বাংলাস্ফিয়ার: মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্বাচনী ইস্তেহারে ঘোষিত “দিদির দশ প্রতিজ্ঞা”—শুনতে যেন এক মহাকাব্যিক প্রতিশ্রুতির মালা, যেখানে প্রতিটি শব্দে উন্নয়ন, কল্যাণ, নিরাপত্তা আর স্বপ্নের রঙ মিশে আছে। কিন্তু একটু খুঁটিয়ে দেখলেই বোঝা যায়, এই প্রতিজ্ঞাগুলি আসলে রাজনৈতিক অলংকার, বাস্তবতার মাটিতে দাঁড়ালে যেগুলি ভেঙে পড়ে একের পর এক।

প্রথমত, এই প্রতিজ্ঞাগুলির সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—এগুলির আর্থিক ভিত্তি কোথায়? রাজ্যের অর্থনীতি বহুদিন ধরেই চাপে, ঋণের বোঝা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। সেখানে নতুন করে আরও ভর্তুকি, আরও নগদ সাহায্য, আরও সামাজিক প্রকল্প—এসব কিছুর জন্য বিপুল অর্থ প্রয়োজন। কিন্তু সেই অর্থ আসবে কোথা থেকে? কর বাড়িয়ে? কেন্দ্রের উপর নির্ভর করে? না কি আরও ঋণ নিয়ে? এই মৌলিক প্রশ্নের কোনো স্পষ্ট উত্তর নেই। অর্থনীতি যখন দুর্বল, তখন প্রতিশ্রুতির পাহাড় দাঁড় করানো আসলে এক ধরনের রাজনৈতিক জাদুবিদ্যা—দেখতে ভালো, কিন্তু স্পর্শ করলেই ফাঁপা।

দ্বিতীয়ত, প্রতিজ্ঞাগুলির একটি বড় অংশই পুনরাবৃত্তি। অর্থাৎ, যেগুলি ইতিমধ্যেই গত দশ বছরে বহুবার ঘোষণা করা হয়েছে, সেগুলিই নতুন মোড়কে আবার সামনে আনা হচ্ছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিল্পায়ন, শিক্ষার মানোন্নয়ন—এই শব্দগুলি নতুন নয়। প্রশ্ন হলো, এতদিনে যদি এগুলির বাস্তব রূপায়ণ না ঘটে, তবে হঠাৎ করে নতুন ইস্তেহার কীভাবে সেই ব্যর্থতাকে সাফল্যে পরিণত করবে? এখানে প্রতিজ্ঞা নয়, বরং স্বীকারোক্তি বেশি প্রযোজ্য—যে পূর্ববর্তী প্রতিশ্রুতিগুলি পূরণ হয়নি।

তৃতীয়ত, প্রতিজ্ঞাগুলির ভাষা অত্যন্ত অস্পষ্ট ও বিমূর্ত। “উন্নয়ন হবে”, “সুযোগ বাড়বে”, “নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে”—এই ধরনের বাক্যগুলি রাজনৈতিক বক্তৃতায় ভালো শোনালেও প্রশাসনিক নীতিতে এগুলির কোনো নির্দিষ্ট মানে নেই। কতটা উন্নয়ন? কোন খাতে? কবে? কীভাবে? কোনো সময়সীমা নেই, কোনো পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য নেই। ফলে, এই প্রতিজ্ঞাগুলি বাস্তবে মূল্যায়নযোগ্য নয়; এগুলি পূরণ হয়েছে কি হয়নি, সেটাও নির্ধারণ করা কঠিন।

চতুর্থত, প্রশাসনিক বাস্তবতা সম্পূর্ণ উপেক্ষিত। একটি প্রতিজ্ঞা বাস্তবায়ন করতে গেলে যে পরিকাঠামো, দক্ষ জনবল, স্বচ্ছতা এবং দায়বদ্ধতা প্রয়োজন, তার কোনো উল্লেখ নেই। উদাহরণস্বরূপ, যদি বলা হয় প্রত্যেক যুবককে কাজ দেওয়া হবে, তবে প্রশ্ন ওঠে—কোন শিল্পে? কী ধরনের দক্ষতা নিয়ে? প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা কী? এই মৌলিক বিষয়গুলি ছাড়া প্রতিজ্ঞা কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকে।

পঞ্চমত, এই প্রতিজ্ঞাগুলির মধ্যে রাজনৈতিক কৌশল স্পষ্ট—নির্দিষ্ট ভোটব্যাঙ্ককে লক্ষ্য করে সুবিধা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি। নারীদের জন্য নগদ সহায়তা, ছাত্রছাত্রীদের জন্য ভাতা, সংখ্যালঘুদের জন্য বিশেষ প্রকল্প, সবকিছু মিলিয়ে একটি সুপরিকল্পিত সামাজিক সমীকরণ তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু এতে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন কোথায়? অর্থনীতির ভিত্তি মজবুত না হলে এই ধরনের সুবিধা টেকসই হয় না, বরং রাজ্যকে আরও আর্থিক সংকটে ঠেলে দেয়।

ষষ্ঠত, প্রতিজ্ঞাগুলিতে কোনো জবাবদিহিতার কাঠামো নেই। যদি প্রতিশ্রুতি পূরণ না হয়, তবে দায় কার? সরকার কীভাবে নিজেকে দায়বদ্ধ করবে? কোনো নিরীক্ষা ব্যবস্থা বা স্বচ্ছতার রূপরেখা নেই। ফলে, প্রতিজ্ঞা একটি একমুখী চুক্তি—সরকার বলবে, জনগণ শুনবে; কিন্তু প্রশ্ন করার বা হিসাব চাওয়ার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক পথ নেই।

সবশেষে, “দিদির দশ প্রতিজ্ঞা” আসলে এক ধরনের রাজনৈতিক নাট্যরচনা যেখানে বাস্তবতার চেয়ে আবেগ বেশি, পরিকল্পনার চেয়ে প্রচার বেশি। এটি এমন এক কাহিনি, যেখানে সমস্যার গভীর বিশ্লেষণ নেই, আছে কেবল তার উপরিভাগে রঙিন প্রলেপ। এই প্রতিজ্ঞাগুলি শুনতে যতটা আকর্ষণীয়, বাস্তবে ততটাই অকার্যকর—কারণ এগুলি বাস্তবতার কঠিন সমীকরণকে পাশ কাটিয়ে তৈরি।

রাজনীতি যদি হয় বাস্তব সমস্যার বাস্তব সমাধানের শিল্প, তবে এই প্রতিজ্ঞাগুলি সেই শিল্পের বিপরীত—এগুলি হলো কল্পনার অলংকার, যা ভোটের বাজারে বিক্রি হয়, কিন্তু শাসনের পরীক্ষায় টেকে না।