Home খবর ট্রাম্পের হিসেব উল্টে গেল: ‘সহজ জয়ের’ স্বপ্ন এখন দীর্ঘ সংঘাতের দুঃস্বপ্ন

ট্রাম্পের হিসেব উল্টে গেল: ‘সহজ জয়ের’ স্বপ্ন এখন দীর্ঘ সংঘাতের দুঃস্বপ্ন

0 comments 4 views
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার: ডোনাল্ড ট্রাম্প বরাবরই তাঁর পূর্বসূরিদের প্রতি গভীর অবজ্ঞা প্রকাশ করে এসেছেন। সেই অবজ্ঞার মাশুল এখন গুনতে হচ্ছে তাঁকে এবং হয়তো গোটা মধ্যপ্রাচ্যকে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে মিলে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করার আগে, ইরান বিষয়ে অতীতের সতর্কবার্তাগুলো তিনি ইচ্ছাকৃতভাবেই উপেক্ষা করেছিলেন বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। সেই উপেক্ষা ছিল একটি গুরুতর ভুল এবং এখন তা সংশোধন করার সময় অনেকটাই পেরিয়ে গেছে।

ট্রাম্প মনে করেছিলেন, ইরানের শাসনব্যবস্থা মূলত ভেনেজুয়েলার নিকোলাস মাদুরোর সরকারের এক পূর্বাঞ্চলীয় সংস্করণ মাত্র। তাই একই কৌশল অর্থাৎ বিপুল সামরিক শক্তি প্রয়োগ ও সরাসরি হস্তক্ষেপ এখানেও দ্রুত ফল দেবে। হয় শাসনব্যবস্থা আত্মসমর্পণ করবে, নয়তো উৎখাত হবে। লক্ষ্য ছিল একটাই: ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক কর্মসূচির অবসান এবং তেহরানপন্থী মিলিশিয়াদের পরাজয়। ট্রাম্পের কাছে জয় তখন প্রায় নিশ্চিত বলেই মনে হয়েছিল।

কিন্তু যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি মার্কিন প্রেসিডেন্টকে বিস্মিত করেছে। বোমাবর্ষণের মাঝেই তিনি হঠাৎ আলোচনার পথে ফিরতে চেয়েছেন। কিন্তু ইরানের কাছে এই ‘আলোচনার প্রস্তাব’ নতুন কিছু নয় — অতীতে দু’বারই এই একই পথে এসেছিল ভয়াবহ বিমান হামলা এবং শীর্ষ নেতৃত্ব হত্যা। ফলে তেহরান এবার সেই প্রস্তাবকে কতটা বিশ্বাস করবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।

অন্যদিকে, এই যুদ্ধের ন্যায্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। যুদ্ধ শুরুর প্রায় এক মাস পরেও মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ইরানের পক্ষ থেকে কোনো তাৎক্ষণিক হুমকির প্রমাণ দেখাতে পারেনি। এই পরিস্থিতিতে উত্তেজনা কমার বদলে দিন দিন বাড়ছে।

এখানে এক ধরনের বৃত্তাকার যুক্তি কাজ করছে: প্রথমে আক্রমণ, তারপর প্রতিপক্ষের পাল্টা আঘাত, আর সেই পাল্টা আঘাতকেই আবার মূল আগ্রাসনের যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করে আরও শক্তি প্রয়োগের দাবি। এই যুক্তির ধারাবাহিকতায়, স্থলবাহিনী মোতায়েন — যা এতদিন ওয়াশিংটনের কাছে একপ্রকার ‘রেড লাইন’ ছিল — এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। জানা গেছে সেই সেনারা ইতিমধ্যেই প্রস্তুত।

শান্তি বা সমঝোতার দিকে পরিস্থিতি এগোচ্ছে — এমন কোনো লক্ষণ নেই। বরং রিপাবলিকান কট্টরপন্থী সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম, যিনি দাবি করেন যে তিনি প্রেসিডেন্টের ঘনিষ্ঠ, প্রকাশ্যে বলেছেন — ইরানের খার্গ তেল টার্মিনাল দখল করা অপরিহার্য। তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইও জিমার যুদ্ধের উদাহরণ টেনে আনেন, যেখানে ১৯৪৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত জাপানি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ছয় হাজারেরও বেশি মার্কিন সৈন্য নিহত হয়েছিলেন। হরমুজ প্রণালীতে সংঘাতের বিস্তার এবং ইরানের ‘অরাজকতা কৌশল’ শাসন পরিবর্তনের পক্ষে থাকা শক্তিগুলোকে আরও উজ্জীবিত করেছে। যদিও ২৮ ফেব্রুয়ারির পর বাস্তব পরিস্থিতি তাদের প্রাথমিক আশাকে ভেঙে দিয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে বারাক ওবামার ২০১৫ সালের কূটনৈতিক পথ বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত আজ নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। যদি ট্রাম্প তাঁর প্রতি ব্যক্তিগত বিদ্বেষ কাটিয়ে উঠতে পারতেন, তাহলে হয়তো ২০১৫ সালের ৫ আগস্ট আমেরিকান ইউনিভার্সিটিতে দেওয়া ওবামার সেই ভাষণটি আবার পড়া তাঁর জন্য উপকারী হতো। ওই ভাষণে ওবামা বলেছিলেন, কংগ্রেস যদি ইরানের সঙ্গে হওয়া পারমাণবিক চুক্তি প্রত্যাখ্যান করে, তাহলে আমেরিকার সামনে একটাই পথ খোলা থাকবে — আরেকটি মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ। তাঁর ভাষায়, পছন্দটা শেষ পর্যন্ত কূটনীতি আর যুদ্ধের মধ্যেই, হয়তো আজ নয়, হয়তো তিন মাস পরে নয়, কিন্তু খুব শিগগিরই।

ওবামা তখনই সতর্ক করেছিলেন যে ইরানের বিরুদ্ধে ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ সহজ ও দ্রুত সমাধান আনবে — এই ধারণা ভ্রান্ত। গত এক দশকের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে, কোনো যুদ্ধই সহজ নয়। তাঁর মতে, সর্বোচ্চ যা হতে পারে তা হলো ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি কয়েক বছরের জন্য পিছিয়ে দেওয়া। কিন্তু তার ফলে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার পরিদর্শকরা ইরান থেকে বহিষ্কৃত হবেন এবং পারমাণবিক বিস্তার রোধে যে বিরল আন্তর্জাতিক ঐক্য গড়ে উঠেছিল, তা ভেঙে পড়বে।

২০১৬ সালে নির্বাচিত হয়ে ট্রাম্প সেই চুক্তি থেকে ২০১৮ সালের ৮ মে বেরিয়ে আসেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, আরও কঠোর শর্ত আরোপ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে নিয়ন্ত্রণ করবেন। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রচেষ্টা যেমন ব্যর্থ হয়েছে, তেমনই ব্যর্থ হয়েছে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সমান্তরাল আলোচনাও।

শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প বুঝতে পেরেছেন — খুব দেরিতে — যে সামরিক পথ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ইরানের শাসনব্যবস্থা, জানুয়ারিতে জনবিক্ষোভ দমন করার পরেও, যথেষ্ট স্থিতিশীল রয়েছে। আর এই সংঘাতের অভিঘাত পৌঁছাতে পারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও — বিশেষ করে সেই সব রাজ্যে, যেখানে নভেম্বর মাসে মধ্যবর্তী নির্বাচন হওয়ার কথা এবং যেখানে জ্বালানির দাম একটি বড় রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠতে পারে।

অথচ তাঁর প্রশাসনে ইরান বিষয়ে অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞের অভাব ছিল না। ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলে ইরান বিষয়ক প্রাক্তন পরিচালক নেট সোয়ানসন, যিনি ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ‘ফরেন অ্যাফেয়ার্স’ পত্রিকায় ইরানের ‘অরাজকতা কৌশল’ নিয়ে দূরদর্শী বিশ্লেষণ করেছিলেন, তাঁকেই বরখাস্ত করা হয়। কারণ, ষড়যন্ত্রতত্ত্ব প্রচারকারী লরা লুমারের এক কুৎসা অভিযানে ট্রাম্প আস্থা রেখেছিলেন। পক্ষপাতিত্ব ও ব্যক্তিনির্ভর সিদ্ধান্ত — এই প্রশাসনের বড় দুর্বলতা হিসেবেই এখন সামনে আসছে।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles