বাংলাস্ফিয়ার: যখন কোনও ক্লাবের ইতিহাসে একটি যুগ শেষ হয়, তা কেবল পরিসংখ্যান বা ট্রফির মাধ্যমে মাপা যায় না; কিছু বিদায় হৃদয়ে গভীর ক্ষত তৈরি করে। লিভারপুল এফসির মহাতারকা মোহাম্মদ সালাহর বিদায় ঘোষণা সেইরকমই এক মুহূর্ত, যা শুধু একজন ফুটবলারের প্রস্থান নয়, বরং এক আবেগঘন অধ্যায়ের অবসান। লিভারপুল এফসির লাল জার্সিতে দীর্ঘ নয় বছর কাটিয়ে ২০২৫-২৬ মরশুমের শেষে তিনি বিদায় নেবেন—এই খবর যেন হঠাৎ করেই এক নীরব শূন্যতা তৈরি করেছে অ্যানফিল্ডের বাতাসে।
২০১৭ সালে যখন এই মিশরীয় ফরোয়ার্ড লিভারপুলে পা রাখেন, তখন খুব কম মানুষই ভেবেছিলেন যে তিনি ক্লাবের ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেবেন। কিন্তু একের পর এক গোল, অবিশ্বাস্য ধারাবাহিকতা আর ক্লান্তিহীন পারফরম্যান্সে তিনি দ্রুতই হয়ে ওঠেন দলের মূল চালিকাশক্তি। ২৫০-রও বেশি গোল, দীর্ঘ প্রতীক্ষিত প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা এবং উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়—লিভারপুলের প্রতিটি সাফল্যের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন এই মিশরীয় জাদুকর।
বিদায়বেলায় আবেগাক্রান্ত সালাহ এক সংক্ষিপ্ত বার্তায় জানান, “আমি জানতাম এই দিনটি একদিন আসবে, কিন্তু যখন সত্যিই সময়টা সামনে আসে, তখন তা মেনে নেওয়া অত্যন্ত কঠিন।” তাঁর এই ছোট্ট উক্তিতেই ফুটে উঠেছে ক্লাবের প্রতি তাঁর গভীর মমতা এবং বিচ্ছেদের যন্ত্রণা। অ্যানফিল্ডের ভক্তরা জানেন, তাঁরা কেবল একজন স্ট্রাইকারকে হারাচ্ছেন না, হারাচ্ছেন এমন একজনকে, যিনি তাঁদের গৌরব, তাঁদের স্বপ্ন ও তাঁদের পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছিলেন।
এই বিদায় শুধুই ব্যক্তিগত নয়, এটি এক বৃহত্তর পরিবর্তনের সংকেতও। লিভারপুল এখন দাঁড়িয়ে এক সন্ধিক্ষণে—একটি যুগের অবসান আর নতুন যুগের সূচনার অপেক্ষা। সালাহর মতো একজন কিংবদন্তির শূন্যতা পূরণ করা শুধু কঠিন নয়, প্রায় অসম্ভব বললেও ভুল হবে না। ক্লাবের ম্যানেজমেন্ট এখন খুঁজবে নতুন মুখ, নতুন নায়ক কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, কেউ কি সত্যিই সালাহর জায়গা নিতে পারবে?
ইউরোপের বড় বড় ক্লাব ইতিমধ্যেই তাকিয়ে আছে তাঁর দিকে। তাঁর পরবর্তী গন্তব্য কোথায় হবে, তা নিয়ে জল্পনা তুঙ্গে। কিন্তু এই মুহূর্তে সেই প্রশ্ন ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, যতটা গুরুত্বপূর্ণ তাঁর বিদায়ের তাৎপর্য। কারণ সালাহর মতো খেলোয়াড়রা কেবল দল পরিবর্তন করেন না, তাঁরা ইতিহাসের পাতায় নিজেদের নাম খোদাই করে দিয়ে যান।
ভারতের ফুটবলপ্রেমীদের কাছেও সালাহ কেবল একজন বিদেশি খেলোয়াড় নন, বরং এক বিশাল অনুপ্রেরণা। একজন আফ্রিকান ফুটবলার হিসেবে বিশ্ব ফুটবলের শিখরে আরোহণ করে তিনি দেখিয়েছেন যে পরিশ্রম ও প্রতিভা থাকলে যেকোনো বাধা অতিক্রম করা সম্ভব। তাই তাঁর এই প্রস্থান ভারতীয় সমর্থকদের কাছেও এক ব্যক্তিগত ক্ষতির মতো।
ফুটবলের নিয়মে খেলা চলবে, লিভারপুলও এগিয়ে যাবে নতুনের সন্ধানে। হয়তো আগামীতে নতুন কোনো নায়ক জন্ম নেবে, লেখা হবে নতুন কোনো মহাকাব্য। কিন্তু অ্যানফিল্ডের গ্যালারিতে যখনই ১১ নম্বর লাল জার্সিটি দেখা যাবে, গ্যালারি গর্জে উঠবে সেই চিরচেনা সুরে— “মো সালাহ! মো সালাহ!”। কিছু অধ্যায় শেষ হয়েও ইতিহাসের পাতায় চিরকাল অমলিন থেকে যায়।