বাংলাস্ফিয়ার: পারস্য উপসাগর আর ওমান উপসাগরের মাঝখানে সরু যে জলপথটি রয়েছে তারই নাম , স্ট্রেইট অফ হরমুজ, বাংলায় হরমুজ প্রণালী।এই জলপথ পার হওয়া শান্তির সময়েই নাবিকদের পক্ষে সহজ নয়। জলপথটি সঙ্কীর্ণ, অগভীর, জাহাজে ভরা এবং প্রায়ই আর্দ্রতা ও ধুলোর কুয়াশায় ঢাকা থাকে। কিন্তু যুদ্ধের সময় এই পথটি একেবারে মৃত্যুফাঁদে পরিণত হতে পারে। চারপাশে অনাবাদি খাড়া পাহাড়, নির্ভরযোগ্য নৌ-নির্দেশনা ব্যবস্থার অভাব আর এখন তার ওপর যুক্ত হয়েছে যুদ্ধের আতঙ্ক।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের যৌথ বিমান অভিযান অপারেশন এপিক ফিউরি শুরু হওয়ার পর থেকে এই পথ দিয়ে কার্যত তেলবাহী জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। অপরিশোধিত তেল, পরিশোধিত জ্বালানি কিংবা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) বহনকারী ট্যাঙ্কারগুলো এখন আর সহজে এই জলপথে ঢুকতে সাহস পাচ্ছে না। কারণ খবর ছড়িয়েছে, ইরান নাকি এই প্রণালীতে সামুদ্রিক মাইন বসানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে,যদি সত্যিই তা ঘটে, তাহলে কি আমেরিকা সামরিক শক্তি দিয়ে এই পথ আবার খুলে দিতে পারবে?

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বহুবার সতর্ক করে বলেছেন, ইরান যদি তেলের প্রবাহ বন্ধ করে দেয়, তাহলে তিনি আরও বিধ্বংসী যুদ্ধ শুরু করে দেবেন। ইতিমধ্যে মার্কিন বাহিনী ইরানের নৌবাহিনীর বড় অংশ ডুবিয়ে দিয়েছে এবং যেসব অস্ত্র দিয়ে জাহাজ চলাচলকে হুমকি দেওয়া যায় সেগুলো ধ্বংস করার চেষ্টা করছে। ১০ মার্চ মার্কিন প্রশাসন জানায়, ইরানের ওপর বোমাবর্ষণ আরও বাড়ানো হবে।
সিবিএস নিউজ ও সিএনএনের রিপোর্টে বলা হয়েছিল, ছোট নৌকা ব্যবহার করে ইরান মাইন বসানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে বা হয়তো ইতিমধ্যেই বসানো শুরু করেছে। যদিও ট্রাম্প সরাসরি তা নিশ্চিত করেননি, তবু তিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় কঠোর ভাষায় হুঁশিয়ারি দেন, যদি প্রণালীতে মাইন বসানো হয় এবং তা দ্রুত সরানো না হয়, তাহলে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক প্রতিক্রিয়া হবে “অভূতপূর্ব”। তিনি আরও দাবি করেন, মাইন বসানোর জন্য ব্যবহৃত দশটি “নিষ্ক্রিয়” নৌকা ইতিমধ্যে ধ্বংস করা হয়েছে।
এদিকে ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে তিনি জাহাজ মালিকদের সাহায্য করবেন—যেমন যুদ্ধবীমার খরচ কমাতে সহায়তা করা এবং ট্যাঙ্কার কনভয়ের জন্য সামরিক নিরাপত্তা দেওয়া। এটি অনেকটা ১৯৮০-এর দশকের অপারেশন সুইট উইলের পুনরাবৃত্তির মতো, যখন ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র কুয়েতি ট্যাঙ্কারগুলোতে নিজেদের পতাকা লাগিয়ে, সুরক্ষা দিয়ে পার করিয়েছিল। ১০ মার্চ মার্কিন জ্বালানি সচিব সোশ্যাল মিডিয়ায় দাবি করেছিলেন যে একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ নাকি একটি ট্যাঙ্কারকে নিরাপদে পার করিয়ে দিয়েছে—যদিও পরে সেই পোস্টটি মুছে ফেলা হয়। একই সময়ে ইউরোপীয় দেশগুলো এবং পাকিস্তানও জাহাজরক্ষী পাঠানোর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করছে।
বিশ্বের সমুদ্রপথে রফতানি হওয়া তেলের এক-চতুর্থাংশেরও বেশি এই প্রণালী দিয়ে যায়। এটি সুয়েজ প্রণালীর মতো নয়, যেখানে বিকল্প পথ খুঁজে নেওয়া যায়; উপসাগর থেকে জ্বালানি বহনকারী জাহাজের হরমুজ প্রণালী এড়িয়ে যাওয়ার উপায় কার্যত নেই। ফলে এখন দেখা যাচ্ছে, তেলভর্তি ট্যাঙ্কারগুলো প্রণালীর পশ্চিম দিকে জড়ো হয়ে আছে, আর খালি জাহাজগুলো পূর্ব দিকে অপেক্ষা করছে।
২৮ ফেব্রুয়ারির আগের মাসে প্রতিদিন গড়ে ৭৬টি ট্যাঙ্কার এই প্রণালী দিয়ে যাতায়াত করত। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সেই সংখ্যা নেমে এসেছে দিনে পাঁচটিরও কমে। কয়েকটি সাহসী জাহাজ অবশ্য ঝুঁকি নিয়ে পথ পার হওয়ার চেষ্টা করছে, কারণ ঝুঁকি যত বেশি, লাভের সম্ভাবনাও তত বড়। খবর পাওয়া যাচ্ছে, চীনও তাদের জাহাজের জন্য নিরাপদ পথ নিশ্চিত করতে আলোচনার চেষ্টা করছে, কিন্তু এখনও তেমন সাফল্য পায়নি।
ইরানের সম্ভাব্য হুমকিও বহুমাত্রিক। আকাশপথে তারা ব্যালিস্টিক ক্রুজ মিসাইল, ড্রোন ব্যবহার করতে পারে। সমুদ্রপৃষ্ঠে আছে দ্রুতগতির স্পিড বোট যেগুলোতে মিসাইল, বিস্ফোরক বা রকেট-চালিত গ্রেনেড থাকে। জলের নীচে নিচে তারা হাজার হাজার সামুদ্রিক মাইন বসাতে পারে, ব্যবহার করতে পারে মানববিহীন সাবমেরিন বা ডুবুরি, যারা নোঙর করা জাহাজে লিম্পেট মাইন লাগিয়ে দিতে পারে। এই সব অস্ত্রের কতটা ইতিমধ্যেই ধ্বংস হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। ইতিমধ্যে কয়েকটি জাহাজে হামলার খবরও এসেছে, যদিও সব ঘটনা পরিষ্কার নয়।

ট্রাম্প জাহাজমালিকদের উদ্দেশে বলেছেন,“সাহস দেখান।” কিন্তু মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলোও এখনো সাবধানে এগোচ্ছে। সুরক্ষিত কনভয় ব্যবস্থা এখনও পুরোপুরি চালু হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রিয়ার অ্যাডমিরাল মার্ক মনটোগোমারি মনে করেন, পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আনা পর্যন্ত কনভয় চালু করা ঠিক হবে না। কারণ ইরানের সামরিক ক্ষমতা এখনও এতটা কমেনি যে কেবল কয়েকটি এসকর্ট জাহাজ দিয়ে সব হুমকি মোকাবিলা করা সম্ভব হবে। তাছাড়া আকাশ প্রতিরক্ষার জন্য ব্যবহৃত অনেক মার্কিন ডেস্ট্রয়ার ইতিমধ্যেই অঞ্চলে বিমানবাহী রণতরীগুলোকে রক্ষা করতে ব্যস্ত।
যদি সত্যিই কনভয় শুরু হয়, তাহলে তা হবে অত্যন্ত জটিল ব্যবস্থা, উপরে সার্বক্ষণিক নজরদারি, যুদ্ধবিমান ও সশস্ত্র হেলিকপ্টার, এবং নতুন করে মোতায়েন করা ডেস্ট্রয়ার দ্বারা সুরক্ষা। কাজটি সহজ হবে না, খরচও হবে বিপুল।
গাজা যুদ্ধের সময় ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা বাব-আল-মান্ডাপ প্রণালীতে ড্রোন ও মিসাইল দিয়ে লোহিত সাগর ও সুয়েজ খালের অনেক সমুদ্রযাত্রা কার্যত থামিয়ে দিয়েছিল। আমেরিকা তাদের দমন করতে গিয়ে অনেক সমস্যায় পড়ে, এমনকি কয়েকটি বিমানও তাদের হারাতে হয়।। শেষ পর্যন্ত একটি আংশিক যুদ্ধবিরতিতে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হয়। কিন্তু সমুদ্রপথের চলাচল এখনও আগের মতো স্বাভাবিক হয়নি।

সামুদ্রিক সঙ্কীর্ণ পথ সাধারণত রক্ষাকারীর পক্ষেই সুবিধাজনক। অতীতে মার্কিন নৌকমান্ডাররা বলেছেন, ইরান যদি প্রণালী বন্ধ করার চেষ্টা করে তবে কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তারা তা খুলে দিতে পারবে। কিন্তু ইতিহাস অন্য কথা বলে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় গ্যালিপোলি অভিযানে ব্রিটেন ও মিত্রশক্তি দারদেনালেস খুলতে গিয়ে ভয়াবহ ব্যর্থতার মুখে পড়েছিল। অটোমান বাহিনী মাইন, দুর্গ ও মোবাইল আর্টিলারি দিয়ে শক্ত প্রতিরক্ষা গড়ে তুলেছিল। সমুদ্রপথে আক্রমণ করতে গিয়ে মিত্রশক্তি বহু জাহাজ হারায়, আর স্থলভাগে গ্যালিপোলি অবতরণ অভিযান রক্তাক্ত বিপর্যয়ে পরিণত হয়।
ইরানও এখন হরমুজ প্রণালীতে বহুস্তর প্রতিরক্ষা গড়ে তুলেছে বলে অনেকেই মনে করেন। এক বিশেষজ্ঞের কথায়, “এটা অনেকটা পেঁয়াজের স্তর ছাড়ানোর মতো। যদি ইরান মাইন বসায়, তাহলে আগে মিসাইল, ড্রোন ও দ্রুতগতির নৌকা এসব হুমকি মোকাবিলা করতে হবে, তারপর মাইন সরানোর কাজ শুরু করা যাবে।” কিন্তু মাইন অপসারণকারী জাহাজগুলো সাধারণত দুর্বল সুরক্ষিত থাকে এবং শত্রুর আগুনের মধ্যে কাজ করা তাদের পক্ষে খুবই কঠিন।
আজকের প্রযুক্তি উন্নত হলেও সঙ্কীর্ণ জলপথে বড় যুদ্ধজাহাজের সুবিধা কমে যায়। মিসাইল বা ড্রোন লক্ষ্যবস্তুতে দ্রুত পৌঁছে যায়। অনেক ক্ষেত্রে বড় তেলবাহী জাহাজের তুলনায় যুদ্ধজাহাজই বেশি ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ তাদের একক হুল এবং ওপরে সংবেদনশীল রাডার ও ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম থাকে।
১৯৮০-এর দশকে তাই এসকর্ট জাহাজগুলো সাধারণত ট্যাঙ্কারের সামনে নয়, পিছনে চলত, যাতে সামনে থাকা মাইনে ধাক্কা লেগে ক্ষতি না হয়।
ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির এক অধ্যাপক মনে করেন, ১৯৮০-এর দশকের পরিস্থিতির সঙ্গে বর্তমান পরিস্স্থিতির একটি বড় পার্থক্য রয়েছে। তখন ইরান সমুদ্রে আমেরিকার সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ এড়াতে চাইছিল। কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। বর্তমান সঙ্ঘাত তাদের কাছে শাসনব্যবস্থার অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধ। তাই কেবল যুদ্ধের ভয়াবহতা বাড়ার ভয়ে তারা সংযত থাকবে এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়।
অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও তেলের বাজারে অস্থিরতা দেখে ট্রাম্প সম্প্রতি আশ্বাস ও হুমকি দুটোই দিচ্ছেন। ৯ মার্চ তিনি বলেছিলেন, যুদ্ধ “খুব শিগগিরই” শেষ হয়ে যাবে, যা সাময়িকভাবে বাজারকে শান্ত করেছিল। কিন্তু বাস্তবে মনে হচ্ছে, মার্কিন-ইজরায়েলি আঘাতের পরও ইরানের শাসকগোষ্ঠীর অবশিষ্ট অংশ যুদ্ধের সমাপ্তির শর্ত নিজেরাই নির্ধারণ করতে চায়।
আর যদি সত্যিই তারা সত্যিই হরমুজ প্রণালীতে মাইন বসিয়ে থাকে, তাহলে ট্রাম্পের পক্ষে দ্রুত বিজয় ঘোষণা করা হয়তো অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে।