Home খবরবড় খবর ধর্মযুদ্ধের ভাষায় কথা বলছে পেন্টাগন

ধর্মযুদ্ধের ভাষায় কথা বলছে পেন্টাগন

0 comments 17 views
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার: ওয়াশিংটনের পেন্টাগনে সাংবাদিকদের সামনে দাঁড়িয়ে যখন পিট হেগসেথ ঘোষণা করছিলেন—“সারাদিন আকাশ থেকে মৃত্যু আর ধ্বংস বর্ষণ হবে”—তখন তাঁর ভাষা কোনো ঐতিহ্যবাহী রাষ্ট্রনায়কের ভাষা বলে মনে হচ্ছিল না। বরং তা ছিল এক ধরনের যুদ্ধোন্মত্ত উল্লাস। তাঁর বক্তব্যে কৌশলগত সংযম বা রাষ্ট্রনায়কসুলভ গাম্ভীর্যের বদলে ছিল আক্রমণাত্মক উচ্ছ্বাস।

তিনি বলেন, এই যুদ্ধ ন্যায্য হওয়ার জন্য নয়; এটি ন্যায্য নয় এবং হওয়ার কথাও নয়। শত্রুকে তখনই আঘাত করতে হবে যখন তারা দুর্বল। তাঁর ভাষায়: “আমরা তাদের তখনই মারছি যখন তারা নিচে পড়ে গেছে এবং ঠিক এটাই করা উচিত।”

এই কয়েকটি বাক্যেই যেন নতুন এক রাজনৈতিক দৃশ্যপটের আভাস পাওয়া যায়। কারণ এই মানুষটি আর কেবল একজন টেলিভিশন ভাষ্যকার নন। তিনি এখন বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর প্রধান প্রশাসক—মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সচিব।

৪৫ বছর বয়সী হেগসেথ একসময় ছিলেন ফক্স নিউজ-এর পরিচিত মুখ। আজ তিনি দাঁড়িয়ে আছেন United States Department of Defense-এর শীর্ষে। আর তাঁর এই উত্থান ঘটেছে মূলত ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক যুগের মধ্যেই।

এই কারণেই অনেক সমালোচক মনে করেন, হেগসেথের উত্থান কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়। এটি আসলে আমেরিকার রাজনীতি ও সামরিক ক্ষমতার চরিত্রগত পরিবর্তনের প্রতীক।

টেলিভিশন স্টুডিও থেকে পেন্টাগনের করিডর

পিট হেগসেথের জীবনপথ একটি অদ্ভুত রূপান্তরের গল্প। মিনিয়াপোলিসে জন্ম নেওয়া এই ব্যক্তি পড়াশোনা করেন প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটিতে। ছাত্রজীবনে তিনি ছিলেন রক্ষণশীল ছাত্রপত্রিকা প্রিন্সটন টোরির সম্পাদক। সেই সময় থেকেই তিনি তথাকথিত “সংস্কৃতি যুদ্ধ”—নারীবাদ, সমকামিতা এবং আমেরিকান জাতীয় পরিচয়—এই সব প্রশ্নে তীব্র অবস্থান নিতেন।

পরে তিনি মার্কিন ন্যাশনাল গার্ডে পদাতিক অফিসার হিসেবে যোগ দেন। তাঁর সামরিক জীবন তাঁকে নিয়ে যায় কিউবার Guantánamo Bay ঘাঁটিতে এবং ইরাক ও আফগানিস্তানের যুদ্ধক্ষেত্রে।

কিন্তু সামরিক জীবন শেষ হওয়ার পর তিনি দ্রুতই আরেকটি জগতে প্রবেশ করেন—টেলিভিশনের রাজনৈতিক নাট্যমঞ্চে।

ফক্স নিউজে তিনি ক্রমে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। তাঁর ভাষা ছিল সরল, আক্রমণাত্মক এবং আবেগপ্রবণ—যে ভাষা আমেরিকার ডানপন্থী দর্শকদের কাছে আকর্ষণীয়। তিনি নিয়মিতভাবে ট্রাম্পের সাক্ষাৎকার নিতেন এবং তাঁর নীতির জোরালো সমর্থক হয়ে ওঠেন।

এই টেলিভিশন ব্যক্তিত্বই শেষ পর্যন্ত একদিন পেন্টাগনের করিডরে পৌঁছে যায়।

এক বিভক্ত সেনেট এবং এক সিদ্ধান্ত

২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্প ক্ষমতায় ফেরার পর তিনি হেগসেথকে প্রতিরক্ষা সচিব হিসেবে মনোনীত করেন। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত মার্কিন রাজনৈতিক মহলে প্রবল বিতর্ক সৃষ্টি করে।

সেনেটে তাঁর নিশ্চিতকরণ শুনানিতে একের পর এক প্রশ্ন ওঠে।

নারীদের সেনাবাহিনীতে নিয়ে তাঁর অবমাননাকর মন্তব্য, দায়িত্ব পালনের সময় মদ্যপানের অভিযোগ, যৌন অসদাচরণের অভিযোগ—সবই আলোচনায় আসে।

এমনকি ছোট দুটি ভেটেরান সংগঠন পরিচালনার সময় তাঁর বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও উঠেছিল।

ফলাফল হয় নাটকীয়। সেনেটে ভোট দাঁড়ায় ৫০–৫০। শেষ পর্যন্ত উপ-রাষ্ট্রপতি জেডি ভান্সকে টাই-ব্রেকিং ভোট দিতে হয়। সেই ভোটেই হেগসেথ প্রতিরক্ষা সচিব হন।

এই ঘটনাটি অনেক পর্যবেক্ষকের কাছে আমেরিকার রাজনৈতিক বিভাজনের এক প্রতীক হয়ে ওঠে।

যুদ্ধের ভাষা

প্রতিরক্ষা সচিব হওয়ার পর থেকেই হেগসেথ একটি বিষয় স্পষ্ট করে দিয়েছেন—তিনি যুদ্ধকে কূটনৈতিক সংকটের শেষ বিকল্প হিসেবে দেখেন না; বরং একটি শক্তির প্রদর্শন হিসেবে দেখেন।

তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন শত্রুদের ওপর “অত্যন্ত শক্তিশালী ও শাস্তিমূলক সহিংসতা” চালানোর।

আরও বিতর্কিত ছিল তাঁর একটি বক্তব্য—যুদ্ধের তথাকথিত “বোকা নিয়মাবলি” তুলে দেওয়ার কথা। এই নিয়মাবলিগুলো আসলে আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুযায়ী বেসামরিক নাগরিকদের রক্ষা করার জন্য তৈরি।

এই ভাষা সমালোচকদের উদ্বিগ্ন করেছে। তাদের মতে, একজন প্রতিরক্ষা সচিবের কাজ শুধু যুদ্ধ পরিচালনা নয় বরং যুদ্ধের সীমা নির্ধারণ করা।

ধর্ম, যুদ্ধ এবং ‘ক্রুসেড’ কল্পনা

হেগসেথকে ঘিরে আরেকটি বিতর্ক আরও গভীর। সেটি হলো তাঁর ধর্মীয় মতাদর্শ।

তাঁর শরীরে দুটি ট্যাটু রয়েছে যা মধ্যযুগীয় ক্রুসেডের প্রতীক বলে বিবেচিত। একটি হলো ‘জেরুসালেম ক্রস’। আরেকটি তলোয়ার-চিহ্নের পাশে লেখা লাতিন বাক্য “Deus vult”—অর্থাৎ “ঈশ্বর তাই চান।”

এই বাক্যটি ছিল ক্রুসেডারদের যুদ্ধধ্বনি।

সমালোচকদের মতে, এই প্রতীকগুলো কেবল ব্যক্তিগত ধর্মীয় পরিচয়ের চিহ্ন নয়। এগুলো একটি বৃহত্তর মতাদর্শের অংশ যেখানে পশ্চিমা সভ্যতাকে খ্রিস্টীয় সভ্যতা হিসেবে দেখা হয় এবং সেই সভ্যতাকে রক্ষা করা এক ধরনের ধর্মীয় কর্তব্য হিসেবে বিবেচিত হয়।

হেগসেথ তাঁর বই আমেরিকান ক্রুসেড-এ লিখেছিলেন—পশ্চিমা সভ্যতার সুফল যারা ভোগ করছে, তাদের একজন ক্রুসেডারকে ধন্যবাদ জানানো উচিত।

এই বক্তব্য অনেকের কাছে বিপজ্জনক মনে হয়েছে। কারণ এটি আধুনিক ভূরাজনীতিকে ধর্মীয় সংঘর্ষের ভাষায় ব্যাখ্যা করে।

সমালোচকদের উদ্বেগ

ভেটেরান সংগঠন ভেট ভয়েস ফাউন্ডেশন-এর প্রধান নির্বাহী জানেসা গোল্ডবেক মন্তব্য করেন—হেগসেথ এমন একজন ব্যক্তি যিনি মার্কিন সরকারের বিপুল সামরিক শক্তিকে নিজের আদর্শিক লক্ষ্য পূরণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন।

অন্যদিকে ইতিহাসবিদ জেরেমি ভ্যারন বলেন, যুদ্ধের সময় নিহত সৈন্যদের বিষয়ে হেগসেথের মন্তব্য সহানুভূতির অভাব প্রকাশ করে।

এমনকি প্রাক্তন হোয়াইট হাউস কর্মকর্তা ব্রেট ব্রুয়েন মন্তব্য করেন—পেন্টাগন থেকে এখন যে ধরনের ভাষা শোনা যাচ্ছে, তা মিত্রদেশগুলিকে আশ্বস্ত করার বদলে উদ্বিগ্ন করে তুলছে।

তাঁদের মতে, আমেরিকার সামরিক নেতৃত্বের প্রয়োজন শান্ত, স্থির এবং কৌশলগত ভাষা—টেলিভিশনের নাটকীয় ভাষা নয়।

এক বৃহত্তর প্রশ্ন

পিট হেগসেথের গল্প তাই কেবল একজন ব্যক্তির গল্প নয়। এটি আসলে আমেরিকার রাজনীতির পরিবর্তিত চরিত্রের গল্প।

এক সময় পেন্টাগনের নেতৃত্বে থাকতেন অভিজ্ঞ জেনারেল বা দীর্ঘদিনের প্রশাসকরা। তারা যুদ্ধকে দেখতেন একটি ভয়ংকর প্রয়োজনীয়তা হিসেবে—যা কূটনীতির ব্যর্থতার পরে আসে।

আজ সেখানে উঠে এসেছে এক নতুন ধরনের নেতৃত্ব—যারা যুদ্ধকে প্রায় সাংস্কৃতিক নাটকের অংশ হিসেবে উপস্থাপন করে।

এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর রাজনৈতিক দর্শনে শক্তির প্রদর্শন, নাটকীয় ভাষা এবং ব্যক্তিগত আনুগত্য বিশেষ গুরুত্ব পায়।

হেগসেথ সেই দর্শনেরই প্রতিফলন।

শেষ প্রশ্ন

অতএব প্রশ্নটি কেবল এই নয় যে পিট হেগসেথ কেমন মানুষ।

প্রশ্নটি আরও বড়:

একবিংশ শতাব্দীর আমেরিকা কি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে যুদ্ধ, ধর্ম এবং রাজনৈতিক নাটক একে অপরের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে?

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles