বাংলাস্ফিয়ার: সাম্প্রতিক একাধিক বক্তৃতা ও সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে “শান্তির দূত” হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। তাঁর বক্তব্যে বারবার উঠে আসছে এই দাবি যে, তিনি কোনো যুদ্ধ শুরু করেননি, বরং সংঘাত এড়িয়ে চলেছেন এবং শক্ত অবস্থান নিয়েই প্রতিপক্ষকে আলোচনার টেবিলে আনতে সক্ষম হয়েছেন। বিশেষ করে পশ্চিম এশিয়ায় উত্তেজনা, ইরানকে ঘিরে সামরিক চাপ এবং ইউক্রেন যুদ্ধ প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, তিনি “শক্তির মাধ্যমে শান্তি” প্রতিষ্ঠায় বিশ্বাসী — অর্থাৎ সামরিক প্রস্তুতি ও কড়া অবস্থানই যুদ্ধ ঠেকানোর কার্যকর উপায়। তাঁর দাবি, তিনি ক্ষমতায় থাকলে অনেক সংঘাতই ঘটত না এবং বিশ্ব অনেক বেশি স্থিতিশীল থাকত। এই আত্মপ্রতিকৃতিতে ট্রাম্প নিজেকে এক ধরনের আধুনিক “শান্তির স্থপতি” হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চান, যিনি যুদ্ধের আগুন জ্বালান না, বরং ভয় দেখিয়ে আগুন নেভান।
কিন্তু এই দাবির ভিত কতটা মজবুত, তা একটু খুঁটিয়ে দেখলেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের নাটক। যে মানুষটি নিজেই আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে প্রায়শই ব্যক্তিগত অহমিকা, টুইট-ঝড় আর আকস্মিক নীতিপরিবর্তনের মঞ্চে পরিণত করেছেন, তিনিই আবার শান্তির দূত! যেন কেউ আগুন নিয়ে খেলা করে, তারপর দাবি করে—দেখো, আমি তো আগুন নেভানোর বিশেষজ্ঞ। ইরানের সঙ্গে টানাপোড়েন, আকস্মিক সামরিক হুমকি, আবার হঠাৎ করেই পিছু হটা—এই ওঠানামার রাজনীতিকে যদি শান্তির কৌশল বলা হয়, তাহলে অনিশ্চয়তাকেই বোধহয় নতুন করে “স্থিতিশীলতা” বলতে হবে। তাঁর তথাকথিত “শক্তির মাধ্যমে শান্তি” আসলে অনেক সময়েই দাঁড়ায় “ভয় দেখিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা” যেখানে শান্তি কোনো নৈতিক বা কূটনৈতিক সাফল্য নয়, বরং একপ্রকার স্থগিত সংঘাত, যা যেকোনো মুহূর্তে বিস্ফোরিত হতে পারে।
আরও মজার ব্যাপার, ট্রাম্পের এই আত্মপ্রশংসার ভঙ্গিতে ইতিহাস যেন একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। তাঁর আমলেই আন্তর্জাতিক চুক্তি ভাঙা, মিত্রদের সঙ্গে টানাপোড়েন, এবং প্রতিপক্ষদের সঙ্গে তীব্র উত্তেজনা—এসব যেন হঠাৎ করেই স্মৃতি থেকে মুছে যায়। যেন তিনি নিজেই নিজের ইতিহাসের সম্পাদক, যেখানে অস্বস্তিকর অধ্যায়গুলো নিঃশব্দে বাদ পড়ে যায়, আর থেকে যায় শুধু এক ঝকঝকে, আত্মতুষ্ট প্রতিকৃতি। শান্তির দূত হওয়ার এই আকাঙ্ক্ষা তাই অনেকটা সেই নাটকের মতো, যেখানে অভিনেতা নিজেই নিজের চরিত্র লিখে, নিজেই সংলাপ বলেন, আর শেষে নিজেই করতালি দেন।
ফলে প্রশ্নটা থেকে যায়— তিনি কি সত্যিই শান্তির দূত, নাকি শান্তির ভাষা ধার করে ক্ষমতার এক নতুন অলংকার তৈরি করতে চাইছেন? কারণ প্রকৃত শান্তির দূতেরা সাধারণত যুদ্ধের সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে নয়, কমিয়ে নিজেদের প্রমাণ করেন; তারা অনিশ্চয়তার নাটক মঞ্চস্থ করেন না, বরং স্থিতিশীলতার ভিত গড়ে তোলেন। সেই মানদণ্ডে দাঁড়িয়ে ট্রাম্পের দাবি যতটা উচ্চকিত, তার ভিত্তি ততটাই নড়বড়ে—একটি রাজনৈতিক আত্মপ্রতিকৃতি, যা বাস্তবের আয়নায় খুব কাছ থেকে দেখলেই ফাটল ধরা পড়ে।