বাংলাস্ফিয়ার: তেহরান শহরকে দূর থেকে দেখলে মনে হতে পারে—সবকিছুই স্বাভাবিক। পাহাড়ের পাদদেশে বিস্তৃত শহর, ব্যস্ত রাস্তা, কফিশপে তরুণদের ভিড়, দোকানের আলো। কিন্তু শহরের ভিতরে ঢুকলেই বোঝা যায়—এই স্বাভাবিকতার ভিতরে কোথাও যেন অদৃশ্য উত্তেজনার কম্পন জমে আছে। মানুষের কথাবার্তায় এক ধরনের সতর্কতা, রাস্তার মোড়ে মোড়ে নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি, আর হঠাৎ করে ধীর হয়ে যাওয়া ইন্টারনেটের গতি—সব মিলিয়ে যেন শহরটি নিঃশব্দে অপেক্ষা করছে কোনো অজানা ঘটনার জন্য।

তেহরানের এক বাসিন্দা বিবিসিকে বলেছিলেন, “এই শহর এখন যেন নিঃশ্বাস আটকে আছে।”

কারণ, ইরানের সরকার আশঙ্কা করছে—যুদ্ধ, অর্থনৈতিক সংকট এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অসন্তোষ মিলিয়ে যে ক্ষোভ জমেছে, তা আবারও বিস্ফোরিত হতে পারে রাস্তায়। সেই সম্ভাব্য বিস্ফোরণ ঠেকাতেই রাষ্ট্রযন্ত্র ধীরে ধীরে নিজেদের প্রস্তুত করছে।

 

শহরের অদৃশ্য অবরোধ

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে তেহরানের রাস্তায় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে নিরাপত্তা চৌকি। শহরের প্রধান সড়ক, বাজার এলাকা, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশেও পুলিশের উপস্থিতি এখন স্পষ্ট।

এই নিরাপত্তা ব্যবস্থা শুধু পুলিশের নয়—এর সঙ্গে রয়েছে আধাসামরিক বাহিনী বাসিজ এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (IRGC) বিশেষ ইউনিটগুলো, যাদের কাজ মূলত শহুরে বিদ্রোহ বা গণবিক্ষোভ দমন করা। এসব বাহিনীর বিশেষ ইউনিট—যেমন ইমাম আলি ব্যাটালিয়ন—আগেও বড় বড় প্রতিবাদ দমন করতে ব্যবহার করা হয়েছে।

তেহরানের নিরাপত্তা কাঠামোর কেন্দ্রবিন্দুতে আছে আরেকটি কমান্ড—থার-আল্লাহ সদরদপ্তর। এই সামরিক কাঠামো কার্যত রাজধানীর নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ করে এবং সংকটের সময় পুরো শহরের উপর সামরিক প্রশাসনের মতো ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে।

এই শক্তিশালী নিরাপত্তা জালই এখন ধীরে ধীরে শহরের উপর বিস্তৃত হচ্ছে।

 

ইন্টারনেটের অদৃশ্য কাঁচি

তবে সবচেয়ে নিঃশব্দ অস্ত্রটি বন্দুক নয়—ইন্টারনেট।

ইরানে প্রতিবাদের ইতিহাসে ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ একটি পরিচিত কৌশল। সরকার প্রায়ই সরাসরি বন্ধ না করে সংযোগের গতি ধীর করে দেয়, নির্দিষ্ট এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ করে দেয়, কিংবা বড় ফাইল পাঠানোর ক্ষমতা সীমিত করে দেয়—যাতে সংগঠিত প্রতিবাদ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এই কৌশল আবার সক্রিয় হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে, এবং “জাতীয় ইন্টারনেট” নামে পরিচিত একটি অভ্যন্তরীণ নেটওয়ার্ক বিস্তারের কাজ দ্রুত করা হচ্ছে। সরকার দাবি করছে—এটি বিদেশি ষড়যন্ত্র ঠেকানোর জন্য।

কিন্তু অনেক নাগরিকের কাছে এটি আরেকটি নিয়ন্ত্রণের দেয়াল।

 

গ্রেপ্তার এবং আতঙ্কের পরিবেশ

ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী শুধু নজরদারি বাড়ায়নি—গ্রেপ্তারও বাড়িয়েছে।

সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, শত শত মানুষকে আটক করা হয়েছে বিদেশি শক্তির সঙ্গে যোগাযোগ বা “অশান্তি উসকে দেওয়ার” অভিযোগে।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি—এই অভিযান আরও বিস্তৃত। তাদের মতে, গত বছরের শেষ দিকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ দমনে হাজার হাজার মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছে এবং অনেককে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

এই গ্রেপ্তার অভিযানের লক্ষ্য শুধু সংগঠক নয়—সাধারণ নাগরিকদের মধ্যেও ভয় ছড়িয়ে দেওয়া।

 

 

বিশ্ববিদ্যালয়: প্রতিবাদের পুরোনো কেন্দ্র

ইরানে ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস দীর্ঘ। তাই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও এখন বিশেষ নজরদারিতে।

কিছু ক্ষেত্রে সশস্ত্র নিরাপত্তা বাহিনী সরাসরি ক্যাম্পাসে ঢুকে পড়েছে, এবং অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে সরাসরি ক্লাস বন্ধ করে অনলাইনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে—যাতে ছাত্ররা একত্রিত হয়ে প্রতিবাদ সংগঠিত করতে না পারে।

তেহরানের এক ছাত্র বলছিলেন,

“আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় এখন ক্লাসরুমের চেয়ে বেশি পুলিশ স্টেশনের মতো মনে হয়।”

 

যুদ্ধের ছায়া এবং রাষ্ট্রের ভয়

এই সবকিছুর পেছনে আছে আরও বড় একটি প্রেক্ষাপট—মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ এবং আন্তর্জাতিক চাপ।

বিদেশি হামলা, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, এবং তেলের বাজারে অস্থিরতা—সব মিলিয়ে ইরানের সমাজে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকার সবচেয়ে বেশি ভয় পাচ্ছে—বাইরের চাপ ভেতরের বিদ্রোহে রূপ নিতে পারে।

ইতিহাসও তাদের এই ভয়কে অমূলক বলে না।

২০০৯ সালের নির্বাচন-পরবর্তী “গ্রিন মুভমেন্ট”,

২০১৯ সালের জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি-বিরোধী বিক্ষোভ,

২০২২ সালের মাহসা আমিনি আন্দোলন—

প্রতিবারই ছোট ছোট অসন্তোষ একসময় বিশাল গণআন্দোলনে রূপ নিয়েছে।

 

তেহরানের নিঃশব্দ অপেক্ষা

তেহরান আজ তাই এক অদ্ভুত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে।

রাস্তা চলছে, দোকান খোলা, গাড়ি চলছে—কিন্তু শহরের উপর যেন অদৃশ্য এক চাপা উত্তেজনা।

কেউ প্রকাশ্যে কিছু বলছে না,

কেউ নিশ্চিতও নয় কী ঘটতে যাচ্ছে।

একজন বৃদ্ধ দোকানদার বলছিলেন—

“এই শহরে মানুষ সবসময় অপেক্ষা করে। কখনও বিপ্লবের জন্য, কখনও দমনের জন্য।”

তেহরানের আকাশে সন্ধ্যা নেমে আসে প্রতিদিনের মতোই।

কিন্তু সেই সন্ধ্যার মধ্যে যেন লুকিয়ে থাকে একটি প্রশ্ন—

এই নীরবতা কি ঝড়ের আগের নীরবতা?