সুমন চট্টোপাধ্যায়: পৃথিবী আজ যেন এক অদ্ভুত দ্বৈত বাস্তবতার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে—একদিকে প্রযুক্তি, অর্থনীতি, আন্ত্রাতিক সংযোগের চূড়ান্ত অগ্রগতি; অন্যদিকে যুদ্ধ, অনিশ্চয়তা, ভয় এবং রাজনৈতিক উন্মত্ততার এক ভয়ংকর পুনরাবৃত্তি। এই বৈপরীত্য হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। এর পিছনে রয়েছে নির্দিষ্ট কিছু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, মুষ্টিমেয়র ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা, এবং সবচেয়ে বেশি, দুই যুদ্ধবাজ নেতার বেপরোয়া ক্ষমতালিপ্সা, যারা নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থকে মানবজাতির ভবিষ্যতের ওপরে বসাতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেননি।
এই দুই নেতার মধ্যে এক ধরনের অদ্ভুত সাদৃশ্য আছে। তাঁরা নিজেদের ইতিহাসের মোড় ঘোরানো চরিত্র বলে মনে করেন। তাঁরা বিশ্বাস করেন, শক্তি প্রদর্শনই একমাত্র ভাষা যা বিশ্ব বোঝে। তাঁদের কাছে কূটনীতি মানে দুর্বলতা, সংযম মানে আত্মসমর্পণ, আর যুদ্ধ মানেই শক্তির প্রতিষ্ঠা। এই মানসিকতা থেকেই তাঁরা এমন সব সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যার অভিঘাত আজ পুরো পৃথিবী অনুভব করছে—জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ধাক্কা, নিরাপত্তাহীনতা, এবং সবচেয়ে ভয়াবহ—একটি বৃহত্তর যুদ্ধের আশঙ্কা।
যুদ্ধের ভাষা খুব সহজ। এটি মানুষের আবেগকে দ্রুত উত্তেজিত করে। “শত্রু”, “প্রতিশোধ”, “জাতীয় নিরাপত্তা” এই শব্দগুলো জনমতকে মুহূর্তে বদলে দিতে পারে। আর এই সুযোগটাই নিয়েছেন এই দুই নেতা। তাঁরা জানেন, ভয়ের রাজনীতি সবথেকে কার্যকর। জনগণকে ভয় দেখাও, শত্রুর ছবি তৈরি করো, তারপর সেই ভয়কে কাজে লাগিয়ে নিজের ক্ষমতাকে আরও মজবুত করো,এই পুরনো কৌশলই আজ নতুনভাবে ফিরে এসেছে।
কিন্তু সমস্যা হলো, এই খেলাটা এখন আর শুধু একটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এই দুই মহামানবের প্রতিটি সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়ে আন্তর্জাতিক স্তরে। এখানে হামলা মানে শুধু একটি সামরিক অভিযান নয় প্রভাবে সহস্রগুণ বড়।এটি বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ায়, সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে দেয়, মুদ্রাস্ফীতি বাড়ায়, এবং সাধারণ মানুষের জীবনকে আরও কঠিন করে তোলে। একটি ক্ষেপণাস্ত্র শুধু একটি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করেনা, বিশ্বজুড়ে অনিশ্চয়তার ঢেউ তৈরি করে।
এই দুই নেতার সবচেয়ে বড় বিপজ্জনক দিক হলো ‘অতীতের শিক্ষা’ থেকে কিছুই না শেখার প্রবণতা। ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে যুদ্ধ কখনও দীর্ঘমেয়াদে কোনও সমস্যার সমাধান দেয় না। বরং এটি নতুন সমস্যা তৈরি করে, নতুন শত্রু তৈরি করে, এবং আরও বড় সংঘাতের বীজ বপন করে। তবুও তারা সেই একই পথে হাঁটছেন, যেন ইতিহাসের কোনও মূল্যই নেই।
একজন নেতা নিজের দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমস্যাগুলো ঢাকতে যুদ্ধকে ব্যবহার করছেন। অর্থনৈতিক চাপ, জনঅসন্তোষ, রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ,এসব থেকে দৃষ্টি সরাতে তিনি আন্তর্জাতিক সংঘাতকে সামনে নিয়ে আসছেন। যুদ্ধ তাঁকে ‘নায়কোচিত’ ভাবমূর্তি দেয়, তাকে প্রশ্নাতীত করে তোলে। অন্যদিকে আর একজন নিজেকে একপ্রকার ‘ঐতিহাসিক প্রতিশোধের বাহক’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন। তাঁর কাছে বর্তমানের বাস্তবতা গুরুত্বপূর্ণ নয়, তিনি অতীতের ক্ষোভকে বর্তমানের যুদ্ধের মাধ্যমে মেটাতে চান।
এই দুই ধরনের রাজনীতি,একটি আত্মরক্ষার নামে আগ্রাসন, আর একটি প্রতিশোধের নামে ধ্বংস দিয়ে মিলে তৈরি করেছে এক ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি। এর মধ্যে যুক্ত হয়েছে পারমাণবিক শক্তির উপস্থিতি, আধুনিক অস্ত্রের ভয়ঙ্কর ক্ষমতা এবং তথ্যযুদ্ধের বিভ্রান্তি। ফলে যুদ্ধ আর শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নেই,এটি এখন মানুষের মনের ভেতরেও প্রবহমান।
বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষ আজ এই রাজনীতির সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী। ইউরোপে মানুষ শীতকালে গ্যাসের দাম নিয়ে আতঙ্কে থাকে, এশিয়ায় খাদ্যের দাম বাড়ে, আফ্রিকায় জ্বালানি সঙ্কট তৈরি হয়, সবকিছুর মূলেই রয়েছে এই সঙ্ঘাত। অথচ যাঁরা এই সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন তাঁরা এই কষ্টের বাস্তবতা থেকে বহু দূরে, সুরক্ষিত ক্ষমতার বলয়ে বসে নিজেদের খেলা চালিয়ে যাচ্ছেন।
আরও ভয়ংকর হলো, এই দুই নেতা একে অপরকে শক্তিশালী করে তুলছেন। একজনের আগ্রাসন অন্যজনের প্রতিক্রিয়াকে আরও চরম করে তোলে। এই প্রতিক্রিয়া আবার প্রথমজনের পরবর্তী পদক্ষেপকে আরও উগ্র করে। এইভাবে তৈরি হয় এক ‘এস্কেলেশন স্পাইরাল’, যেখানে প্রত্যেকটি পদক্ষেপ আগের চেয়ে বেশি বিপজ্জনক। এবং এই চক্র ভাঙার কোনও ইচ্ছা তাঁদের মধ্যে বিশেষ দেখা যায় না।
কূটনীতি এখানে পরাজিত। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো কার্যত অকার্যকর । বৈঠক, আলোচনা, বিবৃতি, সবই যেন একটি আনুষ্ঠানিক নাটকের অংশ, যার বাস্তব ফল একেবারেই অকিঞ্চিৎকর। কারণ এই দুই নেতা বিশ্বাসই করেন না যে কথাবার্তা দিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব। তারা শুধু শক্তির ভাষায় কথা বলেন।
এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি উঠে আসে—এই পরিস্থিতির দায় কে নেবে? ইতিহাস কি শুধু এই দুই নেতার নামই মনে রাখবে, নাকি সেই সব শক্তিগুলোরও নাম লিখবে যারা তাদের সমর্থন করেছে, তাদের থামানোর চেষ্টা করেনি? কারণ যুদ্ধ কখনও একা হয় না; এটি সবসময় একটি বৃহত্তর ব্যবস্থার অংশ।
আজকের পৃথিবী এক অদ্ভুত অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। বাজার অস্থির, কূটনীতি দুর্বল, আর ভবিষ্যৎ অস্পষ্ট। এই অবস্থার জন্য দায়ী এই দুই যুদ্ধবাজ নেতার সিদ্ধান্তগুলি—যাঁরা নিজেদের ক্ষমতার খেলা খেলতে গিয়ে পুরো পৃথিবীকে এক বিপজ্জনক দোলাচলে ফেলে দিয়েছেন।
সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, এই বিশৃঙ্খলার কোনও স্পষ্ট শেষ নেই। যুদ্ধ শুরু করা সহজ, কিন্তু শেষ করা অত্যন্ত কঠিন। আর যখন নেতারা যুদ্ধকে নিজেদের রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেন, তখন তা আরও দীর্ঘায়িত হয়।
এই দুই নেতা হয়তো নিজেদের ইতিহাসের মহান চরিত্র হিসেবে দেখতে চান। কিন্তু বাস্তবতা হলো, তাঁরা ইতিহাসের এক গাঢ্ অন্ধকার অধ্যায়ের নির্মাতা, যেখানে অহংকার, অজ্ঞতা এবং ক্ষমতার লোভ মিলে মানবতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে।
এবং এই সত্যটা যত তাড়াতাড়ি বিশ্ব বুঝবে, ততই ভালো। কারণ এই পথ যদি চলতে থাকে, তাহলে ভবিষ্যৎ শুধু অনিশ্চিতই নয় অতীব ভয়ংকর হয়ে উঠবেই।