প্রথমেই একটি মৌলিক সত্য স্বীকার করা দরকার: ভারতের পশ্চিম এশিয়া নীতি দীর্ঘদিন ধরে ভারসাম্যের রাজনীতি। একদিকে ইজরায়েলের সঙ্গে গভীর প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা, অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে জ্বালানি, ভূ-রাজনীতি এবং আফগানিস্তান-কেন্দ্রিক কৌশলগত সম্পর্ক। একই সঙ্গে আমেরিকার সঙ্গে ভারতের ক্রমবর্ধমান কৌশলগত অংশীদারিত্ব, বিশেষত ইন্দো-প্যাসিফিক প্রেক্ষাপটে, এই ত্রিভুজকে আরও জটিল করে তুলেছে। ফলে, যখন আমেরিকা ও ইজরায়েল যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালায়, তখন ভারত কার্যত “বন্ধু বনাম অংশীদার” দ্বন্দ্বে পড়ে যায়।
এই যুদ্ধের শুরু থেকেই ভারতের প্রতিক্রিয়া লক্ষণীয়ভাবে সতর্ক। দিল্লি সরাসরি মার্কিন–ইজরায়েল হামলার নিন্দা করেনি; বরং “সংযম” এবং “সংলাপ”-এর আহ্বান জানিয়েছে। এই ভাষা কূটনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ মনে হলেও, বাস্তবে এটি একটি সূক্ষ্ম অবস্থান যেখানে ভারত ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো পক্ষেরই প্রকাশ্যে বিরোধিতা করছে না। কিন্তু এই নিরপেক্ষতা আদৌ কতটা টেকসই?
কারণ বাস্তব অর্থনীতি এই কূটনীতির উপর ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করছে। পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত ভারতের জন্য শুধু দূরবর্তী যুদ্ধ নয়; এটি সরাসরি জ্বালানি, বাণিজ্য এবং মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে যুক্ত। ভারত তার তেলের একটি বড় অংশ আমদানি করে এই অঞ্চল থেকে, এবং হরমুজ প্রণালীতে অস্থিরতা মানেই সরাসরি জ্বালানি সঙ্কট। ইতিমধ্যেই তেলের দাম বেড়েছে, বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, এবং শিল্প উৎপাদনেও চাপ পড়ছে।
এখানেই মার্কিন–ইজরায়েল ফ্যাক্টরটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আমেরিকা শুধু একটি কূটনৈতিক অংশীদার নয়; এটি ভারতের বৃহত্তম বাণিজ্য ও প্রযুক্তিগত সহযোগী। একইভাবে, ইজরায়েল ভারতের প্রতিরক্ষা আধুনিকীকরণের অন্যতম প্রধান উৎস। ফলে, এই দুই দেশের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করার ঝুঁকি ভারত নিতে পারে না। বিশেষত এমন এক সময়ে, যখন চীনের উত্থান মোকাবিলায় ওয়াশিংটনের সঙ্গে কৌশলগত সমন্বয় ভারতের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে, ইরানও ভারতের জন্য অপ্রয়োজনীয় নয়। চাবাহার বন্দর, মধ্য এশিয়ার প্রবেশদ্বার, এবং পাকিস্তানকে বাইপাস করে আঞ্চলিক সংযোগ—সব ক্ষেত্রেই ইরানের ভূমিকা অপরিহার্য। তাছাড়া, ঐতিহাসিকভাবে ইরান ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তার একটি নির্ভরযোগ্য উৎস ছিল। কিন্তু মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এবং বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতি এই সম্পর্ককে ক্রমশ সংকুচিত করছে।
এই দ্বৈত চাপের ফলে ভারতের ইরান নীতি এক ধরনের “নীরব পুনর্বিন্যাস”-এর মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রকাশ্যে ভারত এখনও ভারসাম্যের কথা বলছে, কিন্তু বাস্তবে তার কৌশল ক্রমশ মার্কিন–ইজরায়েল অক্ষের দিকে ঝুঁকছে। এর একটি কারণ হল ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা—ভারত আজ একটি উদীয়মান শক্তি, যার জন্য পশ্চিমা প্রযুক্তি, বিনিয়োগ এবং নিরাপত্তা সহযোগিতা অপরিহার্য। এই প্রেক্ষাপটে ইরানের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা একটি কৌশলগত ঝুঁকি হয়ে দাঁড়ায়।
তবে এই অবস্থানের একটি সীমাবদ্ধতাও আছে। যদি ভারত অত্যধিকভাবে মার্কিন–ইজরায়েল অবস্থানের দিকে ঝুঁকে পড়ে, তাহলে তার “স্ট্র্যাটেজিক অটোনমি” ধারণাটিই প্রশ্নের মুখে পড়বে। ভারতের পররাষ্ট্রনীতির মূল শক্তি ছিল একই সঙ্গে বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা এবং প্রয়োজনে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নেওয়া। বাস্তবে, অনেক আন্তর্জাতিক মহল ইতিমধ্যেই ভারতকে সম্ভাব্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে দেখছে, কারণ তার তিন পক্ষের সঙ্গেই সম্পর্ক রয়েছে।
কিন্তু এই মধ্যস্থতার সম্ভাবনাও তখনই কার্যকর হবে, যখন ভারত নিজেকে বিশ্বাসযোগ্য নিরপেক্ষ শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারবে। যদি দিল্লি কৌশলগতভাবে একদিকে বেশি ঝুঁকে পড়ে, তাহলে সেই বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হবে।
সবশেষে, প্রশ্নটি কেবল নীতি-নির্ধারণের নয়, এটি ভারতের ভূমিকাগত পরিচয়ের প্রশ্ন। ভারত কি একটি স্বাধীন কৌশলগত শক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করবে, নাকি বৃহৎ শক্তির প্রতিযোগিতার মধ্যে একটি “ঝুঁকে থাকা ভারসাম্য” বজায় রাখবে?
নতুন দিল্লির ইরান নীতি তাই আজ একটি পরীক্ষার সামনে দাঁড়িয়ে, এই যুদ্ধ শুধু মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র বদলাবে না, এটি ভারতের পররাষ্ট্রনীতির চরিত্রকেও পুনর্নির্ধারণ করতে পারে।