Home বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিস্বাস্থ্য রেড মিটেই কি লুকিয়ে আছে ক্যান্সার?

রেড মিটেই কি লুকিয়ে আছে ক্যান্সার?

0 comments 3 views
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার: বিশ্বজুড়ে অনেকদিন ধরেই মনে করা হয় যে নিরামিষ খাদ্যাভ্যাস তুলনামূলকভাবে বেশি স্বাস্থ্যকর। কিন্তু বড় আকারের বৈজ্ঞানিক গবেষণায় নিরামিষভোজীদের সংখ্যা সাধারণত এত কম থাকে যে এই খাদ্যাভ্যাসের প্রকৃত স্বাস্থ্যগত প্রভাব স্পষ্টভাবে নির্ণয় করা কঠিন হয়ে পড়ে। এই পরিসংখ্যানগত সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতেই আন্তর্জাতিক একদল গবেষক চারটি দেশের—ইউনাইটেড কিংডম, আমেরিকা, তাইওয়ান ও ভারত—নয়টি বড় কোহর্ট গবেষণার তথ্য একত্র করেন। মোট ১৮ লক্ষ মানুষের তথ্য, যাদের ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে, সেই বিশাল ডেটাবেসের উপর ভিত্তি করেই তৈরি হয়েছে এই গবেষণা। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ব্রিটিশ জার্নাল অব ক্যানসার-এ প্রকাশিত এই অভূতপূর্ব বিশ্লেষণ দেখিয়েছে, যারা রেড মিট—যেমন গরু, ভেড়া বা শূকরের মাংস খাওয়া থেকে বিরত থাকেন, তাদের মধ্যে কয়েক ধরনের ক্যানসারের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কম।

গবেষণার নেতৃত্ব দেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মহামারিবিদ অরোরা পেরেজ-কর্নাগো। তাঁর দলের হিসাব অনুযায়ী, মাংসভোজীদের তুলনায় নিরামিষভোজীদের মধ্যে মাল্টিপল মায়েলোমা নামের রক্তক্যানসারের ঝুঁকি প্রায় ৩১ শতাংশ কম। এছাড়া কিডনি ক্যানসারের ঝুঁকি ২৮ শতাংশ, অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের ঝুঁকি ২১ শতাংশ, প্রোস্টেট ক্যানসারের ঝুঁকি ১২ শতাংশ এবং স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি ৯ শতাংশ কম পাওয়া গেছে।

স্তন ও প্রোস্টেট ক্যানসারের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, যারা শুধু মুরগির মাংস খান বা মাছভোজী নিরামিষাশী—অর্থাৎ পেসকো-ভেজেটেরিয়ান—তাদের মধ্যেও ঝুঁকি কিছুটা কম, যদিও সেই হ্রাস তুলনামূলকভাবে কম মাত্রার। মুরগি-খাদকদের ক্ষেত্রে যথাক্রমে ৪ ও ৭ শতাংশ, আর মাছভোজী নিরামিষাশীদের ক্ষেত্রে ৭ ও ১০ শতাংশ।

তবে এই পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ মাথায় রাখা দরকার। কোনও সাধারণ ক্যানসারের ঝুঁকি সামান্য কমলেও বাস্তবে বিপুলসংখ্যক মানুষ উপকৃত হতে পারেন। আবার কোনও বিরল ক্যানসারের ঝুঁকি বড় অঙ্কে কমলেও মোট রোগীর সংখ্যায় তার প্রভাব সীমিত থাকতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ফ্রান্সে ২০২৩ সালে স্তন ও প্রোস্টেট ক্যানসার মিলিয়ে বছরে নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছেন প্রায় ১ লক্ষ ২০ হাজার। সেখানে অগ্ন্যাশয় ও কিডনি ক্যানসারে বছরে প্রায় ১৬ হাজার করে এবং মাল্টিপল মায়েলোমায় প্রায় ৬,৫০০ জন আক্রান্ত হন।

তবে গবেষণায় একটি ব্যতিক্রমী তথ্যও উঠে এসেছে। ইসোফ্যাজিয়াল স্কোয়ামাস সেল কার্সিনোমা অর্থাৎ খাদ্যনালীর এক বিশেষ ধরনের ক্যানসারে—নিরামিষভোজীদের ঝুঁকি মাংসভোজীদের তুলনায় প্রায় ৯৩ শতাংশ বেশি পাওয়া গেছে। যদিও এটি তুলনামূলকভাবে বিরল রোগ; ফ্রান্সে বছরে নতুন রোগীর সংখ্যা প্রায় ৩,০০০।

উল্লেখ্য, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গে যুক্ত আন্তর্জাতিক ক্যানসার গবেষণা সংস্থা (IARC) ২০১৫ সালেই রেড মিটকে “সম্ভাব্য ক্যানসারজনক” হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছিল। আর ধূমায়িত বা সংরক্ষিত মাংস ও সসেজের মতো প্রক্রিয়াজাত মাংসকে মানুষের জন্য ক্যানসারজনক পদার্থের তালিকায় সর্বোচ্চ স্তরে রাখা হয়েছিল।

তবে গবেষণার এই ফলাফলকে শুধুমাত্র মাংস খাওয়ার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করা সহজ নয় বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। গবেষণার প্রধান পেরেজ-কর্নাগো নিজেই স্বীকার করেন, নিরামিষভোজীরা সাধারণত বেশি ফল, শাকসবজি ও আঁশযুক্ত খাবার খান এবং প্রক্রিয়াজাত মাংস একেবারেই এড়িয়ে চলেন—এই দুটি বিষয়ও ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে।

ফ্রান্সের ন্যাশনাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট ফর এগ্রিকালচার, ফুড অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টের মহামারিবিদ এমমানুয়েল কেস-গুইয়ো—যিনি এই গবেষণায় অংশ নেননি—সতর্ক করেন যে ফলাফল সব দেশে সমানভাবে প্রযোজ্য নাও হতে পারে। তাঁর মতে, গবেষণায় “মাংসখেকো” হিসেবে চিহ্নিতদের মধ্যে মাংসের ধরন ও পরিমাণে ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে, যা প্রকৃত প্রভাব কিছুটা অস্পষ্ট করে দিতে পারে।

তিনি আরও জানান, গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত ভারত ও ইউনাইটেড কিংডম অংশগ্রহণকারীরা সম্ভবত ফ্রান্সের গড় মানুষের তুলনায় অনেক কম রেড মিট খান। সেই বিচারে ফ্রান্সের মতো দেশে, যেখানে প্রক্রিয়াজাত মাংসের ব্যবহার বেশি, সেখানে বাস্তবে ঝুঁকি-হ্রাসের মাত্রা এই গবেষণায় দেখানো ফলাফলের চেয়েও বেশি হতে পারে।

খাদ্যনালীর ক্যানসারের বাড়তি ঝুঁকি প্রসঙ্গে কেস-গুইয়ো একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা দেন—নিরামিষভোজীরা অনেক সময় মাংসখেকোদের চেয়ে বেশি গরম চা বা কফি পান করেন, এবং অতিরিক্ত তাপমাত্রার পানীয় ঘনঘন পান করলে খাদ্যনালীর ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

গবেষণায় সম্পূর্ণ ভেগানদের, যারা সব ধরনের প্রাণিজ খাদ্য এড়িয়ে চলেন, তাদের মধ্যে কোলোরেক্টাল ক্যানসারের ঝুঁকি কিছুটা বেশি পাওয়া গেছে। পেরেজ-কর্নাগোর মতে, প্রাণিজ খাদ্যে বেশি পাওয়া যায় এমন কিছু পুষ্টি উপাদান ভেগান খাদ্যে কম থাকতে পারে, যদিও এই সম্পর্ক পুরোপুরি বোঝার জন্য আরও গবেষণা প্রয়োজন।

বিশ্লেষণটিকে আরও জটিল করে তুলেছে ভেগানদের সংখ্যার স্বল্পতা। ১৮ লক্ষ মানুষের তথ্য একত্র করেও এই গবেষণায় ভেগানের সংখ্যা ছিল মাত্র প্রায় ৯ হাজার। তদুপরি ভেগানদের সামগ্রিক জীবনধারা প্রায়ই অন্যদের থেকে আলাদা হওয়ায় খাদ্যাভ্যাসের একক প্রভাব আলাদা করে নির্ণয় করা মহামারিবিদদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় বলে মন্তব্য করেন কেস-গুইয়ো।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles