সুমন চট্টোপাধ্যায়: ভারতের গণতন্ত্র আসলে এক অদ্ভুত প্রতিষ্ঠান। এত বড়, এত বৈচিত্র্যময়, এত ভাষা, ধর্ম, অঞ্চল, স্বার্থ—সব মিলিয়ে এটি প্রায় অসম্ভব দানবীয় এক যন্ত্র বিশেষ। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, সেই যন্ত্রটি এখনও চলছে। মাঝে মাঝে শব্দ করে, মাঝে মাঝে ধোঁয়া বেরোয়, মাঝে মাঝে স্ক্রু খুলে পড়ে, তবুও এটি থেমে যায় না। নির্বাচন কমিশন, ভোটার তালিকা, প্রশাসনিক যাচাই, আদালত, রাজনৈতিক দল, সব মিলিয়ে একটি বিশাল প্রশাসনিক কাঠামো কোনওমতে দেশের নির্বাচন প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
এই মুহূর্তে দেশের বারোটি রাজ্যে একই ধরনের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া চলছে। কোথাও ভোটার তালিকা যাচাই, কোথাও নতুন তালিকা তৈরির কাজ, কোথাও প্রশাসনিক পুনর্গঠন, সব মিলিয়ে এক বিশাল নির্বাচনযন্ত্রের প্রস্তুতি। অন্য রাজ্যগুলোতে এই প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক হচ্ছে, আদালতে মামলা হচ্ছে, রাজনৈতিক বক্তব্যও হচ্ছে। কিন্তু মোটামুটি প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে থেকেই সব চলছে।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সংস্কৃতি বরাবরই একটু আলাদা। ভারতের নির্বাচনযন্ত্র যখন কাজ শুরু করে, পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সংস্কৃতি তখন প্রায় সঙ্গে সঙ্গে আরেকটি যন্ত্র চালু করে—রাজনৈতিক নাট্যমঞ্চ।
অন্য রাজ্যে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া মানে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। পশ্চিমবঙ্গে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া মানে সম্ভাব্য নাটকের সূচনা। একটি নোটিশ এলেই শুরু হয় সাংবাদিক সম্মেলন। একটি যাচাই প্রক্রিয়া শুরু হলেই শুরু হয় ঐতিহাসিক ঘোষণা। একটি ফাইল ঘুরলেই তৈরি হয় গণতন্ত্র বিপন্ন হওয়ার তত্ত্ব। যেন প্রতিটি প্রশাসনিক কাগজের ভাঁজে লুকিয়ে আছে কোনও মহাবিপ্লব বা মহাবিপর্যয়ের গোপন সঙ্কেত।
এই দৃশ্য নতুন নয়। পশ্চিমবঙ্গ বহু বছর ধরে একটি অদ্ভুত রাজনৈতিক ঐতিহ্য তৈরি করেছে, যেখানে প্রশাসনিক বাস্তবতা আর রাজনৈতিক নাটক প্রায় অবিচ্ছেদ্য হয়ে গেছে। এখানে নির্বাচন মানে কেবল ভোট নয়, নির্বাচন মানে একটি দীর্ঘ ধারাবাহিক নাটক যার প্রথম দৃশ্য শুরু হয় ভোটের অনেক আগে, এবং শেষ দৃশ্য প্রায় কখনওই শেষ হয় না।
এই নাটকের চরিত্রও অনেক। ক্ষমতাসীন দল আছে, বিরোধী দল আছে, টেলিভিশনের স্টুডিও আছে, সোশ্যাল মিডিয়ার বিপ্লবী আছে, আর আছে বাঙালির অমর চরিত্র—বুদ্ধিজীবী।
প্রথম চরিত্রটি অবশ্যই রাজনীতি নিজে। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির একটি অদ্ভুত দক্ষতা আছে,প্রতিটি প্রশাসনিক ঘটনাকে অস্তিত্বের লড়াই হিসেবে উপস্থাপন করার ক্ষমতা। একটি তালিকা সংশোধন হলেই বলা হয় গণতন্ত্র আক্রান্ত। একটি অভিযোগ উঠলেই বলা হয় গণতন্ত্র উদ্ধার করতে হবে।
এই নাটকের মধ্যে শব্দগুলোও খুব দ্রুত বড় হয়ে যায়। “ষড়যন্ত্র”, “গণতন্ত্রের মৃত্যু”, “ঐতিহাসিক প্রতিরোধ”—এই শব্দগুলো এত সহজে উচ্চারিত হয় যেন এগুলো কোনও কবিতার অলঙ্কার।
অন্য রাজ্যে রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচন নিয়ে লড়াই করে। পশ্চিমবঙ্গে দলগুলো প্রায়শই ভাষার ভিতরেই যুদ্ধ শুরু করে।
এই ভাষাযুদ্ধের সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় আরেকটি শিল্প—টেলিভিশন বিতর্ক। পশ্চিমবঙ্গের টিভি স্টুডিওগুলো নির্বাচনকালে প্রায় যুদ্ধঘাঁটিতে পরিণত হয়। প্যানেলিস্টরা যেন প্রস্তুত সৈন্যদল। প্রত্যেকের কাছে নিজস্ব সত্য আছে, এবং প্রত্যেকেই বিশ্বাস করেন যে সেই সত্যই চূড়ান্ত সত্য।
একটি চ্যানেলে কেউ ঘোষণা করছেন গণতন্ত্র শেষ। অন্য চ্যানেলে কেউ ঘোষণা করছেন গণতন্ত্র নতুন করে জন্ম নিয়েছে। দর্শক মাঝখানে বসে ভাবছেন, এই একই দেশে কি তাহলে দুটি আলাদা গণতন্ত্র চলছে?
এই টিভি বিতর্কের মধ্যে যুক্তি খুব কম সময় পায়। কারণ যুক্তি ধীর। আর টিভি দ্রুত।
ফলে যে জিনিসটি সবচেয়ে বেশি উৎপাদিত হয় তা হল শব্দ। প্রচুর শব্দ। এত শব্দ যে মাঝে মাঝে মনে হয় নির্বাচন নয়, শব্দের উৎসব চলছে।
তারপর আসে সোশ্যাল মিডিয়া। বাঙালি সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করতে শিখেছে এক অদ্ভুত দক্ষতায়। এখানে প্রতিটি মানুষ এক একটি ক্ষুদ্র সংবাদমাধ্যম, এক একটি ক্ষুদ্র রাজনৈতিক দল, এক একটি ক্ষুদ্র বিপ্লব।
ফেসবুকের পোস্টে বিপ্লব ঘোষণা হয়। টুইটারে গণতন্ত্র রক্ষা করা হয়। ইউটিউবে ষড়যন্ত্র উদ্ঘাটন করা হয়।
একটি ভিডিও ক্লিপ কয়েক মিনিটের মধ্যে ইতিহাসের প্রমাণ হয়ে ওঠে। একটি গুজব কয়েক ঘণ্টার মধ্যে রাজনৈতিক তত্ত্ব হয়ে ওঠে।
এবং এই পুরো প্রক্রিয়ার মধ্যে সত্য আর নাটক ধীরে ধীরে মিশে যায়।
তারপর আসে বাঙালির সবচেয়ে প্রিয় চরিত্র—বুদ্ধিজীবী।
বাংলার বুদ্ধিজীবীর একটি দীর্ঘ ঐতিহ্য আছে। একসময় তারা সত্যিই জনমত গঠন করতেন, বিতর্ক তৈরি করতেন, চিন্তার নতুন রাস্তা খুলতেন। কিন্তু সময় বদলেছে। এখন বুদ্ধিজীবীরাও কেবল চাটাচাটিতে ব্যস্ত। কেউ কবিতা চাটছে, কেউ গান, কেউ ভয়ঙ্কর সব ছবি, কেউ সুর, কেউ অসুর।বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে চাটা-প্রতিযোগিতা শুরু হলে কে বঙ্গবিভূষণ পাবেন, কে হবেন বঙ্গভূষণ আর কে বঙ্গরত্ন তা নিয়েও টেলিভিশনের সান্ধ্য কলতলার আসরে তীব্র বাদানুবাদ হবে আলবাৎ।কেউ বলবে চাপ-দাড়ি যোগ্যতম, কেউ বলবে ঝোলা দাড়ি, কেউ আবার রায় দেবে বারো-ভাতারির পক্ষে।
টেলি-তারকারা বিশ্লেষণ করেন না, হয়ত করতে জানেননা, কেবলত অবস্থান নেন।
তারা প্রশ্ন করেন না, তারা ঘোষণা করেন।
এবং এই ঘোষণাগুলো আবার নতুন করে টিভি বিতর্কে ফিরে আসে, সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে, আবার নতুন নাটকের জন্ম দেয়।
এই পুরো প্রক্রিয়ার মধ্যে সাধারণ মানুষ কোথায়?
সাধারণ মানুষ আসলে এই নাটকের দর্শক।
তিনি ভোট দেবেন, লাইনে দাঁড়াবেন, তালিকা যাচাই করবেন, কিন্তু টিভি বিতর্কে থাকবেন না। সোশ্যাল মিডিয়ার বিপ্লবে অংশ নেবেন না।
তিনি কেবল দেখবেন।
দেখবেন কীভাবে প্রতিটি দল ঘোষণা করছে তারা গণতন্ত্রের শেষ রক্ষক।
দেখবেন কীভাবে প্রতিটি নেতা বলছেন দেশ বাঁচাতে হলে তাদেরই দরকার।
দেখবেন কীভাবে প্রতিটি বিতর্কে শব্দের পর শব্দ জমা হচ্ছে।
এবং শেষে তিনি ভোট দেবেন।
এই পুরো নাটকের সবচেয়ে আশ্চর্য অংশ হল এর স্থায়িত্ব।
এই নাটক একদিনের নয়।
এক সপ্তাহেরও নয়।
এটি চলতে থাকে ভোট গণনা শেষ হওয়া পর্যন্ত।
প্রতিটি দিন নতুন অভিযোগ, নতুন তত্ত্ব, নতুন নাটক নিয়ে আসে।
যদি কোনও সিদ্ধান্ত পছন্দসই হয়, তবে বলা হয় গণতন্ত্র জয়ী হয়েছে।
যদি সিদ্ধান্ত পছন্দসই না হয় তবে বলা হয় গণতন্ত্র আক্রান্ত।
অর্থাৎ ফলাফল যাই হোক, নাটকের উপাদান কখনও শেষ হয় না।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি এই নাট্যকলাকে প্রায় শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছে। এখানে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া আর রাজনৈতিক নাটক এতটাই জড়িয়ে গেছে যে মাঝে মাঝে বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে, কোনটা বাস্তব আর কোনটা মঞ্চসজ্জা।
ভারতের অন্য রাজ্যগুলোতে নির্বাচন প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন প্রায়শই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
এবং এই অনুষ্ঠানের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল—এখানে সবাই অভিনেতা।
রাজনীতিবিদ অভিনেতা।
বুদ্ধিজীবী অভিনেতা।
টিভি প্যানেলিস্ট অভিনেতা।
সোশ্যাল মিডিয়া বিপ্লবী অভিনেতা।
কেবল দর্শক অভিনেতা নন।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্র দর্শকদের হাতেই থাকে।
কারণ নাটক যতই চলুক, মঞ্চ যতই জমুক, টিভি যতই গর্জন করুক, শেষ কথা বলে ভোটবাক্স।
আর সেই মুহূর্তে সমস্ত নাটক হঠাৎ থেমে যায়।
অন্তত কয়েক দিনের জন্য।
তারপর আবার নতুন নাটক শুরু হয়।
কারণ পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির এক অমোঘ সত্য আছে—
এখানে রাজনীতি কখনও শেষ হয় না।
এখানে রাজনীতি প্রায়শই রাজনৈতিক থিয়েটার।
আর এই থিয়েটারের সবচেয়ে বড় শক্তি হল, এটি কখনও ক্লান্ত হয় না।