Table of Contents
বাংলাস্ফিয়ার: ভারতীয় টাকা আবারও তীব্র চাপে পড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত বাড়তে থাকায় এবং মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্য নেমে এসেছে রেকর্ড নিম্নস্তরের কাছাকাছি—প্রতি ডলার প্রায় ৯২.২৮ টাকা।এই পতন শুধু মুদ্রাবাজারের একটি স্বল্পমেয়াদি ওঠানামা নয়; বরং এটি ভারতের অর্থনীতির একটি গভীর দুর্বলতার দিকে আঙুল তুলে দিচ্ছে—দেশটির তেল আমদানির উপর অত্যধিক নির্ভরতা।
ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল আমদানিকারক দেশ। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লেই তার সরাসরি প্রভাব পড়ে ভারতের বাণিজ্য ভারসাম্য, মুদ্রাস্ফীতি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার উপর। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত তীব্র হওয়ায় জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এর ফলেই আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯৩ ডলারেরও বেশি ছুঁয়েছে। তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভারতীয় আমদানিকারকদের ডলারের চাহিদা বেড়েছে—আর সেই চাপেই দুর্বল হয়ে পড়েছে টাকা।
কেন এত দ্রুত দুর্বল হচ্ছে টাকা
টাকার সাম্প্রতিক পতনের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। বাজার খোলার পরেই এক পর্যায়ে টাকা ৪৬ পয়সা পর্যন্ত অবমূল্যায়িত হয়, যা বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দেয়। একই সময়ে মার্কিন ডলার শক্তিশালী হওয়ায় বৈশ্বিক মুদ্রাবাজারেও চাপ তৈরি হয়েছে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হল ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি। তেলের দাম যত বাড়ে, আমদানি ব্যয় তত বেড়ে যায়। আর যখন আমদানি বাড়ে কিন্তু রফতানি একই গতিতে বাড়ে না, তখন বাণিজ্য ঘাটতি আরও প্রসারিত হয়। এতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা বেড়ে যায়, যা আবার টাকার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে।
তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আচরণ। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগকারীরা ভারতীয় বাজার থেকে ২১ হাজার কোটি টাকারও বেশি মূলধন তুলে নিয়েছেন। এই মূলধন বহির্গমন বাজারে অনিশ্চয়তার সংকেত দেয় এবং মুদ্রার ওপর চাপ বাড়ায়।
তেলের দাম ও মুদ্রাস্ফীতির দ্বৈত চাপ
টাকার দুর্বলতা শুধু মুদ্রাবাজারের বিষয় নয়; এর সরাসরি প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের জীবনেও। রটাকা যত দুর্বল হয়, আমদানিকৃত পণ্যের দাম তত বাড়ে। আর ভারতের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমদানিকৃত পণ্য হল জ্বালানি তেল।
তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বাড়ে, শিল্প উৎপাদনের খরচ বাড়ে, এবং শেষ পর্যন্ত তা পৌঁছে যায় ভোক্তা মূল্যসূচকে। ফলে অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতির চাপ বৃদ্ধি পায়। এই পরিস্থিতিতে সরকার ও নীতিনির্ধারকদের সামনে দ্বৈত চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়—একদিকে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা, অন্যদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখা।
আরবিআই কি হস্তক্ষেপ করবে?
এই পরিস্থিতিতে অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, প্রয়োজনে রিজার্ভ ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া (RBI) মুদ্রাবাজারে হস্তক্ষেপ করতে পারে। সাধারণত কেন্দ্রীয় ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করে টাকার পতন ঠেকানোর চেষ্টা করে।
ভারতের কাছে বর্তমানে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ফরেক্স রিজার্ভ রয়েছে, যা বাজারে অতিরিক্ত অস্থিরতা সামাল দিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা বলয় হিসেবে কাজ করতে পারে। তবে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলছেন—কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপ সাধারণত সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু তেলের দাম দীর্ঘ সময় ধরে উঁচুতে থাকলে মুদ্রার ওপর চাপ বজায় থাকতে পারে।
ইতিহাস বলছে—এ নতুন ঘটনা নয়
টাকার ওপর এই ধরনের চাপ ভারতের অর্থনীতিতে নতুন কিছু নয়। অতীতে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, তেলের দাম বৃদ্ধি কিংবা বৈশ্বিক আর্থিক অস্থিরতার সময়েও টাকার দ্রুত অবমূল্যায়ন ঘটেছে।
প্রতিবারই কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারে হস্তক্ষেপ, সুদের হার নীতি এবং বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু বাস্তবতা হল—যতদিন ভারত তার জ্বালানি চাহিদার বড় অংশ বিদেশ থেকে আমদানি করবে, ততদিন আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের ওঠানামা সরাসরি দেশের মুদ্রা ও অর্থনীতিকে প্রভাবিত করতেই থাকবে।