Home খবরদেশ এলপিজি সঙ্কটে পুরীকে দুষলেন মনিশঙ্কর

এলপিজি সঙ্কটে পুরীকে দুষলেন মনিশঙ্কর

0 comments 8 views
A+A-
Reset

“আজ হরদীপ পুরী সেই ঘোড়াশালা বন্ধ করতে চাইছেন, কিন্তু তখনই, যখন ঘোড়া অনেক আগেই পালিয়ে গেছে।”

বাংলাস্ফিয়ার: ভারতের বর্তমান রান্নার গ্যাস সংকট প্রসঙ্গে এভাবেই কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী হরদীপ পুরীর সরকারকে কটাক্ষ করলেন প্রাক্তন পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী মণিশঙ্কর আইয়ার। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে প্রকাশিত এক নিবন্ধে তিনি অভিযোগ করেন, গত দুই দশকের ভুল জ্বালানি নীতি এবং দীর্ঘ অবহেলার পরিণতিই আজ দেশবাসীকে ভোগ করতে হচ্ছে। তাঁর উত্তরসূরিরা জ্বালানি নিরাপত্তাকে কখনও অগ্রাধিকার দেননি বলে সরাসরি অভিযোগ করেন তিনি।

অনিচ্ছায় দায়িত্ব, তারপর উপলব্ধি

আইয়ার জানান, ২০০৪ সালের মে মাসে ইউপিএ সরকার গঠনের সময় তিনি প্রথমে পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রকের (MoPNG) দায়িত্ব নিতে অনিচ্ছুক ছিলেন। তাঁর ধারণা ছিল, এই মন্ত্রকটি দীর্ঘদিন ধরে ঘুষ, পৃষ্ঠপোষকতা এবং অযোগ্য রাজনীতিবিদদের সুবিধা দেওয়ার জায়গা হিসেবে কুখ্যাত। কিন্তু “অস্থায়ী” দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রবীণ ও রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থার প্রধানদের ব্রিফিং শুনে তিনি দ্রুতই তাঁর ধারণা বদলান।

তিনি বলেন, “খুব দ্রুতই বুঝতে পারি, এই মন্ত্রকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ — এটি জ্বালানি নিরাপত্তার মাধ্যমে জাতীয় নিরাপত্তার একটি অপরিহার্য স্তম্ভ।”

জাতীয় নিরাপত্তার তিন স্তম্ভ

প্রাক্তন মন্ত্রী বলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রক যেমন ভূরাজনৈতিক নিরাপত্তা দেখভাল করে এবং অর্থ ও বাণিজ্য মন্ত্রক অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে, তেমনই পেট্রোলিয়াম মন্ত্রকের দায়িত্ব হল জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এই তিনটি স্তম্ভ একসঙ্গে মিলেই প্রকৃত জাতীয় নিরাপত্তা গড়ে ওঠে বলে তিনি মনে করেন। অর্থনীতিবিদ বিজয় কেলকারের একটি মন্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে আইয়ার বলেন, বিংশ শতাব্দীতে পেট্রোলিয়াম যেমন শক্তির প্রধান উৎস ছিল, একবিংশ শতাব্দীতে সেই ভূমিকায় আসবে প্রাকৃতিক গ্যাস।

আমদানি-নির্ভরতা ৭০ থেকে ৯০ শতাংশে

আইয়ার উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, দুই দশক আগে ভারত তার তেল ও গ্যাসের প্রয়োজনের প্রায় ৭০ শতাংশ আমদানির উপর নির্ভরশীল ছিল। এখন সেই নির্ভরতা বেড়ে প্রায় ৯০ শতাংশে পৌঁছেছে। তিনি অভিযোগ করেন, তাঁর উত্তরসূরিরা দেশীয় বা বৈদেশিক উৎস থেকে জ্বালানি উৎপাদনে মনোযোগ না দিয়ে কেবল আন্তর্জাতিক বাজার থেকে তেল ও গ্যাস কেনার উপরেই জোর দিয়েছেন — যার ফলে এই ক্রমবর্ধমান আমদানি-নির্ভরতা তৈরি হয়েছে।

দেশীয় কৌশল: প্রযুক্তির বাধা

আইয়ার জানান, মন্ত্রকের দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি দেশীয় ও বৈদেশিক — এই দুই ধারায় একটি বৃহত্তর জ্বালানি কৌশল গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছিলেন।

দেশীয় স্তরে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল প্রযুক্তি। ভারতের ডেকান ট্র্যাপ অঞ্চলের নিচে সম্ভাব্য তেল ও গ্যাসের বিপুল ভাণ্ডার থাকলেও সেখানে পৌঁছতে হলে লাভা ও আগ্নেয় শিলার মধ্য দিয়ে গভীর ড্রিলিং করতে হয়। এরকম পরিস্থিতিতে ড্রিলিংয়ের অভিজ্ঞতা বিশ্বের খুব কম জায়গায় ছিল — যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডোতে সীমিত পরিসরে এর নজির দেখা গিয়েছিল।

সমুদ্রেও একই সমস্যা — আরব সাগরে প্রায় ১০,০০০ মিটার গভীরতায় পৌঁছানোর প্রযুক্তি দরকার, অথচ উত্তর সাগরে ড্রিলিংয়ের গভীরতা মাত্র ১৫০ মিটার। সেই সময়ে মার্কিন কোম্পানি এক্সন মেক্সিকো উপসাগরে গভীর সমুদ্রে ড্রিলিং করছিল। ১৯৭৩ সালে আবিষ্কৃত বোম্বে হাইয়ের মতো নতুন ক্ষেত্র খুঁজে পেতে যে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি দরকার, তা অর্জনের জন্য তিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতার উদ্যোগ নিয়েছিলেন বলে জানান।

বৈদেশিক কৌশল: ক্যাস্পিয়ান থেকে ইসরায়েল

বৈদেশিক কৌশলের অংশ হিসেবে আইয়ার জানান, অর্থ ও পররাষ্ট্র মন্ত্রকের কিছু আপত্তি এবং চীনের তীব্র প্রতিযোগিতা সত্ত্বেও তাঁরা বিদেশে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানের ক্ষেত্র অধিগ্রহণের চেষ্টা করেছিলেন। লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে ছিল ইরান, উপসাগরীয় দেশ, মধ্য এশিয়া এবং ক্যাস্পিয়ান সাগর ঘিরে তুর্কমেনিস্তান, কাজাখস্তান, রাশিয়া, আজারবাইজান ও উজবেকিস্তান।

তিনি নিজে আজারবাইজানের বাকু থেকে তুরস্কের সেহান বন্দর পর্যন্ত পাইপলাইন প্রকল্পের স্থান পরিদর্শন করেন বলে জানান। এমনকি স্বভাবগত অনাগ্রহ সত্ত্বেও তিনি ইসরায়েল সফর করেন — উদ্দেশ্য ছিল হরমুজ প্রণালী এড়িয়ে বিকল্প পথে তেল ও গ্যাস আনার সম্ভাবনা যাচাই করা। পরিকল্পনাটি ছিল বাকু-সেহান পাইপলাইনকে ইসরায়েলের আশকেলন ও এলাত পর্যন্ত বিস্তৃত করে সরাসরি ভারত মহাসাগরে পৌঁছে দেওয়া। পাশাপাশি বাব এল-মন্দেব ও হরমুজ প্রণালীর মতো সংকটপূর্ণ পথগুলি এড়াতে উত্তর আফ্রিকা থেকে ভারত মহাসাগর পর্যন্ত সমান্তরাল পাইপলাইন নির্মাণের কথাও ভাবা হয়েছিল।

মহাপরিকল্পনা: আইপিআই ও মিয়ানমার পাইপলাইন

আইয়ার জানান, তাঁর সময়ের সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনাগুলির একটি ছিল ইরান-পাকিস্তান-ভারত (আইপিআই) গ্যাস পাইপলাইন, যার মাধ্যমে ইরান থেকে প্রাকৃতিক গ্যাস পাকিস্তান হয়ে রাজস্থান পর্যন্ত পৌঁছানোর কথা ছিল। অন্য একটি পরিকল্পনা ছিল মিয়ানমারের সিত্ত্ওয়ে (আকিয়াব) উপকূল থেকে গ্যাস পাইপলাইন, যা বাংলাদেশ হয়ে পশ্চিমবঙ্গের হলদিয়া পর্যন্ত আসবে এবং সেখানে একটি বিশাল পেট্রোকেমিক্যাল কমপ্লেক্স গড়ে উঠবে।

স্বল্পমেয়াদী দায়িত্ব, দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি

এই পরিকল্পনাগুলির অধিকাংশই বাস্তবায়িত হয়নি বলে জানান আইয়ার। কারণ মাত্র ২০ মাসের মধ্যেই তাঁকে মন্ত্রকের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তিনি অভিযোগ করেন, তাঁর উত্তরসূরিরা জ্বালানি নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার না দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে তেল ও গ্যাস কেনার উপরেই মনোযোগ দিয়েছেন। তাঁর মতে, পেট্রোলিয়াম মন্ত্রককে কেবল পররাষ্ট্র মন্ত্রকের সহায়ক হিসেবে দেখাটা “মারাত্মক ভুল।”

হরমুজ সংকট ও এলপিজি বিপর্যয়

২০২৩ সালে হামাস-ইজরায়েল যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই পশ্চিম এশিয়ায় বড় যুদ্ধের আশঙ্কা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল বলে মন্তব্য করেন আইয়ার। তিনি বলেন, সেই সময়েই বিপুল পরিমাণ রান্নার গ্যাস মজুত করা উচিত ছিল। কারণ ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম এলপিজি ভোক্তা — প্রতি মাসে প্রায় ৩০ লক্ষ টন, যার ৬০ শতাংশই আমদানি করা।

বিশেষত ২০২৫ সালের জুনের ১২ দিনের যুদ্ধের পরই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু হলে ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিতে পারে। তাঁর প্রশ্ন — তখনই কেন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি?

কৌশলগত মজুতে মাত্র এক-দুই দিনের গ্যাস

আইয়ার আরও উদ্বেগজনক তথ্য তুলে ধরেন। তিনি জানান, ভারতের কাছে কাঁচা তেলের জন্য আলাদা কৌশলগত মজুত রয়েছে। এমনকি বিশাখাপত্তনম ও মঙ্গলুরুতে এলপিজির দুটি কৌশলগত সংরক্ষণাগারও আছে। কিন্তু তিনি জানান, সেখানে মজুত গ্যাস মাত্র এক থেকে দুই দিনের ব্যবহারের জন্য যথেষ্ট। তিনি প্রশ্ন করেন, “এ কি চরম দায়িত্বহীনতা নয়?”

দেরিতে পদক্ষেপ, তবু প্রশ্ন থাকছে

আইয়ার জানান, এখন Essential Commodities Act প্রয়োগ করা হয়েছে এবং তেল শোধনাগারগুলিকে এলপিজি উৎপাদন বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী হরদীপ পুরী জানিয়েছেন, তিনি ৪০টিরও বেশি দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন এলপিজি আমদানি নিশ্চিত করতে। কিন্তু আইয়ারের সরাসরি প্রশ্ন — এই সব ব্যবস্থা এক বছর আগে কেন নেওয়া হলো না? কেন গত দুই দশক ধরে — বিশেষ করে পশ্চিম এশিয়া যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় — দেশীয় ও বৈদেশিক উৎসের মাধ্যমে জ্বালানি নিরাপত্তাকে মন্ত্রকের প্রধান লক্ষ্য করা হলো না?

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles