Table of Contents
সোমক রায়চৌধুরী: সেমিফাইনালে যেখানে শেষ করেছিলেন, সেখান থেকেই শুরু করলেন সঞ্জু স্যামসন। ওয়াংখেড়েতে অষ্টাদশ ওভারে যেখানে থেমেছিলে যশপ্রীত বুমরা, সেখান থেকেই আহমেদাবাদে শুরু করে সেমিফাইনালের পারফরমেন্সকে ছাপিয়ে গেলেন দেশের এক নম্বর বোলার। টিম ইন্ডিয়ার জন্য বাড়তি বোনাস, চ্যাম্পিয়নশিপ ম্যাচের প্রারম্ভেই অভিষেক শর্মার ফর্মে ফিরে পাওয়া। আক্সার প্যাটেল বুঝিয়ে দিলেন, কেন সুনীল গাভাস্কারের মতো ক্রিকেট ব্যক্তিত্ব তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। ইশান কিষাণ, শিবম দুবে, হার্দিক পান্ডিয়ারা ফাইনালের মতোই নিজেদের উজাড় করে খেললেন। যার সম্মীলিত ফল হল, ঘরের মাঠে টি-২০ বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়নশিপ খেতাব ধরে রাখল ভারত।

আর একটা কথা বলা হল না, মিচেল স্যান্টনারের নিউজিল্যান্ড প্যাট কামিন্সের অস্ট্রেলিয়া নয়। টস থেকে শেষ উইকেট পর্যন্ত ব্র্যাক ক্যাপ বাহিনী করে গেল একের পর এক ভুল। যা দেখে মনে হচ্ছিল, ইডেনে দক্ষিণ আফ্রিকাকে সেমিফাইনালে হারিয়েই সব স্টিম বেরিয়ে গিয়েছে ফিন অ্যালেন- লকি ফার্গুসনদের। কামিন্সরা যেরকম রোহিত শর্মাদের আটকানোর জন্য নির্দিষ্ট পরিকল্পনা করে নেমেছিলেন, স্যান্টনারদের রবিবার সেরকম কিছুই ছিল বলে বোঝা গেল না। নাহলে শুরুতেই যখন পেসারদের বিরুদ্ধে ঝড় তুললেন অভিষেক-সঞ্জু, তখন কেন কোন প্ল্যান বি দেখাতে পারল না কিউই দল? যে গ্লেন ফিলিপস শুরুতে সেরা বোলিং করলেন, তাকে পুরো ইনিংসে আর কেন বলই দিলেন না স্যান্টনার? জেমস নিশাম আর কিছুটা কিউই অধিনায়ক ছাড়া তার বাকি চার বোলারই তো বেধরক মার খেয়ে গেলেন। তবু ফার্গুসন-ম্যাট হেনরিদের ওপরই আস্থা রেখে গেলেন নিউজিল্যান্ড ক্যাপ্টেন।

বিপক্ষের ভুল স্ট্র্যাটেজির ফায়দা সূদে-আসলে তুললেন সঞ্জু-ইশান-শিবমরা। এক সময় তো চার-ছয়ের বন্যা দেখে মনে হচ্ছিল যে ২৭৫ পার করে দেবে ভারত। জেমস নিশামকে মারতে গিয়ে দ্রুত তিনটে উইকেট দিলেন ইশান-সূর্যকুমাররা। তাতে কিছুটা স্লথ হল রানের গতি। শেষ ওভার শিবম দুবে নেমে নিশামকে কিঞ্চিত শিক্ষা দিলেন, দুটি ছয় আর তিনটে বাউন্ডারি মেরে ২৫৫/৫ এ স্কোর নিয়ে গিয়ে।
ন-মো স্টেডিয়ামের আবহ
নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়ামের গ্যালারির ডিজে-তে বাজছে “মা তুঝে সালাম” আর “চক দে ইন্ডিয়ার” সুর। ভিআইপি বক্সে হাজার ওয়াটের আলোর মতো ঝলমল করছে সেলিব্রেটিদের হাসি হাসি মুখমন্ডলী। গ্যালারির যে কোনও দিকেই তাকালে চোখে পড়বে নীল জার্সির ঢেউ, “ব্লীড ব্লু” জনতা। আহমেদাবাদের ন-মো স্টেডিয়ামে ক্রিকেটের থেকে বেশি টেলিভিশন জলসা আর উগ্র দেশপ্রেমের আবহ। টিকিটের যা বাজার এবং কালো বাজার মূল্য দেখলাম, তাতে প্রকৃত ক্রিকেটপ্রেমী, জুনিয়র ক্রিকেটার ও কোচ ক’জন মাঠে যেতে পেরেছিলেন, তা নিয়ে সন্দেহ রয়ে যাওয়া স্বাভাবিক!

এই পরিবেশে রানের পাহাড় তাড়া করতে নামলেন সাড়া ফেলে দেওয়া দুই তরুণ কিউই ওপেনার। চাপের মুখে আর্শদীপ নার্ভ হারিয়ে ফেলেন বলে সূর্যকুমার এদিন বোলিং ওপেন করালেন হার্দিক আর সহঅধিনায়ক আক্সারকে দিয়ে। চালটা ক্লিক করে গেল কিউইদের সেরা বাজি ফিন অ্যালেন আক্সারের ভাসানো বলে মিসটাইম করে লঙঅন বাউন্ডারিতে তিলক ভর্মার হাতে সহজ ক্যাচ দিয়ে ফিরে যাওয়ায়। ফিনের জুটি সাইফার্ট কিন্তু ছন্দে ছিলেন। পাঁচটি বিশাল ছয়ে মারলেন, হাফ সেঞ্চুরিও করলেন।
বুম বুম বুমরা
সেমিফাইনালে নিজের প্রথম ওভারের প্রথম বলেই ইংরেজ অধিনায়ক হ্যারি ব্রুককে ফিরিয়েছিলেন বুমরা, সৌজন্যে আক্সারের দুরন্ত ক্যাচ। রবিবার সেই প্রথম বলে একইরকম স্লোয়ারে ঠকে তার শিকার হলেন রাচিন রাবিন্দ্রা। আক্সারের জায়গায় এবার ইশান কিষাণ, তবে আক্সারের মতো পেছন দিকে নয়, সামনে দিকে প্রায় অনেকটা ছুটে এসে ঝাঁপিয়ে প্রায় মাটির এক ইঞ্চি ওপরে বলটি তালুবন্দী করলেন ইশান। আর একটি অনবদ্য ক্যাচ। একদিকে সাইফার্ট লড়াই চালাচ্ছেন, অন্যদিকে আক্সার ফিরিয়ে দিলেন পাওয়ার হিটার গ্লেন ফিলিপসকে। তিন উইকেট খুইয়ে নার্ভ হারিয়ে ফেলল নিউজিল্যান্ড। স্রেফ টেনশনে থরহরিকম্প হয়ে হার্দিকের বলে প্লেড অন হলেন মার্ক চ্যাপমান। আস্কিং রেট আকাশে চড়ছে দেখে অফ ফর্মে থাকা বরুণ।চক্রবর্তীকে টার্গেট করলেন সাইফার্ট। কিন্তু বরুণের একটা শর্ট বলে তার পুল মিডউইকেট বাউন্ডারি পার হওয়ার ঠিক আগে ঠাণ্ডা মাথায় তালুবন্দী করলেন ইশান। ওয়াংখেড়েতে ঠিক যেভাবে স্যাম কারেনের ক্যাচ নিয়েছিলেন তিলক ভর্মা। এরপর আর কিউইদের লড়ার রসদ বলে কিছু বাকি রইল না। অফ ফর্মে থাকা ডারেল মিচেল ও স্যান্টনার ভারতীয় বোলিং-এর দুই দুর্বল ঘুঁটি আর্শদীপ ও বরুণকে যথাক্রমে দুটি করে ছয় মারলেন। একদিনের বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ভারতের বিরুদ্ধে এরকমই রানের পাহাড় তাড়া করতে গিয়ে দুরন্ত সেঞ্চুরি করে শেষ পর্যন্ত নিউজিল্যান্ডকে লড়াইতে রেখে দিয়েছিলেন ডারেল মিচেল। কিন্তু টি-২০তে পারলেন না। পরের ওভারে এসেই আক্সার তাকে ফিরিয়ে দিলেন।
ব্যস, রোহিতদের হারের জ্বালা জুড়োনোর পর্ব শুরু হল গোটা স্টেডিয়াম জুড়ে! ল্যাজ মুড়োতে বুমসকে আক্রমণে ফেরালেন সূর্যকুমার। বুমরার নিখুঁত ইয়র্কারের উত্তর।ছিল না কিউইদের লোয়ার-মিডর ওর্ডারের কাছে। পরপর দু’বলে ফিরলেন নিশাম ও ম্যাট হেনরি। পরের ওভারেই কিউই অধিনায়ককে ৪৩ রানের মাথায় ক্লিন বোল্ড করে খেলা প্রায় শেষ করে দিলেন বুমরা। সঙ্গে সঙ্গেই ন-মো স্টেডিয়ামের সীমানা ছাড়িয়ে দেশজুড়ে শুরু হয়ে গেল অকাল দ্বীপাবলির শব্দ। অভিষেক শর্মা শেষ উইকেটটি নেওয়া ছিল কেবল সময়ের অপেক্ষা। নিষ্প্রাণ উইকেটে ব্যাটারদের প্রবল প্রাধান্যের এই বিশ্বকাপে যশপ্রীত বুমরা একমাত্র উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। রবিবার তার বোলিং পরিসংখ্যান ৪/১৫! তাকে ছাড়া আর কাউকে ফাইনালের সেরা ভাবাই যেত না! সেমিফাইনালেও এক সময় ম্যাচ নিষ্পত্তির মূল লড়াইটা হয়ে দাঁড়িয়েছিল বুমরা বনাম জেকব বেথেলের। বুমরা সেই লড়াইয়ে বেথেলকে শেষ মুহূর্তে ছিটকে দিয়েও জয়ী হলেও সেরার সম্মান পান নি। এদিন তাকে উপেক্ষা করা গেল না। একসময় শারজার পাটা পিচে দূর্ধর্ষ বোলিং করে ম্যাচ জেতাতেন ওয়াসিম আক্রম, ম্যালকম মার্শালরা। রানের ফোয়ারার মধ্যে পারফর্ম করে এক বোলার হলেন ম্যাচের সেরা; এ যেন এক পোয়েটিক জাস্টিস।
বিবর্তিত ক্রিকেট
ইডেন, ওয়াংখেড়ের পর আহমেদাবাদেও অল্পের জন্য সেঞ্চুরি হাতছাড়া হল সঞ্জুর। মালয়লী ব্যাটার এদিন মারলেন আটটি ছয়। সেমিফাইনালের মতোই আউট হলেন বাউন্ডারিতে ক্যাচ দিয়ে। আসলে টি-২০ পুরোপুরি চার-ছয়ের খেলা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিনের ক্রিকেটকে যেমন একদূই-এর খেলা মনে করতেন বহু বিশেষজ্ঞ, এবং জোর দিতেন রানিং বিটউইন দ্য উইকেটে। টি-২০ তে সেরকমই গুরুত্বপূর্ণ পাওয়ার-হিটিং। বাউন্ডারি-ওভার বাউন্ডারি মারতে মারতে মাইন্ডসেট এমন হয়ে যায় ব্যাটারের, সে আর সিঙ্গলস এ ফিরতে চায় না। সঞ্জু এই মানসিকতার শিকার হলেন আবার। ওয়াংখেড়েতে ভারত মেরেছিল ১৯টা ছয়, আর ন-মো স্টেডিয়ামের বড় বাউন্ডারিতে সঞ্জু-ইশান-অভিষেক-শিবম-হার্দিক রা সম্মিলিতভাবে মারলেন ১৮ টা ওভার-বাউন্ডারি! কালোর সঙ্গে লাল মাটির মিশ্রণে করা উইকেটের ফায়দা পূরোপুরি তুললেন ভারতীয় ব্যাটাররা; একমাত্র সাইফার্ট ছাড়া কিউই ব্যাটাররা নার্ভ হারিয়ে সুযোগটা নিতেই পারলেন না।

এই বিশ্বকাপে ক্রিকেটের এক বিবর্তিত রূপ দেখা গেল। একসময় একদিনের আন্তর্জাতিকে ২৫০’র গন্ডি পার করাকে দারুণ স্কোর বলা হত। এখন টি-২০ তে ২৫০ রান নিরাপদ নয়; তা পরিষ্কার হয়ে গেল ভারত-ইংল্যান্ড সেমিফাইনালের পর। কারণ বিপক্ষ দলের কেউ একজন ওয়াংখেড়ের জেকব বেথেল হয়ে উঠতে পারেন!
আগামী দিনে ইনিংস পিছু ওভারবাউন্ডারির গড় যে আরও বাড়বে, তা নিশ্চিত ভাবেই বলা যায়।