বাংলাস্ফিয়ার: ভারতে এত দ্রুত বিলিয়নিয়ার তৈরি হওয়ার ঘটনাটি কেবল ব্যক্তিগত প্রতিভা বা ব্যবসায়িক দক্ষতার ফল নয়; এর পেছনে রয়েছে অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তন, বাজারের বিস্তার, রাষ্ট্রের নীতি এবং আন্তর্জাতিক পুঁজির প্রবাহ—সব মিলিয়ে এক জটিল প্রক্রিয়া। হুরুনের সমীক্ষা যে চিত্রটি তুলে ধরেছে তা হল ভারতে এখন ৩০৮ জন বিলিয়নিয়ার—তা আসলে গত তিন দশকের অর্থনৈতিক রূপান্তরের ফল।
দ্বিতীয় বড় কারণ হলো ভারতের বিশাল বাজার। প্রায় দেড়শো কোটি মানুষের দেশে ভোগের পরিমাণ দ্রুত বাড়ছে। মধ্যবিত্ত শ্রেণির সম্প্রসারণের ফলে টেলিকম, খুচরো বাজার, ডিজিটাল পরিষেবা, স্বাস্থ্যসেবা, ওষুধ, শিক্ষা এবং ই-কমার্সের মতো খাতে বিপুল ব্যবসার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এই বাজারকে কাজে লাগিয়েই অনেক উদ্যোক্তা অল্প সময়ে বিশাল সম্পদের মালিক হয়ে উঠেছেন।
তৃতীয় কারণ পুঁজিবাজারের বিস্ফোরণ। আজকের যুগে সম্পদের বড় অংশ তৈরি হয় শেয়ারবাজারে কোম্পানির মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে। একটি কোম্পানি যখন স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হয় এবং তার শেয়ারের দাম বাড়ে, তখন প্রতিষ্ঠাতার সম্পদের মূল্যও কাগজে-কলমে দ্রুত বেড়ে যায়। ভারতের বহু বিলিয়নিয়ারের সম্পদ আসলে এই ধরনের “equity wealth”। উদাহরণস্বরূপ, মুকেশ আম্বানি বা গৌতম আদানির সম্পদের বড় অংশই তাদের কোম্পানির শেয়ারের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত।
চতুর্থ কারণ হলো রাষ্ট্রের নীতি এবং পরিকাঠামোগত প্রকল্প। গত দুই দশকে বিদ্যুৎ, বন্দর, বিমানবন্দর, টেলিকম, ডিজিটাল পরিষেবা এবং পুনর্নবীকরণযোগ্য জ্বালানির মতো খাতে বড় বড় প্রকল্প শুরু হয়েছে। এই প্রকল্পগুলিতে অংশ নেওয়া বড় কর্পোরেট গোষ্ঠীগুলি বিপুল সম্পদ তৈরি করেছে। অর্থনীতির ভাষায় এটিকে বলা হয় “scale advantage”—যেখানে একটি বড় কোম্পানি দ্রুত আরও বড় হয়ে ওঠে।
পঞ্চম কারণ প্রযুক্তি ও স্টার্ট-আপ অর্থনীতি। ইন্টারনেট এবং স্মার্টফোন বিপ্লব ভারতের ব্যবসায়িক পরিবেশকে আমূল বদলে দিয়েছে। নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তারা প্রযুক্তিভিত্তিক কোম্পানি তৈরি করে দ্রুত মূল্যায়ন (valuation) বাড়াতে সক্ষম হয়েছেন। উদাহরণ হিসেবে রীতেশ আগরওয়ালের মতো উদ্যোক্তাদের উল্লেখ করা যায়, যারা খুব অল্প বয়সে বিলিয়নিয়ার তালিকায় উঠে এসেছেন।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ স্বাস্থ্যসেবা ও ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পের উত্থান। ভারত বিশ্বের অন্যতম বড় ওষুধ উৎপাদনকারী দেশ হয়ে উঠেছে। কোভিড-পরবর্তী সময়ে এই ক্ষেত্রটি আরও দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। সেই প্রেক্ষিতে সাইরাস পুনাওয়ালার মতো উদ্যোক্তারা বিপুল সম্পদ বৃদ্ধি করেছেন।
তবে অর্থনীতির একটি সূক্ষ্ম বাস্তবতাও এখানে কাজ করে—বিলিয়নিয়ার তৈরি হওয়া মানেই সমাজের সামগ্রিক সমৃদ্ধি সমানভাবে বাড়ছে, এমন নয়। অনেক সময় পুঁজির মূল্য দ্রুত বাড়লেও কর্মসংস্থান বা আয়ের বিস্তার একই গতিতে ঘটে না। ফলে ধন সৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে বৈষম্যও বাড়তে পারে। ভারতের অর্থনীতিতে এই দ্বৈত প্রবণতা স্পষ্ট—একদিকে দ্রুত বাড়ছে উদ্যোক্তা ও কর্পোরেট সম্পদ, অন্যদিকে বিপুল সংখ্যক মানুষ এখনও অনিশ্চিত আয়ের ওপর নির্ভরশীল।
সুতরাং ভারতে এত বিলিয়নিয়ার তৈরি হওয়ার গল্পটি আসলে তিনটি শক্তির মিলিত ফল—উদারীকৃত বাজারব্যবস্থা, বিশাল ভোক্তা অর্থনীতি এবং শেয়ারবাজার-নির্ভর সম্পদ সঞ্চয়। এই তিনটি শক্তি একত্রে কাজ করেই গত তিন দশকে ভারতের অর্থনীতিতে এমন এক পরিবেশ তৈরি করেছে যেখানে ধন সৃষ্টির গতি অত্যন্ত দ্রুত। কিন্তু সেই ধনের বণ্টন কেমন হবে—সেটিই এখন ভারতের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু।