আন্দোলনের অংশ। “No Kings” নামে দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এই ঢিলেঢালাভাবে সংগঠিত প্রতিবাদ কর্মসূচির শনিবার ছিল তৃতীয় বড় পর্ব। হাজার হাজার সমাবেশে লক্ষ লক্ষ মানুষ রাস্তায় নামলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর দ্বিতীয় দফার নীতির বিরুদ্ধে। বৃহৎ মাত্রায় অভিবাসী বহিষ্কার, ভোটাধিকার সংকোচন, বৈচিত্র্যের উপর আঘাত — এই দাবিগুলির পাশাপাশি সাম্প্রতিক দুটি বিষয় বিশেষভাবে সামনে উঠে আসে: ইরান যুদ্ধ এবং সেই যুদ্ধের ফলে ঊর্ধ্বমুখী জ্বালানির দাম।
মিনিয়াপোলিসের বাসিন্দা জন মোয়েস স্থানীয় কিংবদন্তি গায়ক প্রিন্সের আদলে তৈরি ১৫ ফুট উঁচু পুতুলসদৃশ পোশাক পরে এসেছিলেন। রাজনৈতিকভাবে নিজেকে স্বাধীনচেতা বললেও ডেমোক্র্যাটদের প্রতি সহানুভূতিশীল এই বাসিন্দা জানালেন, ক্রমবর্ধমান দ্রব্যমূল্য এবং দৈনন্দিন জীবনের চাপই তাঁকে রাস্তায় নামতে বাধ্য করেছে। প্রতিবাদে যোগ দেওয়াটাকে তিনি দেখছেন ক্ষোভ প্রকাশের একমাত্র উপায় হিসেবে।
আয়োজকদের দাবি, এই বিক্ষোভে প্রায় ৮০ লক্ষ মানুষ অংশ নিয়েছেন, যদিও এই সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ে আলাস্কার কোটজেবিউ থেকে পুয়ের্তো রিকো পর্যন্ত অর্থাৎ উত্তর মেরুর কাছ থেকে উষ্ণমণ্ডল পর্যন্ত। দেশের বাইরেও ৩৯টি জায়গায় “No Kings” কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
টুইন সিটিজ এই দিনের প্রতিবাদের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। গত কয়েক মাসে সেখানে অভিবাসনবিরোধী অভিযানের সময় দুই আন্দোলনকারীর মৃত্যু গভীর ক্ষোভ তৈরি করেছে। শীতের হাওয়ার মধ্যেও শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে হাতে আমেরিকা ও মিনেসোটার পতাকা নিয়ে মানুষ মিছিল করে স্টেট ক্যাপিটলের দিকে এগিয়ে যান। জননিরাপত্তা দপ্তরের হিসাবে সেখানে প্রায় এক লক্ষ মানুষ উপস্থিত ছিলেন, যদিও আয়োজকদের দাবি ছিল সংখ্যাটি দুই লক্ষ।
এই সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন ভিয়েতনাম যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনের কিংবদন্তি জেন ফন্ডা। মঞ্চে উঠে গান পরিবেশন করেন গায়ক ব্রুস স্প্রিংস্টিনও। “Streets of Minneapolis” শিরোনামে তাঁর লেখা গানে শহরের প্রতিবাদী চেতনার প্রতি শ্রদ্ধা জানান তিনি। গানের কথায় উঠে আসে — “এই শহরেই তারা হত্যা করেছে, এই শীতের ২০২৬-এ… আমরা নামগুলো মনে রাখব, যারা মারা গেছে মিনিয়াপোলিসের রাস্তায়।
শুধু মিনেসোটা নয়, বোস্টন, শিকাগো, লস অ্যাঞ্জেলেস, সান ফ্রান্সিসকো ও নিউ ইয়র্কেও বিপুল জমায়েত হয়। নিউ ইয়র্কের টাইমস স্কোয়ারে মিছিলের দৈর্ঘ্য ছাড়িয়ে যায় এক মাইল। ওয়াশিংটন ডিসিতে বিক্ষোভকারীরা ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন নীতির মূল স্থপতি স্টিফেন মিলারের বাড়ির কাছে গিয়ে তাঁর অপসারণের দাবি তোলেন।
আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এই প্রতিবাদগুলিকে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। অংশগ্রহণকারীদের বড় অংশ ডেমোক্র্যাট সমর্থক হলেও রিপাবলিকান অধ্যুষিত বা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাজ্যগুলিতেও আগের তুলনায় বেশি কর্মসূচি হয়েছে বলে লক্ষ্য করা গেছে।
হোয়াইট হাউস অবশ্য এই আন্দোলনকে বিদ্রূপ করেছে। প্রেস সেক্রেটারি অ্যাবিগেইল জ্যাকসন মন্তব্য করেছেন, “এই তথাকথিত ‘ট্রাম্প ডিরেঞ্জমেন্ট থেরাপি সেশন’-এ শুধু সাংবাদিকরাই আগ্রহী, যাঁদের কাজই এগুলো কভার করা।”
ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ নিয়ে ব্যাপক জনঅসন্তোষ, অভিবাসন নীতিতে ক্ষোভ, শেয়ারবাজারের টালমাটাল অবস্থা এবং পেট্রোলসহ নিত্যপণ্যের লাগামছাড়া দাম — এই সবকিছু মিলিয়েই রাস্তায় নেমেছেন সাধারণ মানুষ। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আরেকটি সঙ্কট: কংগ্রেসে অভিবাসন দপ্তরের বাজেট নিয়ে টানাপোড়েনের ফলে দেখা দিয়েছে আংশিক সরকারি অচলাবস্থা, যার সরাসরি ভোগান্তি পোহাচ্ছেন বিমানযাত্রীরা, বিমানবন্দরগুলিতে তৈরি হচ্ছে অস্বাভাবিক দীর্ঘ লাইন।
সাম্প্রতিক এক জনমত সমীক্ষায় উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য — ট্রাম্পের অনুমোদন রেটিং দ্বিতীয় দফায় সর্বনিম্ন ৩৬ শতাংশে নেমে এসেছে। ইরানে আমেরিকার সামরিক অভিযানের প্রশ্নে জনসমর্থন আরও কম, মাত্র ৩৫ শতাংশ।
ব্রুকলিনের মিছিলে অংশ নেন ভ্যালেরি তিরাদো, যাঁর ছেলে পশ্চিম এশিয়ায় মোতায়েন হতে চলেছেন। “আমার ছেলেকে ফিরিয়ে দাও” লেখা পোস্টার হাতে তিনি অভিযোগ করেন, “ট্রাম্প সৈন্যদেরকে গুটি হিসেবে ব্যবহার করছেন, নিজের শক্তি দেখানোর জন্য।”
তবে সবাই এই আন্দোলনের সঙ্গে একমত নন। মিসিসিপির অক্সফোর্ডে এক আইনের ছাত্র প্রশ্ন তোলেন, ট্রাম্পকে ‘রাজা’ বলা হচ্ছে কেন। তাঁর বক্তব্য, “তিনি তো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট, অন্যদের মতোই আইন মেনেই কাজ করছেন।”
“No Kings” আন্দোলন কোনও একক ইস্যুকে কেন্দ্র করে নয় — বরং এক ছাতার নিচে নানা ক্ষোভকে একত্রিত করার প্রয়াস। ইতিহাস বলে, যেসব আন্দোলন স্পষ্ট লক্ষ্য নিয়ে এগিয়েছে, যেমন নারীদের ভোটাধিকার বা নাগরিক অধিকার আন্দোলন — সেগুলিই বড় পরিবর্তন আনতে পেরেছে।
তবু, প্রবীণ আন্দোলনকারীদের কাছে এই প্রতিবাদ নতুন কিছু নয়। ১৯৬০-এর দশকে সেলমায় নাগরিক অধিকার আন্দোলনে অংশ নেওয়া ৮১ বছর বয়সী আইনজীবী জোসেফ হেডেন জুনিয়র বললেন, “তখন যেমন এই আন্দোলনগুলো গুরুত্বপূর্ণ ছিল, আজও তেমনই গুরুত্বপূর্ণ।”