Home বড় খবর যুদ্ধের আগুনে জ্বালানি সংকট

যুদ্ধের আগুনে জ্বালানি সংকট

0 comments 6 views
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার: ইরান যুদ্ধের ধাক্কায় এশিয়ার অর্থনীতি বিপদের মুখে

হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পারস্য উপসাগর থেকে তেল ও গ্যাস সরবরাহ কার্যত থেমে গেছে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম এক সপ্তাহে ৩৭ শতাংশ বেড়েছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় ধাক্কা খাচ্ছে এশিয়া—যে অঞ্চল গত কয়েক দশক ধরে বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি।

 

যুদ্ধের দ্বিতীয় সপ্তাহেই জ্বালানি বাজারে ঝড়

আমেরিকা ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ এখন দ্বিতীয় সপ্তাহে। এই সংঘাতের ফলে পারস্য উপসাগর থেকে সমুদ্রপথে তেল রপ্তানি প্রায় থমকে গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে লেনদেন শুরু হতেই তার প্রভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

বিশ্ববাজারের অন্যতম সূচক ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যায়। মাত্র এক সপ্তাহে দাম বেড়েছে ৩৭ শতাংশ।

এই দামবৃদ্ধির প্রভাব ইতিমধ্যেই সাধারণ মানুষের জীবনে পৌঁছে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রে গড়ে পেট্রোলের দাম এখন প্রতি গ্যালন ৩.৪০ ডলারের বেশি, যা ফেব্রুয়ারির শেষের তুলনায় প্রায় ৫০ সেন্ট বেশি। ইউরোপে প্রাকৃতিক গ্যাসের দামও যুদ্ধের আগের তুলনায় ৬৪ শতাংশ বেড়েছে।

কিন্তু এই জ্বালানি ধাক্কার সবচেয়ে কঠিন প্রভাব পড়ছে এশিয়ায়।

“বিশ্ব অর্থনীতির ইঞ্জিন হিসেবে এতদিন যে অঞ্চলকে দেখা হতো, সেই এশিয়াই এখন দ্রুত জ্বালানি সংকটের দিকে এগোচ্ছে।”

কেন এশিয়াই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে

চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া—এই চারটি বড় অর্থনীতি সমুদ্রপথে যে তেল আমদানি করে তার ৪০ থেকে ৮০ শতাংশই আসে পারস্য উপসাগর থেকে।

প্রাকৃতিক গ্যাসের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি একই রকম।

  • চীনের এলএনজি আমদানির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে
  • ভারতের ক্ষেত্রে তা অর্ধেকেরও বেশি
  • দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশের ক্ষেত্রে এই নির্ভরতা আরও বেশি

২০২৫ সালে হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাওয়া তেলের ৮৭ শতাংশ এবং এলএনজির ৮৬ শতাংশই কিনেছিল এশিয়ার দেশগুলো।

এখন সেই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ কার্যত বন্ধ। ফলে বহু এশীয় দেশ খুব দ্রুত জ্বালানি ঘাটতিতে পড়ার ঝুঁকিতে।

তেলের বাজারে অস্বাভাবিক পরিবর্তন

এই আতঙ্ক বোঝা যায় তেলের বাজারের অদ্ভুত দামের ওঠানামা থেকে।

সাধারণত ওমানি তেল ব্রেন্ট তেলের তুলনায় সস্তা হয়। কারণ এটি বেশি ঘন এবং সালফারের পরিমাণ বেশি—ফলে শোধন করা কঠিন।

কিন্তু এখন পরিস্থিতি উল্টো।

এশিয়ার রিফাইনারিগুলো মরিয়া হয়ে তেল কিনতে শুরু করায় ওমানি তেলের দাম এখন ব্রেন্টের থেকেও বেশি। এশিয়ার অনেক রিফাইনারি উপসাগরীয় তেলের মতো ধরনের তেল প্রক্রিয়াকরণের জন্য তৈরি, তাই তারা সেই ধরনের তেল পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছে।

“চীনে এখন নিষিদ্ধ রাশিয়া বা ইরানের তেল ছাড়া ১০০ ডলারের নিচে কোনো তেল পাওয়া প্রায় অসম্ভব।”

রাশিয়ার তেল দিয়ে ঘাটতি পূরণের চেষ্টা

যুদ্ধের আগে যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করতে চাপ দিচ্ছিল। কিন্তু পরিস্থিতি বদলে যাওয়ায় ৫ মার্চ ট্রাম্প প্রশাসন ভারতকে ৩০ দিনের জন্য রাশিয়ার তেল কেনার অনুমতি দেয়।

ধারণা ছিল, বিশ্ববাজারে ক্রেতাহীন অবস্থায় থাকা বিপুল পরিমাণ রাশিয়ান তেল এই ঘাটতি পূরণ করতে পারবে।

কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি।

আমেরিকার তেলের জন্য এশিয়ার প্রতিযোগিতা

সাধারণ সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান তেল WTI (West Texas Intermediate) মূলত ইউরোপে যায়। ইউরোপ সাধারণত এই তেলের জন্য বেশি দাম দেয়।

কিন্তু যুদ্ধের পর পরিস্থিতি বদলে গেছে।

এখন এশিয়ার ক্রেতারা ইউরোপের চেয়েও বেশি দাম দিতে রাজি। চীনা ক্রেতারা ইতিমধ্যেই WTI তেলের জন্য ব্যারেলপ্রতি ১০৩ ডলার পর্যন্ত দিচ্ছেন।

ওমানি তেলের দাম ইতিমধ্যেই ১১০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে।

তেলবাহী জাহাজের সংকট

যুদ্ধের কারণে শুধু সরবরাহই নয়, পরিবহন ব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বিশ্বের প্রায় ১০ শতাংশ তেলবাহী জাহাজ পারস্য উপসাগরে আটকে আছে। ফলে আমেরিকার উপসাগরীয় উপকূল থেকে চীনে তেল পাঠানোর খরচ মাত্র এক সপ্তাহে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে।

এশিয়ার রিফাইনারিগুলো উৎপাদন কমাচ্ছে

চীনের কাছে প্রায় ১.৩ বিলিয়ন ব্যারেল তেলের মজুত রয়েছে—যা এক বছরের আমদানি বন্ধ থাকলেও চলতে পারে। তবুও চীনা সরকার বড় রিফাইনারিগুলোকে ডিজেল ও পেট্রোল রপ্তানি বন্ধ করতে বলেছে।

ভারত, সিঙ্গাপুর ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলোর মজুত ৫০ দিনেরও কম।

ফলে তাদেরও উৎপাদন কমানোর পথে হাঁটতে হতে পারে।

অনেক রিফাইনারি ইতিমধ্যেই ১০ শতাংশ বা তার বেশি উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে

গ্যাস বাজারে আরও বড় সংকট

প্রাকৃতিক গ্যাসের পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক।

গত বছর উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে এলএনজি এসেছে—

  • ভারতের আমদানির অর্ধেক
  • বাংলাদেশের তিন-চতুর্থাংশ
  • পাকিস্তানের প্রায় পুরোটাই

কিন্তু ২৭ ফেব্রুয়ারি থেকে হরমুজ প্রণালী দিয়ে একটি এলএনজি জাহাজও বের হয়নি।

তার ওপর কাতারের প্রধান এলএনজি রপ্তানি কেন্দ্র—যা বিশ্বের ১৭ শতাংশ সরবরাহ করে—ড্রোন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বন্ধ রয়েছে।

কাতারের জ্বালানি মন্ত্রীর মতে, স্বাভাবিক সরবরাহে ফিরতে কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে।

“এখন এশিয়ার দেশগুলো বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে গ্যাস কিনতে মরিয়া হয়ে উঠেছে।”

দরিদ্র দেশগুলোর সামনে কঠিন সময়

বাংলাদেশ, ভারত, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও থাইল্যান্ড এখন স্পট মার্কেটে এলএনজি কিনতে চেষ্টা করছে।

ফলে পরিবহন খরচ আকাশছোঁয়া হয়েছে। আটলান্টিক অঞ্চল থেকে এশিয়ায় এলএনজি পাঠাতে এখন প্রতিদিন ২,৬৪,০০০ ডলার খরচ হচ্ছে—যা মাত্র এক সপ্তাহে ছয় গুণ বেড়েছে।

কিন্তু দরিদ্র দেশগুলোর পক্ষে এই দাম দেওয়া কঠিন।

বাংলাদেশ ও ভারতের সাম্প্রতিক গ্যাস কেনার টেন্ডারে একজন বিক্রেতাও অংশ নেয়নি।

ফলে অনেক দেশকে এখন বাধ্য হয়ে কয়লা বা তেলের মতো বেশি দূষণকারী জ্বালানির দিকে ফিরতে হতে পারে, অথবা বিদ্যুৎ উৎপাদন কমাতে হবে।

সামনে কী অপেক্ষা করছে

চীনের কাছে বড় মজুত থাকায় তারা কিছুদিন পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবে। কিন্তু এশিয়ার অনেক দেশের জন্য পরিস্থিতি দ্রুতই সংকটজনক হয়ে উঠতে পারে।

রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের সময় জ্বালানি সংকটের কারণে ইউরোপের অর্থনীতির যে ক্ষতি হয়েছিল, ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী তা ছিল জিডিপির ২.৪ শতাংশ।

এখন একই ধরনের ঝড়ের মুখে দাঁড়িয়ে আছে এশিয়া।

দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ব অর্থনীতির ইঞ্জিন হিসেবে কাজ করা এই অঞ্চলটি আজ যেন এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছে যেখানে জ্বালানি ফুরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আর কেবল তাত্ত্বিক নয়—বরং বাস্তব সম্ভাবনা।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles