সুমন চট্টোপাধ্যায়: একসময় বাংলায় কবিতা মানে ছিল অস্বস্তি। কবিতা মানে ছিল প্রশ্ন। কবিতা মানে ছিল সেই অদ্ভুত সাহস, যা সরাসরি রাজনীতির ভাষায় বলা যায় না, কিন্তু শব্দ, ছন্দ, মাত্রার ভিতর দিয়ে এমনভাবে উচ্চারিত হয় যে ক্ষমতা অস্বস্তিতে পড়ে। কবি তখন শুধু শব্দের কারিগর নন, তিনি এক ধরনের নৈতিক সাক্ষী। তিনি দেখেন, মনে রাখেন, এবং এমনভাবে বলেন, যা ইতিহাসের কাছে দায়বদ্ধ।
আজ সেই জায়গাটাতেই এসে আমরা দাঁড়িয়ে আছি এক গভীর, প্রায় অস্বীকার করা যায় না এমন একটি পরিবর্তনের সামনে, কবিতা আর ক্ষমতার বিরুদ্ধে নয়, অনেক সময় তা ক্ষমতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে কথা বলে।
এখানে সবচেয়ে বিপজ্জনক ব্যাপারটা হোল এই পরিবর্তনটি সরাসরি, ঘোষণামূলক নয়। কেউ ঘোষণা করেনি যে “এখন থেকে কবিতা শাসকের পাশে দাঁড়াবে।” বরং পরিবর্তনটি এসেছে ধীরে ধীরে, ভাষা, সুর, উচ্চারণের ভিতর দিয়ে। এমনভাবে যে অনেক সময় তা চোখে পড়ে না, কিন্তু কান খাড়া করলে বোঝা যায়, কোথাও একটা তাল কেটে গিয়েছে।
এই তাল বদলের সবচেয়ে স্পষ্ট চিহ্ন কী? প্রশ্নের অভাব।
একজন কবি যখন ক্ষমতার বিরুদ্ধে দাঁড়ান, তখন তিনি প্রশ্ন করেন। সরাসরি না হোক, ঘুরিয়ে কিন্তু প্রশ্ন করেন। আর যখন তিনি ক্ষমতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলেন তখন সেই প্রশ্নগুলি অদৃশ্য হয়ে যায়। তার জায়গায় আসে ব্যাখ্যা, যুক্তি, কখনও কখনও সাফাই। কবিতা তখন আর অস্বস্তির জায়গা তৈরি করে না, বরং একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ধান্দা-প্রসূত ন্যারেটিভকে আরামদায়ক করে তোলে।
এই রূপান্তরটি বোঝার জন্য আমাদের একটু পিছিয়ে যেতে হবে,কবিতা এবং ক্ষমতার সম্পর্কের দিকে।
ইতিহাসে কবিতা কখনওই সম্পূর্ণ “নিরপেক্ষ” ছিল না। কবিরা সবসময়ই কোনও না কোনও অবস্থান নিয়েছেন, কখনও সরাসরি রাজনৈতিক, কখনও সাংস্কৃতিক, কখনও নৈতিক। কিন্তু একটি শাশ্বত সত্যও ছিল।কবিতা সাধারণত ক্ষমতার সঙ্গে একটি দূরত্ব বজায় রাখত। এই দূরত্বই তাকে স্বাধীনতা দিত, এবং সেই স্বাধীনতাই তাকে বিশ্বাসযোগ্য করত।কবি কখনও তাঁর নিজস্ব রাজনৈতিক বিশ্বাসকে সচেতন ভাবে ছন্নছাড়া স্লোগানে নামিয়ে আনতেননা। যাঁরা ব্যর্থ হতেন তাঁদের ছন্দোবদ্ধ শব্দগুলি আর যাই হোক কবিতার মর্যাদা পেতনা।
আজ সেই দূরত্বটাই ক্রমশ কমে এসেছে। কেন?
এর উত্তর সরল নয়। এটি কোনও একক কারণের ফলও নয়, বরং একাধিক প্রক্রিয়ার সম্মিলিত ফল।
প্রথমত, সাংস্কৃতিক পৃষ্ঠপোষকতার রাজনীতি।
যখন একটি সরকার সক্রিয়ভাবে সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রকে নিজের ছাতার তলায় আনতে শুরু করে, উৎসব আয়োজন করে, পুরস্কার দেয়, মঞ্চ তৈরি করে, শিল্পীদের সামনে আনে, তখন কতকটা অনিবার্যভাবে সেই ক্ষেত্রের সঙ্গে তার একটি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়। এই সম্পর্ক সবসময় নেতিবাচক নয়,অনেক সময় এটি প্রয়োজনীয়ও। কিন্তু সমস্যা তখনই শুরু হয়, যখন এই সম্পর্কটি সমালোচনার জায়গাকে সংকুচিত করতে শুরু করে।
একজন কবি যদি নিয়মিতভাবে সেই মঞ্চে আলো করেন, স্বার্থের বোঁটকা গন্ধমাখা স্বীকৃতির অংশ হন তখন তাঁর। সামনে একটি জরুরি প্রশ্ন ধীরে ধীরে অদৃশ্য হতে শুরু করে। তিনি কি সেই হাতটিকে প্রশ্ন করবেন, যে হাত তাকে তুলে ধরছে?
এটি কোনও সরল “হ্যাঁ” বা “না”-এর প্রশ্ন নয়। বরং এটি একটি ধূসর অঞ্চল—যেখানে ধীরে ধীরে অবস্থান বদলায়।
দ্বিতীয়ত, সামাজিক পুঁজি।
আজকের দিনে একজন কবির পরিচয় শুধু তার লেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়,তিনি একটি পাবলিক ফিগার। তার সোশ্যাল মিডিয়া উপস্থিতি আছে, তার বক্তব্যের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া আছে, তার চারপাশে একটি সমর্থক গোষ্ঠী আছে। এই সমস্ত কিছুর মধ্যে একটি সূক্ষ্ম চাপ কাজ করে, নিজের অবস্থানকে এমনভাবে সাজানো, যাতে তা সেই গোষ্ঠীর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। ফলে কবিতা অনেক সময় হয়ে ওঠে “পরিচয়ের সম্প্রসারণ”—একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বা সামাজিক অবস্থানের প্রতিফলন।
তৃতীয়ত, ন্যারেটিভের শক্তি।
আজকের রাজনীতি কেবল নীতির লড়াই নয় রীতিমতো ন্যারেটিভের লড়াই। কে গল্প বলবে, কীভাবে বলবে, কোন ঘটনাকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবে, আসল লড়াইটাসতা নিয়েই।। এবং এই লড়াইয়ে কবি, লেখক, শিল্পী ইদানীং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
কারণ তারা ভাষা তৈরি করেন। তারা সেই শব্দগুলো তৈরি করেন, যেগুলি সাধারণ মানুষ ব্যবহার করে নিজের অভিজ্ঞতাকে বোঝে।
যখন এই ভাষা একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ন্যারেটিভের সঙ্গে মিলে যায়, তখন কবিতা তার শুচিতা, স্নিগ্ধতা, কিছুটা স্বধর্ম হারিয়ে হয়ে ওঠে সেই সাজানো, পরিকল্পিত, স্বার্থ-মিশ্রিত রাষ্ট্রের আখ্যানের একটি শক্তিশালী বাহন।
এখানেই আসে সবচেয়ে সূক্ষ্ম পরিবর্তনটি।
কবিতা তখন আর সরাসরি “প্রচার” করে না বরং একটি আবহ তৈরি করে। এমন একটি আবহ, যেখানে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক অবস্থানটি স্বাভাবিক, নৈতিক, এবং প্রায় অনিবার্য বলে মনে হয়।এটি সরাসরি স্লোগান নয়; এটি স্লোগানের আগের স্তর—যেখানে মানুষ নিজেই সেই স্লোগানটিকে গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়।
এই জায়গাটাতেই কবিতার শক্তি, এবং একই সঙ্গে তার বিপদ।
কারণ এখানে কবিতা তার সবচেয়ে সূক্ষ্ম কাজটি করছে। মানে চেতনা তৈরি করছে। কিন্তু সেই চেতনা যদি একপাক্ষিক হয়, যদি তা প্রশ্নহীন হয়, তাহলে সেটি আর মুক্তির পথ দেখায় না; বরং একটি নির্দিষ্ট খাঁচার ভিতর পণবন্দী হয়ে যায়।
এখন প্রশ্ন হল,এই অবস্থায় কবির দায় কোথায়?
একজন কবি কি সম্পূর্ণ স্বাধীন? তিনি কি যেকোনও অবস্থান নিতে পারেন?
অবশ্যই পারেন। কিন্তু সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন সেই অবস্থানটি নিজেকে “একমাত্র নৈতিক অবস্থান” হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করে, এবং ভিন্নমতকে অবৈধ বা অনৈতিক বলে চিহ্নিত করে।
কবিতা তখন আর একটি উন্মুক্ত ক্ষেত্র থাকে না; এটি হয়ে একটি নিয়ন্ত্রিত পরিসর।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য বোঝা দরকার।কবিতা যদি কোনও রাজনৈতিক অবস্থান নেয়, সেটি সমস্যা নয়। সমস্যা তখনই, যখন কবিতা প্রশ্ন করা বন্ধ করে দেয়।
কারণ প্রশ্নহীন কবিতা আসলে কবিতা নয়; এটি একটি বিবৃতি।
আর বিবৃতি যতই সুন্দর ভাষায় লেখা হোক, তা শেষ পর্যন্ত একটি অবস্থানকেই শব্দের ঝঙ্কার তুলে পরিবেশিত হয়।
আজ বাংলায় আমরা সেই পুনরাবৃত্তির একটি সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। একই ধরনের যুক্তি, একই ধরনের ভাষা, একই ধরনের আবেগ,বারবার ফিরে আসছে। যেন একটি নির্দিষ্ট স্ক্রিপ্ট আছে, যার ভেতরে থেকেই সব কথা বলা হচ্ছে।
এই স্ক্রিপ্টের বাইরে যাওয়ার সাহসই আজ সবচেয়ে দুর্লভ। আর এই দুর্লভতাই কিঞ্চিৎ চিন্তার বিষয়। কারণ কবিতা যদি স্ক্রিপ্টের মধ্যে বন্দি হয়ে যায়, তাহলে সমাজও ধীরে ধীরে সেই স্ক্রিপ্টের বাইরে চিন্তা করার শক্তি হারাতে পারে।
তখন আর নতুন প্রশ্ন তৈরি হয় না। তখন আর অস্বস্তি তৈরি হয় না। তখন সবকিছুই একটি পূর্বনির্ধারিত কাঠামোর মধ্যে ঘটে।এটি দেখতে শান্ত, স্থিতিশীল, সুসংহত মনে হতে পারে। কিন্তু এই শান্তির ভেতরেই থাকে একটি গভীর স্থবিরতা। কবিতা তখন আর সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যায় না; বরং তাকে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় আটকে রাখে।
এই অবস্থায় সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা কোথায় হয়?
বিশ্বাসে।
একজন পাঠক যখন একটি কবিতা পড়েন, তখন তিনি শুধু শব্দ পড়েন না; তিনি বিশ্বাস করেন যে এই শব্দগুলির পেছনে একটি স্বাধীন চিন্তা আছে, একটি ব্যক্তিগত সততা আছে। যখন সেই বিশ্বাস নড়ে যায়, যখন মনে হয়, এই কবিতা হয়তো একটি নির্দিষ্ট ন্যারেটিভের অংশ তখন কবিতার সঙ্গে কবিরও সম্মানহানি অনিবার্য।
তখন কবিতা আর আঘাত করে না; শুধু শোনায়। এই “শোনানো” আর “আঘাত করা”র মধ্যে যে পার্থক্য, সেটিই আজকের বাংলার সাংস্কৃতিক সঙ্কটের কেন্দ্রে।
আমরা কি এখনও এমন কবিতা শুনতে পাই, যা শাসককে অস্বস্তিতে ফেলে? নাকি আমরা এমন কবিতার মধ্যেই স্বাচ্ছন্দ্য খুঁজে নিই, যা আমাদের আগের জানা অবস্থানকে আরও একটু সুন্দর করে তুলে ধরে?
এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়। কিন্তু একটি জিনিস স্পষ্ট—যখন কবিতা শাসকের তালে তাল মিলিয়ে কথা বলতে শুরু করে, তখন কেবল কবিতারই পরিবর্তন হয় না; সমাজের চিন্তার পরিসরও সংকুচিত হতে শুরু করে। কারণ অনেক সময়, সবচেয়ে কঠিন কাজটি হল ,নিজের তৈরি সুর নিজের কাছেই বেসুরো ঠেকা।